পেশায় চাষি বিজন দাসের সতেরো বছরের মেয়ে জয়শ্রী ছোট থেকে কিডনির সমস্যায় ভুগছে। কিছু দিন আগে রাতে হঠাৎ পেট ব্যথা, বমি। বাড়ির কাছেই প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র। কিন্তু সেখানে রাতে চিকিৎসক থাকেন না। বিজনবাবু গাড়ি ভাড়া করে মেয়েকে নিয়ে যান চার কিলোমিটার দূরে নদিয়ার দত্তফুলিয়া প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। সেখান থেকে ‘রেফার’ করে দেওয়ায় ওই রাতে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরের বনগাঁ মহকুমা হাসপাতালে যান বিজনবাবু। সেখানকার চিকিৎসকেরা জানান, আনতে দেরি হওয়ায় জয়শ্রীর অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। কলকাতায় নিয়ে যাওয়া দরকার।
গাড়ির চালক কলকাতায় যেতে রাজি না হওয়ায় অ্যাম্বুল্যান্স ভাড়া করে বিজনবাবু মেয়েকে নিয়ে যান কলকাতার মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। মেয়ে এখন সুস্থ। কিন্তু বিজনবাবুর আক্ষেপ, বাড়ির কাছে প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে পরিষেবা পাওয়া গেলে এই দুর্ভোগ হতো না। সময় বাঁচত। সে দিন প্রায় তিন হাজার টাকা গাড়ি ভাড়া গুনতে হয়েছিল বিজনবাবুকে।
এলাকার প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের চিকিৎসা পরিষেবা নিয়ে ক্ষোভ এখনও দূর হল না বাগদা ব্লকের সিন্দ্রাণী এলাকার মানুষের। সম্প্রতি এক রাতে পঞ্চাশোর্ধ্ব শঙ্কর বিশ্বাসের ব্লাড প্রেসার বেড়ে যায়। বাগদা ব্লক গ্রামীণ হাসপাতাল ঘুরে তিনি বনগাঁ মহকুমা হাসপাতালে গিয়ে প্রাণে বাঁচেন। শঙ্করবাবু জানালেন, ন্যূনতম চিকিৎসা পরিষেবাটুকু পেতে আমরা গাড়ি ভাড়া বাবদ যে টাকা খরচ করি, তা দিয়েই চিকিৎসা খরচ মিটিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যাওয়া যেত।
নদিয়া ও উত্তর ২৪ পরগনা জেলার লাগোয়া এলাকা সিন্দ্রাণী। একমাত্র সরকারি প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি বহু বছর ধরেই বেহাল। এলাকায় নার্সিংহোমও নেই। হাতে গোনা কয়েকজন চিকিৎসক সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে চিকিৎসা করতে আসেন। বাধ্য হয়ে বহু মানুষ স্থানীয় হাতুড়ে চিকিৎসক বা হোমিওপ্যাথি চিকিৎসকের উপরে নির্ভর করেন।
বিজনবাবু বলেন, ‘‘ওই দিন মেয়ের বমি-পায়খানা কিডনির সমস্যার কারণে হয়নি। কলকাতার চিকিৎসেকরা জানিয়েছিলেন খাদ্যে বিষক্রিয়া থেকে হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু চিকিৎসা করাতে দেরি হওয়ায় তা কিডনিতে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছিল।’’ তাঁর প্রশ্ন, বাড়ির কাছে প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র থাকার কী প্রয়োজন, যখন সেখানে সামান্য বমি-পায়খানার চিকিৎসাও মেলে না!
শঙ্করবাবু বলেন, ‘‘বনগাঁ হাসপাতালের চিকিৎসেকরা প্রেসার মেপে আমাকে ওষুধ লিখে দেন। খেয়ে আমি কিছুক্ষণের মধ্যেই সুস্থ হয়ে উঠি। দু’ঘণ্টা পরে বাড়ি ফিরে যাই। সিন্দ্রাণী প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসার সুবিধা থাকলে রাতে ওই দুর্ভোগে পড়তে হতো না।’’
স্বাধীনতার পর স্থানীয় বাসিন্দা অবিনাশচন্দ্র নাথের দানের জমিতে গড়ে উঠেছিল এই স্বাস্থ্যকেন্দ্র। সে সময় রোগী ভর্তির ব্যবস্থা ছিল। দশটি শয্যা ছিল। বছর তিরিশ আগে রোগী ভর্তি বন্ধ হয়ে যায়। চিকিৎসক ও নার্সদের ভবনগুলি জরাজীর্ণ ছিল। এলাকার মানুষের লাগাতার আন্দোলনের ফলে ফের নতুন করে ওই সব ভবন হয়। বানানো হয়েছে ঝাঁ চকচকে ওয়ার্ড। কিন্তু প্রায় তিন বছর ধরে সে সব তৈরি হয়ে পড়ে রয়েছে। এখনও রোগী ভর্তি বা সর্বক্ষণের চিকিৎসা পরিষেবা চালু হয়নি। দুপুরের পরে বর্হিবিভাগ শেষ হলে চিকিৎসক চলে যান। তারপর থেকে চুক্তিভিত্তিক টেকনিশিয়ান আবুল কালাম আজাদ ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মী ঝর্না ঘোষালই দেখভাল করেন। নেই কোনও ফার্মাসিস্টও।
উন্নত মানের প্যাথলজিক্যাল ল্যাবও নেই এখানে। ফলে আলট্রা-সোনোগ্রাফি বা সিটি স্ক্যান, এমনকী এক্স-রে পর্যন্ত হয় না এলাকায়। দু’টি স্থানীয় ছোট ল্যাবে কিছু রক্তের পরীক্ষা হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ছুটতে হয় বনগাঁ হাসপাতাল বা ২৭ কিলোমিটার দূরের রানাঘাটে। ব্লক গ্রামীণ হাসপাতালের দূরত্বও প্রায় ২০ কিলোমিটার। দিনে তা-ও কোনও ভাবে সামাল দেওয়া যায়। রাতের পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য একমাত্র ঈশ্বরই ভরসা।