এক সময়ে শাসকদলের গোষ্ঠী কোন্দলই ছিল বাসন্তীর রাজনীতির পরিচিত ছবি। গত পঞ্চায়েত নির্বাচন পর্যন্তও তৃণমূলের দুই শিবিরের সংঘাতে বার বার উত্তপ্ত হয়েছে এলাকা। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেই চিত্র বদলেছে। ব্লক তৃণমূলের সংগঠনে এখন কার্যত নিয়ন্ত্রণ একক নেতৃত্বের হাতে। দলীয় সূত্রের দাবি, কোন্দল অনেকটাই থেমেছে, সংগঠনকেই এখন অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
বর্তমানে বাসন্তী পঞ্চায়েত সমিতির পূর্ত কর্মাধ্যক্ষ রাজা গাজি ওরফে নুর ইলাহী গাজির হাতেই ব্লক সংগঠনের রাশ। দলের অন্দরের খবর, যুব তৃণমূল নেতা আমানুল্লা লস্করের সঙ্গে ব্লক তৃণমূলের তৎকালীন অবজ়ার্ভার আব্দুল মান্নান গাজির দীর্ঘদিনের বিবাদই এলাকায় অশান্তির মূল কারণ ছিল। গত পঞ্চায়েত নির্বাচনের আগে দলের নির্দেশে আমানুল্লাকে সাংগঠনিক দায়িত্ব থেকে সরানো হয়। সেই দায়িত্ব পান আব্দুল মান্নান গাজির ছেলে রাজা। এরপর থেকেই পরিস্থিতি ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করে।
দলীয় কর্মীদের একাংশের বক্তব্য, নেতৃত্ব বদলের পরে গোষ্ঠী সংঘর্ষে জড়িত বহু কর্মীর বিরুদ্ধে থাকা মামলাও প্রত্যাহার হয়েছে। বাসন্তী ব্লক তৃণমূল নেতা শ্রীদাম মণ্ডলের কথায়, “রাজা দায়িত্ব নেওয়ার পরে সংগঠনের মধ্যে শৃঙ্খলা এসেছে। অকারণ সংঘাত কমেছে। প্রশাসনিক স্তরেও কাজের পরিবেশ বদলেছে।”
বাসন্তীর রাজনৈতিক ইতিহাস বলছে, ২০১১ সালে রাজ্যে ক্ষমতার পালাবদল হলেও এই বিধানসভা কেন্দ্রে বামেরাই জিতেছিল। আরএসপি প্রার্থী সুভাষ নস্কর জয়ী হন। ২০১৬ সালে তাঁকে হারান তৃণমূল প্রার্থী গোবিন্দ নস্কর। ২০২১ সালে প্রার্থী হন প্রাক্তন মন্ত্রী শ্যামল মণ্ডল। সে সময়ে গোষ্ঠী সংঘাতে জর্জরিত ছিল এলাকা— প্রায়ই মারামারি, বোমাবাজির অভিযোগ উঠত। তবু দলীয় নির্দেশে সব পক্ষ এক হয়ে শ্যামল মণ্ডলের হয়ে প্রচারে নামে এবং আসনটি ধরে রাখে তৃণমূল।
জয় এলেও অবশ্য কোন্দল থামেনি তখন। পরিবর্তন আসে গত পঞ্চায়েত নির্বাচনের আগে। রাজার নেতৃত্বে সংগঠন পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। ধীরে ধীরে আমানুল্লা লস্করের অনুগামীদের একাংশও শিবির বদল করেন। পঞ্চায়েত ভোটে প্রায় সব ক’টি গ্রাম পঞ্চায়েতে ভাল ফল করে তৃণমূল। ফলে সংগঠনে গুরুত্ব বাড়ে রাজার।
বর্তমানে বাসন্তী বিধানসভা কেন্দ্রের আসন্ন নির্বাচনী সমীকরণ নিয়েই আলোচনা বেশি। দলীয় সূত্রে জানা যাচ্ছে, সম্ভাব্য প্রার্থীর তালিকায় একাধিক নাম ঘুরছে। গোসাবার প্রাক্তন বিধায়ক জয়ন্ত নস্করের ছেলে বাপ্পাদিত্যের নামও রয়েছে সেই তালিকায়। বিদায়ী বিধায়ক শ্যামল মণ্ডলও আবার প্রার্থী হতে আগ্রহী বলে দলের অন্দরের খবর। জেলা পরিষদের সদস্য শঙ্করী মণ্ডল, ব্লক এসসি-এসটি সেলের সভাপতি দিলীপ মণ্ডল, স্থানীয় নেতা শিবনাথ মণ্ডলের নামও শোনা যাচ্ছে।
শ্যামল বলেন, “গত পাঁচ বছরে এলাকায় উন্নয়নের কাজ করেছি। সিদ্ধান্ত দল নেবে।” রাজার বক্তব্য, “বাসন্তীতে ভোট হবে দল ও নেতৃত্বকে দেখে। যাঁকে দায়িত্ব দেওয়া হবে, তাঁকেই জেতানোর জন্য আমরা সকলে কাজ করব।”
সব মিলিয়ে, এক সময়ে যেখানকার রাজনীতি পরিচিত ছিল গোষ্ঠী কোন্দলের জন্য, সেখানে এখন আপাত শান্তির ছবি। তবে এই শান্তি কতটা স্থায়ী এবং আসন্ন বিধানসভা ভোটে তা কতটা প্রভাব ফেলবে— সে দিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)