তিন দাদা রাত-বিরেতে ডেকে তুলেছিল ছোট ভাইকে। বলেছিল, ‘‘ঘর থেকে বেরিয়ে আয়, তোর জন্য কাঁঠাল এনেছি।’’ বছর বত্রিশের শত্রুঘ্ন জানা ঘর থেকে বেরোতেই তাঁর উপরে রাম দা নিয়ে চড়াও হয় দাদারা। এক আত্মীয়ও ছিল সঙ্গে।
গত ১৩ জুলাই পাথরপ্রতিমার লক্ষ্মীজনার্দনপুর গ্রামে ঘটনাস্থলেই মারা যান শত্রুঘ্ন। তাঁর এক দাদা তপন জানা পর দিন পুলিশের কাছে লিখিত অভিযোগে দাবি করেন, তাঁরা সিপিএম সমর্থক। সেই রাগেই তৃণমূলের লোকজন কুপিয়ে খুন করেছে ভাইকে। বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক জলঘোলা শুরু হয়। স্থানীয় সিপিএম নেতৃত্বও শাসক দলের বিরুদ্ধে সুর চড়ান। যদিও গোড়া থেকেই অভিযোগ অস্বীকার করে বিষয়টিকে ‘পারিবারিক খুন’ বলে দাবি করেছিল তৃণমূল।
প্রাথমিক তদন্তে নেমে পুলিশের ধারণা হয়, এর পিছনে রাজনীতি জড়িয়ে নেই। একাধিক বার জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় শত্রুঘ্নর ভাইদের। তদন্তের গতিপ্রকৃতি নিয়ে অসন্তুষ্ট জানা ভাইয়েরা এ বার পুলিশের বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগ তুলে জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দ্বারস্থ হন।
কিন্তু পুলিশ তখনও নিশ্চিত, খুন হয়েছে পারিবারিক কারণেই। তদন্তকারীরা জানতে পারেন, কর্মসূত্রে চার ভাই থাকেন দিল্লিতে। মাঝে মধ্যে আসেন গ্রামের বাড়িতে। জমিজমা নিয়ে শত্রুঘ্নর তিন দাদার (বাকি দু’জন রামপদ ও প্রশান্ত) সঙ্গে তাঁর বিরোধ ছিল। আরও জানা যায়, কিছু দিন আগেই টাকা-পয়সা নিয়ে দিল্লিতে বড়দা প্রশান্তর সঙ্গে মনোমালিন্য হয়েছিল শত্রুঘ্নর। তপনের স্ত্রীর সঙ্গে শত্রুঘ্নর ঘনিষ্ঠতা নিয়ে পরিবারে অশান্তিও ছিল। যার জেরে তপনের স্ত্রী বাপের বাড়িতে চলে গিয়েছিলেন। যে ভাবে নৃশংস ভাবে হামলা হয়েছিল শত্রুঘ্নর বিরুদ্ধে, তা দেখেও পুলিশের ধারণা হয়, পুরনো রাগেই এমন ভাবে আক্রমণ করা হয়েছিল ওই যুবককে।
এ সবের পরে পুলিশের সন্দেহ আরও গাঢ় হয় তিন দাদার বিরুদ্ধেই। অবশেষে নানা তথ্য-প্রমাণ হাতে আসার পরে গত মঙ্গলবার গ্রেফতার করা হয় তপনকে। তাকে জেরা করে পরে গ্রেফতার করা হয় রামপদ ও শঙ্করকে। বড় ভাই প্রশান্ত পলাতক বলে জানিয়েছে পুলিশ। ধৃত তিন জনকে কাকদ্বীপ আদালতে তোলা হলে বিচারক ১০ দিন পুলিশি হেফাজতে রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।
পুলিশের দাবি, জেরায় ওই ব্যক্তি ভাইকে খুনের কথা স্বীকার করেছেন। তিনিই জানিয়েছেন, ঘটনার দিন তিন জন গিয়েছিলেন মহেশপুরে এক বোনের বাড়িতে। সেখানেই শত্রুঘ্নকে খুনের ছক কষা হয়। ওই চক্রান্তে সামিল হয় প্রশান্তর শ্যালক শঙ্কর ঘোষও। রাতে বাড়ি ফিরে শত্রুঘ্নকে ঘুম থেকে ডেকে তোলা হয়। কাঁঠাল খাওয়ানোর নাম করে ঘরের বাইরে এনে কুপিয়ে খুন করা হয় অবিবাহিত শত্রুঘ্নকে। পরে পুলিশের নজর ঘোরাতে তপন নিজেই খুনের অভিযোগ করেন পুলিশের কাছে। তৃণমূলের ঘাড়েও দোষ চাপানোর চেষ্টা হয় সে কারণেই। সব দেখেশুনে বিস্মিত পুলিশ কর্তারাও। দক্ষিণ ২৪ পরগনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (পশ্চিম) অর্ণব বিশ্বাস বলেন, ‘‘জমি-সংক্রান্ত বিবাদেই ভাইয়েরা মিলে ভাইকে খুন করেছে। মূল অভিযুক্ত প্রশান্ত পলাতক। তাকে খুঁজছে পুলিশ।’’ প্রশান্তর শ্যালকের এই খুনের পিছনে কীসের স্বার্থ ছিল, তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।