Advertisement
E-Paper

মেলার ধুলোয় ব্রাত্য গন্ধর্ব, অপ্সরারা

নাচের সময়ে একটু চোখ মারামারি, ফ্লাইং কিসও রপ্ত। ভদ্রেশ্বরের রাজ পরে ভাল ভাবে বুঝিয়েছিল, এটুকু অ্যাক্টিং পারতে হবে!

ঋজু বসু

শেষ আপডেট: ০৯ অক্টোবর ২০২১ ০৬:৪৭
জমোহন ও সোমা। ভদ্রেশ্বরে। নিজস্ব চিত্র

জমোহন ও সোমা। ভদ্রেশ্বরে। নিজস্ব চিত্র

পুজোয় যদি একটু শাড়ি পরা যেত। নিদেনপক্ষে চুড়িদার! সে কী কপালে আছে! বিকেল গড়াতেই ও-সব ছোট ড্রেস গায়ে নিজেকে কেমন মেশিন মনে হয় রানির।

এর পর তো খালি যন্ত্রের মতো মিউজিকের সঙ্গে তাল মেলানো! পুজোর সাজে সব মেয়েকেই আসলি রানি লাগে। আর তুই মেলার চিত্রহারের রানি অমন চোখ নিচু করে ডান্স করলে চলবে? সেও এক দুগগোপুজোর কহানি! ডানকুনি না বদ্যিবাটি কোথায় স্টেজ লেগেছিল, ধমকির সুরে কথা ক’টা বলেছিলেন রামুদা। ডান্সের মাস্টার রামচন্দ্র নায়েক। রানির পেটে, পায়ে স্কিনারে ঢাকা। তবু অনভ্যাসের পোশাকে লজ্জায় কুঁকড়ে যাচ্ছে! কে জানত, এই পুজোর ডান্স বন্ধ হয়ে তার বুকে একদিন তির এসে লাগবে।

লেহঙ্গা, শর্ট ঘাগরা, হট জিন্স সয়ে গেছিল! নাচের সময়ে একটু চোখ মারামারি, ফ্লাইং কিসও রপ্ত। ভদ্রেশ্বরের রাজ পরে ভাল ভাবে বুঝিয়েছিল, এটুকু অ্যাক্টিং পারতে হবে! তবে তো হাতে টিপস আসবে। এর মানে এই নয় কোনও পাবলিকের তার সঙ্গে বেলেল্লাপনার হক আছে! রানির আসল নাম সোমা রায়। ‘রানি মুখার্জির’ গানে ডান্স করতে করতেই মেলার নাম রানি। রাজেরও আসল নাম ব্রিজমোহন যাদব। গোড়ায় গোবিন্দার ডান্সে হিট হতে পারেনি। পরে ডানকুনি থেকে পার্ক সার্কাস, টালাপার্ক থেকে বৈঁচি, উদয়নারায়ণপুর থেকে পান্ডুয়া মেলার মাঠে সে-ই বাদশা, শারুখ!

স্যাড সং ‘কহতে হ্যায় লোগ মুঝে রাম জানে’র অভিনয়টা সত্যি জবরদস্ত করত। বেঁটেখাটো দড়ির মতো পাকানো চেহারার ছেলেটাকে মনে মনে ভালবেসে ফেলেছিল সোমা। বার বার প্র্যাকটিস ছাড়া ওই ডান্স কেউ পারবে না। শুধু তো স্টেপ মেলানো নয়, ডায়ালগও মনে রাখা চাই! এ গানে সোমা আবার জুহি চাওলা। শাহরুখ খানের বইয়ে মদের বোতল ভেঙে হাতে কাচ ঢুকে রক্তারক্তি হত। মেলার ‘চিত্রহার’ বা ‘বুগি উগি শো’ অত বাজেট কোথায় পাবে! তার বদলে কয়েকটা কাটা টিউবলাইট মজুত। ডান্সের মাঝে ফাইটে ওটা ভাঙতেই কামধেনু কালারের গোলা ফাটিয়ে রক্ত ফিনকি দিয়ে ছুটবে! রক্তটা আসল নয়! তবে রাজ ওরফে ব্রিজমোহনের হাত, পিঠ ছেয়ে সত্যি কাটা দাগ। রাতভর শোয়ের শেষে সোমা তাতে মলম লাগিয়ে দিত!

