জন্মদিনে ছেলেকে নিয়ে গঙ্গাস্নানে গিয়েছিলেন মা। তিনি ফিরলেও ঘরে ফিরল না ছেলে।
মঙ্গলবার বেলা ১১টা নাগাদ কাটোয়ার কালীবাড়ি ঘাটে স্নান করে উঠে মায়ের কথায় জারে গঙ্গাজল ভরে নিতে নদীতে নেমেছিল উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী সৌরভ মণ্ডল। কোনও ভাবে পাথরে পা পিছলে জলে পড়ে যায় সে। চিৎকার, হট্টগোল, শাড়ি ফেলে বাঁচানোর চেষ্টা চলে। দিনভর বিপর্যয় মোকাবিলা দফতরের চার সদস্যের দল ভাগীরথীতে তল্লাশি চালায়। তবে রাত পর্যন্ত হদিস মেলেনি সৌরভের।
এ দিনের ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে, ঘাটের নিরাপত্তা নিয়ে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, দু’বছরে অন্তত তিন জনের মৃত্যু হয়েছে এ ঘাটে। তবু পাড়ে পর্যাপ্ত বোল্ডার ফেলা, জাল দিয়ে ঘেরা কিছুই হয়নি। নজরদারির ব্যবস্থা থাকলে তরতাজা ছেলেটার তলিয়ে যাওয়া ঠেকানো যেত বলেও তাঁদের দাবি।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রতিবারের মতোই ছেলেকে নিয়ে খ্যাপাকালী মন্দিরে পুজো দিতে বেরিয়েছিলেন সুলেখাদেবী। লাল স্কুটিতে মাকে চাপিয়ে সৌরভ প্রথমে দেবরাজ ঘাটে যায়। সেখানে ভিড় থাকায় তাঁরা কালীবাড়ি ঘাটে আসেন স্নান সারতে। প্রত্যক্ষদর্শী গঙ্গা দাসবৈরাগ্য, মৌমিতা ভট্টাচার্যেরা জানান, স্নান সেরে ঘাটে দাঁড়িয়েছিলেন সুলেখাদেবী। স্নান হয়ে গিয়েছিল কাশীরামদাস বিদ্যায়তনের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র সৌরভেরও। সে ঘাটে উঠতেই জার দিয়ে সৌরভকে জল ভরতে বলেন সুলেখাদেবী। বিপত্তি ঘটে তখনই। কোমরে গামছা বাঁধা অবস্থায় পাথরে পা দিয়ে একটু নামতেই পা পিছলে যায় সৌরভের। সুলেখাদেবীর চিৎকারে ছুটে আসেন ঘাট লাগোয়া বাসিন্দা গুড্ডি দাসবৈরাগ্য। তাঁর কথায়, ‘‘চিৎকার শুনে গিয়ে দেখি জলের মাঝে ছেলেটা ডুবে যাচ্ছে। হাত দুটো মাথার উপরে তোলা। সঙ্গে সঙ্গে একটা শাড়ি জলে ছুঁড়ে দিই। কিন্তু বাঁচাতে পারলাম না।’’ ঘাটে গিয়ে দেখা গিয়েছে, সৌরভের মা-মাসির পাশে বসে একনাগাড়ে কেঁদে চলেছেন গুড্ডিদেবীও। তাঁর আক্ষেপ, ‘‘শাড়িটার একটা কোনা ধরতে পেরেছিল ছেলেটা। তাতেও বেশ কিছুটা টানার চেষ্টা করি। কিন্তু ও হাত ছেড়ে দেয়।’’ ধারেকাছে আর কয়েক জন থাকলে হয়তো বা বাঁচানো যেত বলেও তাঁর আক্ষেপ।
বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় মিনিট দশ-পনেরো অন্তর অন্তর জ্ঞান হারাচ্ছেন সুলেখাদেবী। সৌরভের বাবা পেশায় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের নিরাপত্তারক্ষী প্রশান্ত মণ্ডল জানান, সামনেই উচ্চ মাধ্যমিক ছিল ছেলেটার। বিজ্ঞান নিয়ে পড়ছিল। বরাবরই মেধাবী ছাত্র ছিল। প্রস্তুতি নিচ্ছিল জোরকদমে। তাঁর আক্ষেপ, ‘‘ওরা ঘাটে না গেলে হয়তো এমনটা ঘটতো না।’’
এ দিকে, এমন দুর্ঘটনার পরেও প্রশাসনের কর্তারা একে অন্যের ঘাড়ে দায়িত্ব ঠেলে দায় এড়িয়েছেন। নিরাপত্তা নিয়ে কাটোয়ার পুরপ্রধান অমর রামের জবাব, ‘‘ঘাট পুরসভার হলেও তাতে কতটা গভীরতা অন্তর কত পরিমান বোল্ডার দেওয়া দরকার তা দেখার দায়িত্ব সেচ দফতরের।’’ পাল্টা মহকুমা সেচ আধিকারিক প্রদীপ দাসের সাফ জবাব, ‘‘নিরাপত্তা নিয়ে কোনও অভিযোগ আসেনি। গণবিজ্ঞপ্তি পেলে ব্যবস্থা নেব।’’