তছরুপের অভিযোগ ধামাচাপা দিতে চাইছেন খোদ বিডিও— এমন অভিযোগ তুলে বুধবার মথুরাপুর ২ বিডিওকে দুপুর থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত ঘেরাও করে রাখলেন স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মহিলারা। বিডিও অফিসের কর্মীরাও আটকে পড়েন।
পুলিশ বিক্ষোভকারীদের বের করে দেওয়ার চেষ্টা করলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বিডিওর বিরুদ্ধে দুর্ব্যবহারেরও অভিযোগ তুলেছেন মহিলারা। বিডিও মোনালিসা তিরকের অবশ্য তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে সন্ধের পরে বিডিও অফিসে আসেন ডায়মন্ড হারবার মহকুমার ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট তাপস ভট্টাচার্য। পরে মহকুমাশাসক শান্তনু বসুও হস্তক্ষেপ করেন।
প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, রায়দিঘি পঞ্চায়েত এলাকার ২২৫টি স্বনির্ভর গোষ্ঠীকে নিয়ে ২০১০ সালে সরকারি ভাবে একটি সঙ্ঘ গঠন করা হয়। কমিটিও তৈরি হয়। ২০১১ সালে সঙ্ঘের তরফে রায়দিঘি গ্রামীণ হাসপাতালে খাদ্যতালিকা তৈরি ও সাফাইয়ের কাজ পান কয়েকজন মহিলা। পুরনো কমিটির বিরুদ্ধে নতুন কমিটির অভিযোগের তালিকাটি দীর্ঘ। তার জেরেই এ দিনের বিক্ষোভ।
বিক্ষোভকারী মহিলাদের বক্তব্য, নতুন কমিটিকে এখনও ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়নি। বিডিও নিজেই বুধবার ক্ষমতা হস্তান্তরের দিন ধার্য করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা করেননি। এরপরেই শুরু হয় বিক্ষোভ। বিডিও মোনালিসা তিরকে অবশ্য বলেন, “প্রশাসনের নির্দেশেই নতুন কমিটি গঠন হয়েছে। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে কিছু জটিলতা থেকে গিয়েছে। পুরনো কমিটির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছিল। কিন্তু পুরনো কমিটি হাইকোর্টে নতুন কমিটি গঠনের বৈধতা নিয়ে মামলা করায় বিষয়টি আরও জটিল হয়। তাই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত কোনও পদক্ষেপ করা যাচ্ছে না।” বিক্ষোভকারীদের পাল্টা বক্তব্য, পুরনো কমিটি চলতি বছরের ১৭ অগস্ট মামলা রুজু করলেও তারপর থেকে সাতবার ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য দিন ধার্য করেছেন বিডিও। আইনি জটিলতাই যদি থাকবে, তা হলে এতগুলি দিন ধার্য করা হল কী করে? এ সব নিয়ে বিডিও মন্তব্য করেননি।
নতুন কমিটির সম্পাদিকা শিবাণী চক্রবর্তী, সভাপতি কবিতা হালদারদের অভিযোগ, প্রতি বছর নতুন কমিটি গঠন করার নিয়ম থাকলেও সেই নিয়মের তোয়াক্কা না করেই পুরনো কমিটি ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রেখে আর্থিক তছরুপ করে যাচ্ছে। বিষয়টি প্রশাসনকে জানানোর পরে তাদের উদ্যোগেই নতুন কমিটি গঠন করা হয় গত ৩০ জুলাই। তারপর থেকে ক্ষমতা হস্তান্তর করার বিষয়ে গড়িমসি করছেন বিডিও। ওই মহিলাদের কথায়, ‘‘গত পাঁচ বছর সঙ্ঘের অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে পুরনো কমিটি প্রায় ৮০ লক্ষ টাকার লেনদেন করলেও তার কোনও হিসেব দেয়নি। সাধারণ সদস্যদের জমা দেওয়া লক্ষ লক্ষ টাকারও কোনও হিসেব নেই। অভিযোগ পেয়েও তদন্ত করেনি প্রশাসন। তাঁদের আরও অভিযোগ, হাসপাতালে রান্নার দায়িত্ব সঙ্ঘের হলেও পুরনো কমিটির সম্পাদিকা শকুন্তলা কপাট পারিবারিক ভাবে ওই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। সাফাইয়ের কাজে যুক্ত ১২ জন মহিলা নিয়মিত কাজ করলেও তাঁদের পারিশ্রমিক দেওয়া হয় না। অভিযোগ, শকুন্তলাদেবী ও তাঁর ঘনিষ্ঠ কয়েকজন ওই টাকার ভাগ নিচ্ছেন। সঙ্ঘের নামে থাকা ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকেও টাকা তছরুপের অভিযোগ তুলেছেন মহিলারা। অভিযোগ মানতে চাননি শকুন্তলাদেবী। তিনি বলেন, “বেআইনি ভাবে নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছে। তছরুপের কোনও ঘটনা ঘটেনি। ওরাই বরং মিথ্যে অভিযোগ করে প্রশাসনকে দিয়ে অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দিয়েছে।”
মথুরাপুর ২ পঞ্চায়েত সমিতির স্বাস্থ্য কর্মাধ্যক্ষ লুৎফা শেখ সঙ্ঘের অধীন একটি গোষ্ঠীর সদস্য। তিনি বলেন, “পুরনো কমিটির বেআইনি কাজে পরোক্ষে মদত দিচ্ছেন বিডিও।” পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি পীযূষ বৈরাগী বলেন, “আন্দোলনকারীদের দাবি ন্যায়সঙ্গত। বিডিও কেন পুরনো কমিটির কাছে মাথা নত করে আছেন, তা তদন্ত করুক ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ।”
মহকুমাশাসক বলেন, ‘‘৫ ডিসেম্বর এসডিও অফিসে সব পক্ষকে নিয়ে আলোচনায় বসা হবে।’’ প্রশাসনের একটি সূত্র জানাচ্ছে, ওই দিন আলোচনায় যে মহিলারা যাবেন, তাঁদের রাহা খরচ এবং খাওয়া-দাওয়ার দায়িত্ব নেবে প্রশাসন।