মনে হয়, এই তো সে-দিনের কথা! সোমা খিলখিলিয়ে হাসেন, “ওই মলম লাগাতে গিয়ে আমি নিজেই মলম হয়ে গেছি!” ডান্সের মাথার ঘাম জল করা টাকায় ভদ্রেশ্বরের অ্যাঙ্গাস চটকল লাইনে জিটি রোড়ের ধারেই ঘর উঠেছে সোমা ও ব্রিজমোহনের। দু’জনের একমাত্র ছেলে বঙ্কু বারোয় পড়ল। ওরও নাচে ‘ন্যাক’! বাপ শাহরুখ খান তো ছেলে টাইগার শ্রফ। রাজ-রানির সংসার! ঘর লাগোয়া গুদাম ঘরে সঞ্চিত জীবনের ধন। ঢাউস লোহার তোরঙ্গ ভর্তি মেলার সাউন্ডের চোঙা, লাইটের সরঞ্জাম থেকে স্টেজ বাঁধার বাঁশের খুঁটি, প্যান্ডেলের গ্রিল। পড়ে থেকে যেন বোধনের আগেই বিসর্জন শেষ! দুগগোপুজো, সরস্বতী পুজো, রাসপূর্ণিমা, কালীপুজো, ইদ, বকর-ইদ, জগদ্ধাত্রী পুজো, পল্লি বিকাশ মেলা সব পুজোর প্রাণ এই চিত্রহার ডান্স। টিকিট ৩০ টাকা। মাঠ ভাড়া, ডান্সারদের খাইখরচা, টাকা মিটিয়েও মালিকের হাতে ১০-২০ থেকে ৫০ হাজার! ব্রিজ সপাটে বলেন, “টিভিতে শর্ট ড্রেসের নাচ তো সবাই দেখছে! ভদ্দরলোকের যত রাগ গরিবের নাচগানে!” মদ খেয়ে দু’এক পিস লোক অবশ্য নোংরামি করতে যায়! মেলার ডান্সারদের জন্য বাউন্সার থাকে না। বোঝাতে হয়, মেয়েগুলোর অন্য কাজের মতলব থাকলে মেলায় মেলায় ঘাম ঝরাত না। বেশি গোলমাল হলে পুলিশ আসে! গোপালনগরে মেয়েদের হাতে টিপস দিতে গিয়ে একবার একজন এমন টান মেরেছে, হ্যালোজেনে পড়ে ডান্সারটার পেট পুড়ে গেল। টেনেটুনে পাঁচ ফুটিয়া ব্রিজমোহনই কষিয়ে লাথি ঝেড়ে শয়তানটাকে টেন্টের বাইরে পাঠায়।

করোনাকালে সবই গল্পকথা! ভদ্রেশ্বর, শেওড়াফুলির ‘শারুখ’ এখন টোটোয় বসে ভাড়া খাটার ফাঁকে ‘টিকটক’ করেন। “ধার করে কেনা টোটোয় মহাজনকে ডেলি ৫০০ করে টাকা মেটাতে হবে সাত মাস! এ জীবনে আর নাচ থাকে বলুন!” গত পুজোয় ছেলেটাকে কিছু দেওয়া হয়নি। দু’বেলা টোটো চালিয়ে হাজার চারেক জমতেই দরিদ্র বাপের স্নেহ শ্রীরামপুরের মার্কেটে ছুটেছে।

