কাঠ কিনলে দিতে হত ‘কাটমানি’। কত টাকার কাঠের জন্য কাটমানি কত, তার ‘দরও’ ধার্য করা ছিল। এ ছাড়া, বেশ কিছু কাঠ ব্যবসায়ীর থেকে নিয়মিত ‘মাসোহারার’ বন্দোবস্তও ছিল। বন দফতরের মেমারির বিট অফিসারের বিরুদ্ধে এমন নানা অভিযোগ জমা পড়েছে জেলা বন দফতর, বর্ধমানের অরণ্য ভবনে। অভিযোগকারী সংগঠন মেমারির কাঠ ব্যবসায়ী সমিতির দাবি, ওই আধিকারিক মেমারিতে থাকলে তাঁদের পক্ষে ব্যবসা করা কঠিন হয়ে যাবে। এ দিকে, অভিযোগের তদন্ত যিনি করছিলেন, সেই বর্ধমানের রেঞ্জারকে আচমকা সোমবার বীরভূমে বদলি করে দেওয়ায় ‘অরণ্য ভবনে’ শোরগোল পড়েছে। অথচ যাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি বহাল তবিয়তে মেমারিতেই রয়েছেন। রাজ্য বন দফতরের এক কর্তা বলেন, “তদন্ত রিপোর্ট জমা পড়েছে। বর্ধমানের অরণ্য ভবন থেকে তা রাজ্যে পাঠানো হয়েছে। রিপোর্টের পর্যালোচনা চলছে।”
অরণ্য ভবন সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালে মেমারির বিট অফিসার পদে যোগ দেন বিজু শর্মা। সেই থেকে কখনও সরাসরি কাঠ ব্যবসায়ীদের থেকে ‘কাটমানি’, কখনও জনৈক নূরের মাধ্যমে কাঠ ব্যবসায়ীদের থেকে ‘মাসোহারা’ আদায় করা হচ্ছিল বলে অভিযোগ জমা পড়েছিল। জেলা বনাধিকারিক, বর্ধমানের রেঞ্জ অফিসারের উদ্দেশ্যে মেমারির কাঠ ব্যবসায়ী পরিচয় দিয়ে মিলন হালদার, রাজু মল্লিক, তারাশঙ্কর গায়েন, ভগীরথ বাগচি-সহ প্রায় ২০ জনের স্বাক্ষরিত একটি অভিযোগপত্র অরণ্য ভবনে জমা পড়ে। সেখানে লেখা ছিল, ‘মেমারির বিট অফিসার বিজু শর্মা অনৈতিক ভাবে কাঠ ব্যবসায়ীদের থেকে চাপ দিয়ে টাকা নেন। তোলাবাজি, মাসোহারা আদায় করেন। প্রত্যেক কাঠ ব্যবসায়ীর কাছে দু’আড়াই লক্ষ টাকা মাসোহারা আদায় করে থাকে। কিছু অসাধু ব্যবসায়ীও এই ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত রয়েছে।’
কলকাতা থেকে বদলি হয়ে আসা রেঞ্জার অনিবাণ মিত্রকে তদন্তের দায়িত্ব দেন ডিএফও সঞ্চিতা শর্মা। অরণ্য ভবন সূত্রে জানা যায়, গত সপ্তাহে রিপোর্ট জমা পড়েছে। তদন্তপর্বে মেমারির ২৭ জন কাঠ-ব্যবসায়ী, আসবাবপত্রের ব্যবসায়ীদের বয়ান নিয়েছেন তদন্তকারী। তাঁরা জানিয়েছেন, বিট অফিসার তাঁদের থেকে কাঠের দাম অনুযায়ী নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা কাটমানি নিতেন। এ ছাড়াও সরকারি প্রতিষ্ঠানের গাছ কিনলেও তাঁকে তোলা দিতে হত। ইউপিআইয়ের মাধ্যমে হওয়া লেনদেনের ‘স্ক্রিন শট’ পেয়েছিলেন তদন্তকারী অফিসার। বিট অফিসের এক কর্মীর অ্যাকাউন্টে টাকা জমা পড়ত, এমন তথ্য ও নথি পেয়েছিলেন তদন্তকারী আধিকারিক। তাঁর জমা দেওয়া রিপোর্ট পর্যালোচনার জন্য রাজ্যে পাঠিয়েছেন ডিএফও।
তদন্তকারী অফিসারের কাছে অভিযুক্ত বিট অফিসার ‘নো কমেন্টস’ বলে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ, প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়েছিলেন। একই ভাবে তিনি বুধবার সকালে বলেন, “আমি এ নিয়ে কোনও কিছু বলব না।” বিট অফিসে অভিযুক্ত ‘ডিউটি’ করছেন। অথচ তদন্তকারী অফিসারকে দশ মাসের মধ্যে বীরভূমে বদলি করা নিয়ে ‘অরণ্য ভবনে’ প্রশ্ন উঠছে। দুর্নীতি প্রমাণ করার জন্যই কি তাঁকে বদলি করা হল? রাজ্যের ওই আধিকারিকের দাবি, “তদন্ত প্রক্রিয়ায় কেউ বাধা দেননি। উনি তদন্ত রিপোর্ট জমা দেওয়ার পরেই নিয়ম মাফিক বদলি হয়েছেন। বদলির সঙ্গে তদন্তের কোনওযোগ নেই।”
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)