ভোরে উঠে মাঠে গিয়ে ফাঁকা দেখে সবে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে বসেছেন। হঠাৎই পিছনে চিৎকার, ‘যান এখান থেকে’। কিন্তু কোথায় যাওয়া? সব জায়গাতেই আসছে তাড়া। সে বড় দুঃসহ অবস্থা।
মাস দেড়েক আগে গ্রামের ছবিটা ছিল এমনই। গ্রামের একটা বড় অংশের মানুষের কাছে মাঠে-ঘাটের উন্মুক্ত পরিবেশই ছিল প্রাকৃতিক কাজ করার উপায়। প্রাকৃতিক কাজের পর সাবানে হাত ধোওয়ার অভ্যাসও ছিল ‘বিলাসিতা’। ফলে স্বাভাবিক ভাবে দূষণ ছড়াচ্ছিল। বিষয়টা হঠাৎই নজরে আসে ব্লক প্রশাসনের।
উত্তর ২৪ পরগনার বাগদা ব্লককে নির্মল ব্লক হিসাবে ঘোষণা করার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট পঞ্চায়েতগুলির কাছ থেকে তথ্য চাওয়া হয়। যেমন গ্রামে কত শৌচাগার রয়েছে। কেউ মাঠেঘাটে শৌচকর্ম করেন কি না। পাওয়া তথ্যে দেখা যায় কোনিয়ারা-১ পঞ্চায়েতের ধুলোনি সর্দারপাড়া গ্রামের অধিকাংশ মানুষই মাঠেঘাটে শৌচকর্ম সারেন। এরপরেই মাঠে নামেন বিডিও মালবিকা খাঁটুয়া। প্রশাসনের লোকজন, জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে গ্রামবাসীদের সঙ্গে বৈঠক করেন। চলে গ্রামবাসীদের সচেতন করার পালা। একই সঙ্গে তৈরি করা হয় অল্প বয়স্ক ছেলেমেয়েদের নিয়ে একটি মেয়ে ও একটি ছেলেদের দল। ছেলেদের দলের নাম বীরসা মুণ্ডা। মেয়েদের দলের নাম মাতঙ্গিনী হাজরা। প্রতি দলের সদস্য পাঁচজন। তাদেরই একজন দশম শ্রেণির ছাত্রী প্রতিমা সর্দার বলে, ‘‘প্রশাসন থেকে আমাদের বাঁশি ও পরিচয় পত্র দেওয়া হয়েছে। ভোর ৪টার সময় ঘুম থেকে উঠে আমরা পাহারায় বেরোই। তবে এখন মাঠে আর কেউ শৌচকর্ম করছে না।’’ বীরসা মুন্ডার সদস্য শিব সর্দার জানায়, কাউকে শৌচকর্ম করতে দেখলে আমরা দলের নেতাকে জানিয়ে দিই। সে প্রশাসনকে জানায়।’’
মাস দেড়েকের মধ্যে ফল মেলে। তবে এর পাশাপাশি গ্রামবাসীরা যাতে বাড়িতে শৌচালয় তৈরি করেন সে ব্যাপারেও উদ্যোগী হয় প্রশাসন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই সময়ের মধ্যেই বেশ কিছু বাড়িতে শৌচাগার তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। বিনা পয়সায় প্যান ও স্লাভ দেওয়া হয়েছে। গ্রামে ঘুরে দেখা গেল বহু বাড়িতেই শৌচাগার তৈরি হয়েছে।
তবে সমস্যা যে হয়নি তা নয়। মালবিকা দেবীর কথায়, ‘‘গ্রামের মানুষকে মাঠে ঘাটে শৌচকর্ম না করতে বোঝানোর সময় তাঁদের পাল্টা দাবি ছিল, গ্রামে নানা সমস্যা রয়েছে। প্রশাসন সে সব মেটানোর প্রতিশ্রুতি দিলে তাঁরা মাঠেঘাটে শৌচকর্ম বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দেবেন। প্রশাসনের তরফে প্রতিশ্রুতি পেয়ে গ্রামের মানুষও মাঠেঘাটে শৌচকর্ম না করার প্রতিশ্রুতি দেন।’’ স্থানীয় বাসিন্দারা বিডিও-র কাছে যে সব দাবি জানান তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, ধুলোনি মোড় থেকে রানিহাটি উচ্চ বিদ্যালয় পর্যন্ত ইটের রাস্তা পিচের করতে হবে। ধুলোনি প্রফুল্লকুমার এফপি স্কুলের মাঠের চারপাশে প্রাচীরের ব্যবস্থা করতে হবে। এ ছাড়াও ধুলোনি প্রাথমিক স্কুলের কাছ থেকে কুন্দিপুর পর্যন্ত এক কিলোমিটার রাস্তা পিচের করতে হবে।
গৌর সর্দার নামে এক গ্রামবাসী বলেন, ‘‘খেতমজুরি করি। পাকা পায়খানা করার মতো আর্থিক সামর্থ্য ছিল না বলেই মাঠে কাজ সারতাম। প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাকা শৌচাগার তৈরি করে দেওয়া হয়েছে।’’ মহিলারা জানালেন, আগে অন্ধকার না হলে শৌচকর্ম করতে পারতাম না। বর্ষার সময় সমস্যা আরও বাড়ত। তা ছাড়া নিরাপত্তার বিষয়টাও ছিল। এখন বাড়িতে শৌচাগার হওয়ায় তাঁরা খুশি। গ্রামবাসীদের সচেতনতায় খুশি বিডিও-র বক্তব্য, গ্রামাবাসীদের দাবিগুলি পূরণের জন্য ব্যবস্থা নেওয়া হবে।