তখন বঙ্কুকে ভদ্রেশ্বরে মা, বৌদির কাছে রেখে পুরো পুজো কলকাতায় পরাণটা পুড়ত সোমার। রাতভর শো সেরে দুপুরে মেয়েরা দল বেঁধে শিয়ালদহ, গিরিশ পার্কে ঠাকুর দেখে। সোমার ইচ্ছে করে না। তবু তার বর সঙ্গে! ছেলেকেও দেখার কেউ আছে। মল্লিকপুরের পিঙ্কি বিবির বর তালাক দিয়েছে। পিঙ্কির কোলের ছেলেটা চিত্রহারের টেন্টেই মাসিদের আদরে ডাঁটো হয়ে উঠল। ডান্সের রোজগারেই কিশোর গুড্ডুকে হস্টেলে দিয়েছে একলা মা! সোমাকে ফোন করেছিলেন পিঙ্কি। ‘‘কে জানে, মেলা কবে হবে! আমি পুজোয় আবার দ্বারভাঙা যাচ্ছি। এক মাস থাকব। গুড্ডুকে হস্টেলে রসগোল্লা খাইয়ে এসেছি! ছেলেটা বড় হওয়া অবধি আমার ছুটি নেই!”

আগে পটনা, হাজিপুর, দ্বারভাঙার শোয়ে ডান্সার মেয়েদের নিয়ে গিয়েছে ব্রিজমোহন। সে বড় ঝামেলির কাজ! টাকা বেশি! তবে মেয়েদের খাটনির মা-বাপ নেই! সোমার বোন পায়েল আর উত্তরপাড়ার মৌসুমি ভদ্র ওরফে গুডিয়া রানি নিজের চোখে দেখেছে, বাহুবলীরা স্টেজের সামনে ফায়ারিং করছে! ব্রিজ বলেন, “কোত্থেকে কী লাফড়া হয়! এতগুলো মেয়ের আমি গার্জেন। বিহারে যাব না। টোটো চালাই!” ডান্সের দলের হৃতিক ব্রিজের ভায়রাভাই বুবাই করও আনাজ বেচে! দেব ওরফে দেবরঞ্জন রায়ের নৈহাটিতে চা-বিস্কুটের দোকান। থেকে থেকে আফসোস, পেটটা বেড়ে নেটের কস্টিউম টাইট হয়ে গেল! অশক্ত মা-বাপের চিকিৎসার কী হবে, জানে না গুড়িয়া রানিও! বাড়ি বসে শুধু ভোজপুরি গানে ডান্সের ভিডিয়ো তুলে পাঠায়!

রানিহাটির একটা লোক বলেছিল চিত্রহার লাগাবে। কিন্তু আগাম ২০ হাজার চাই! শুনে ব্রিজের মাথায় হাত। ভরসা, খুচখাচ স্টেজ শো! মেলা লাইনে দীর্ঘশ্বাস, পুজো না-হোক জগদ্ধাত্রী পুজোয় কী মুখ তুলে চাইবে ঠাকুর! পাবলিকের খৈনির প্যাকেট, সিগারেটের টুকরো ছড়ানো তাঁবুর মঞ্চটা শুধু চোখে ভাসে রাজ, রানি, গুড়িয়া, হৃতিকের! সাক্ষাৎ সরস্বতীর থান! ধুপধুনো, ফুল নেই। মেলায় টেন্টের আলো-আঁধারিতে থকথক করে ঘাম আর দেশি দারুর গন্ধ। পুজোরই গন্ধ! “মা সস্বোতির দিব্যি, শোয়ে একবার নামলে আমরা ফের হিট হবই দেখবেন!” রংচটা লালসাদা দাড়ি, মলিন নাইটি, কালোকোলো মেদ-জমা হৃতিক, রানি, শারুখ, শ্রীদেবীদের আড়ালে কথা বলে গন্ধর্ব, অপ্সরার দল।

Durga Puja 2021
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy