নবম শ্রেণির ছাত্রীটি বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল পুজোর কেনাকাটা করবে বলে। বাড়ি ফেরার গাড়ি ধরবে বলে দাঁড়িয়েছিল রাস্তার পাশে। আচমকাই একটি ছোট গাড়িতে করে তারই এক পরিচিত যুবক এসে মেয়েটিকে জোর করে গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়। তার নাকে কিছু একটা স্প্রে করা হয়েছিল। মেয়েটি অচৈতন্য হয়ে পড়ে। সেই সুযোগে গাড়ির মধ্যেই তাকে ওই যুবক ধর্ষণ করে বলে অভিযোগ। রাতে সড়কে টহলদার পুলিশকর্মীরা মেয়েটিকে উদ্ধার করেন। অভিযুক্ত যুবক গ্রেফতার হয়।
কয়েক মাস আগের ওই ঘটনার পরে নাবালিকা মেয়েটির জীবনে নেমে এসেছে ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে গিয়েছে। পাড়া-প্রতিবেশীরা তাকে ‘অন্য নজরে’ দেখছে। এমনকী, বাড়ির লোকজনের থেকেও মিলছে দুর্ব্যবহার। মানসিক অবসাদ ও অপমান সহ্য করতে না পেরে মেয়েটি কীটনাশক খেয়ে ইতিমধ্যেই একবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে। বনগাঁ মহকুমা হাসপাতালে চিকিৎসা করিয়ে এ যাত্রায় প্রাণে বেঁচেছে।
মেয়েটির পাশে দাঁড়িয়েছে বনগাঁ চাইল্ড লাইন সংস্থা। মেয়েটিই গোপনে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। এখন তাকে স্বাভাবিক পরিবেশে ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে সংস্থাটি। যারা জানিয়েছে, ধর্ষণের ঘটনার পরে মেয়েটির দাদা-বৌদি এমনকী মা-ও নানা বাঁকা কথা শোনাচ্ছেন। মেয়েটি পিতৃহীন। তার এক দিদি-জামাইবাবু তবু কিছুটা পাশে থাকেন।
বনগাঁ চাইল্ড লাইন সংস্থার কো-অর্ডিনেটর স্বপ্না মণ্ডল বললেন, ‘‘কাউন্সেলিং করতে আমরা ওর বাড়িতে যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু মেয়েটিই আমাদের বারণ করেছে। তাতে ফল আরও ভয়াবহ হওয়ার আশঙ্কা করছে ও। তবে মেয়েটিকে আমরা বুঝিয়ে-সুঝিয়ে ফের স্কুলে যেতে রাজি করিয়েছি। ওর আশঙ্কা ছিল, স্কুলের অনেকেই বিষয়টি জানে। ফলে তারা কী আচরণ করবে, সেই ভেবেই মেয়েটি স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল।’’
স্বপ্নাদেবী বলেন, ‘‘নির্যাতিতা মেয়েটির বাড়িতে একদিন ঘটনার তদন্তের স্বার্থে পুলিশ ফোন করেছিল। তারপর থেকে মেয়েটির উপরে অত্যাচার নাকি আরও বেড়ে যায়। ওকে কথা শোনানো হয়, তোর জন্যেই এলাকায় গোটা পরিবারের সম্মানহানি হয়েছে।’’
শুধু ওই মেয়েটিই নয়, কিশোরী মেয়ে যারা যৌন নির্যাতনের স্বীকার হচ্ছে বা ভিন রাজ্যে পাচার হওয়ার পরে ফিরে আসছে, তাদের বেশির ভাগই পরিবার, আত্মীয়-স্বজন বা পাড়া-প্রতিবেশীদের কাছ থেকে নানা গঞ্জনা শুনতে বাধ্য হচ্ছে।
পুলিশ এবং চাইল্ড লাইন সংস্থা সূত্রে জানা গিয়েছে, পাচারের পরে ফিরে এসে নাবালিকা মেয়েটিকে পাড়া-প্রতিবেশীদের কাছ থেকে এতটাই কটূক্তি শুনতে হয়, অনেক ক্ষেত্রে বাড়ি ছেড়ে পালাচ্ছে মেয়েটি বা আত্মহত্যার পথও বেছে নিচ্ছে। যে যৌনপল্লি থেকে উদ্ধার করা হচ্ছে তাদের কাউকে কাউকে, সেখানেও ফিরে যাচ্ছে অনেকে।
এ রকমই ঘটনা ঘটেছিল বনগাঁর একটি মেয়ের ক্ষেত্রে। মুম্বইয়ে পাচার হয়ে গিয়েছিল সে। একটি সংগঠনের মাধ্যমে মেয়েটিকে বাড়ি ফেরানো হয়। পরবর্তী সময়ে মেয়েটির বিয়েও হয়। কিন্তু শ্বশুরবাড়িতে তাকে পুরনো প্রসঙ্গ তুলে নিয়মিত নির্যাতন করা হতো। কয়েক মাস আগে সে গায়ে আগুন দিয়ে আত্মহত্যা করে।
এমনও দেখা গিয়েছে, নাবালিকা মেয়েটি প্রেমের ফাঁদে পড়ে ধর্ষণের শিকার হয়েছে। পরে গ্রেফতার করা হয়েছে যুবককে। কিন্তু পরিবার বা প্রতিবেশীদের চাপে তার সঙ্গেই বিয়ে করতে বাধ্য হচ্ছে মেয়েটি। হাবরা থানার আইসি বলেন, ‘‘সাম্প্রতিক সময়ে হাবরা থানা এলাকায় এ রকম কয়েকটি বিয়ের ঘটনা ঘটেছে।’’
তবে ব্যতিক্রমও আছে।
(চলবে)