Advertisement
E-Paper

দলের কার্যালয় গড়তে টাকা তোলার নালিশ

দলীয় কার্যালয় তৈরির নামে ইন্দিরা আবাস যোজনার উপভোক্তাদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠল কালনা ১ ব্লকের তৃণমূল পরিচালিত নান্দাই পঞ্চায়েতের প্রধানের বিরুদ্ধে। সম্প্রতি এই পঞ্চায়েতের নতুনগ্রাম এলাকার তিন বিপিএল তালিকাভুক্ত ব্যক্তি এ ব্যাপারে কালনার মহকুমাশাসক এবং বিডিও-র কাছে অভিযোগ দায়ের করেছেন। যদিও অভিযোগ ইড়িয়ে দিয়েছেন প্রধান তাপসী হাঁসদা।

কেদারনাথ ভট্টাচার্য

শেষ আপডেট: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৫ ০১:১২

দলীয় কার্যালয় তৈরির নামে ইন্দিরা আবাস যোজনার উপভোক্তাদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠল কালনা ১ ব্লকের তৃণমূল পরিচালিত নান্দাই পঞ্চায়েতের প্রধানের বিরুদ্ধে। সম্প্রতি এই পঞ্চায়েতের নতুনগ্রাম এলাকার তিন বিপিএল তালিকাভুক্ত ব্যক্তি এ ব্যাপারে কালনার মহকুমাশাসক এবং বিডিও-র কাছে অভিযোগ দায়ের করেছেন। যদিও অভিযোগ ইড়িয়ে দিয়েছেন প্রধান তাপসী হাঁসদা।

এর আগে বহুবার শাসকদলের বিরুদ্ধে তোলা চাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। কখনও শিল্পতালুক থেকে আবার কখনও ঠিকাদারদের উপ জুলুমেরও অভিযোগ উঠেছে। এমনকী ইন্দিরা আবাস যোজনার টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও আগে করেছেন দুপসা এলাকার কয়েকজন। ২০১৪ সালে ১০ নভেম্বর মহকুমাশাসকের কাছে তাঁরা অভিযোগ করেন, ঘর করার টাকা নিয়ে ব্যাঙ্ক থেকে বেরোতেই এক নেতার লোকজন তা হাতিয়ে নিচ্ছে। তৃণমূল সূত্রে খবর সে বার বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়েছিলেন মন্ত্রী স্বপন দেবনাথ। তাঁর হস্তক্ষেপেই এক নেতা গরিব মানুষের টাকা ফেরত দিতে বাধ্যও হন। তবে এ বারের বিষয়টি যোগাযোগ করা হলেও পাওয়া যায়নি মন্ত্রীকে।

পূর্বস্থলী দক্ষিণ কেন্দ্রের নান্দাই পঞ্চায়েতটি প্রথমে সিপিএমের দখলে থাকলেও পরে প্রধান, উপপ্রধান-সহ বেশ কয়েকজন দলত্যাগ করেন। ক্ষমতা পায় তৃণমূল। তারপর এক দিকে শাসকদলের গোষ্ঠীদন্দ্ব, অন্য দিকে নানা দুর্নীতির অভিযোগে বারবার নাম উঠে আসে পঞ্চায়েতের। তার মধ্যেই ১৮ সেপ্টেম্বর নতুনগ্রাম সংসদ এলাকার বাবর আলি মল্লিক, গোলাম আলি শেখ এবং আতর আলি মোল্লা কালনা ১ এর বিডিও এবং মহকুমাশাসকের কাছে অভিযোগ করে জানান, চলতি আর্থিক বছরে ইন্দিরা আবাস যোজনায় নতুন ঘর তৈরির জন্য প্রথম কিস্তির ৩৫ হাজার টাকা পেয়েছেন তাঁরা। কিন্তু ১৪ সেপ্টেম্বর এলাকার একটি ব্যাঙ্ক থেকে ওই টাকা তুলে বেরোনোর সময় প্রধানের লোকজন টাকা গুণে দেওয়ার নাম করে পাঁচ হাজার টাকার করে নিয়ে নেয়। প্রতিবাদ করলে জানায়, প্রধানের নির্দেশেই এমন করা হয়েছে। ব্যাপারটি জানাজানি হলে দ্বিতীয় কিস্তির টাকা মিলবে না বলেও হুমকি দেয়। অভিযোগপত্রে ওই তিন জনের দাবি, এরপরে প্রধানের কাছে বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে গেলে প্রধান হুমকির সুরে জানিয়ে দেন, শুধু তাঁদের কাছেই নয়, গ্রামের প্রত্যেক ইন্দিরা আবাস যোজনার উপভোক্তাদের কাছ থেকেই টাকা নেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় গাবতলায় তৃণমূলের কার্যালয় তৈরির জন্য দলের নির্দেশেই এমনটা করা হচ্ছে বলেও দাবি করেন প্রধান।

Advertisement

এলাকার খরিনান গ্রামের চার ইন্দিরা আবাস যোজনার উপভোক্তা বাবু মান্ডি, কাশীরাম মান্ডি, লক্ষ্মণ মান্ডি এবং ইসরাক মণ্ডলও গত সোমবার একই অভিযোগ নিয়ে এলাকার বিধায়ক তথা রাজ্যের ক্ষুদ্র, কুটির শিল্প ও প্রাণিসম্পদ দফতরের মন্ত্রী স্বপনবাবুর কাছে যান। তাঁদের দাবি, মন্ত্রীকে তাঁরা জানান যে তাঁদের কারও কাছ থেকে কার্যালয়ের জন্য সাত হাজার আবার কারও কাছে ন’হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে। পরের কিস্তির টাকা পেতে বাধ্য হয়েই টাকা দিয়েও দিয়েছেন তাঁরা। তাঁদের দাবি, এলাকার এক তৃণমূল পঞ্চায়েত সদস্যর ঘনিষ্ঠ দুই একশো দিনের প্রকল্পের সুপারভাইজার তাঁদের কাছে ওই অর্থ নিয়েছে। মন্ত্রী বিষয়টি বিশদে তদন্ত করার আশ্বাস দিয়েছেন বলেও তাঁদের দাবি।

এ দিকে গরিব মানুষের ঘর তৈরির টাকায় কীভাবে নেতাদের পকেট ভরছে খুঁজতে গিয়ে জানা গেল, ঘর পেতে গেলে প্রথমেই নাম থাকতে হবে বিপিএল তালিকায়। ব্লক প্রশাসনের তরফে সংশ্লিষ্ট পঞ্চায়েতগুলিকে সংখ্যা জানিয়ে তালিকা পাঠাতে বলা হয়। পঞ্চায়েত বিভিন্ন সংসদ মিলিয়ে ওই তালিকা তৈরি করে। পঞ্চায়েত সমিতি থেকে তালিকা যায় জেলা প্রশাসনের কাছে। এরপরে উপভোক্তাদের অ্যাকাউন্টে পৌঁছয় টাকা। বর্তমানে ঘর তৈরির জন্য ৭০ হাজার টাকা নগদ এবং একশো দিনের প্রকল্পে উপভোক্তাকে নিজের বাড়ি বানানোর জন্য ৯০ দিনের কাজের অর্থ দেওয়া হয়। তিনটি ধাপে উপভোক্তারা টাকা পান। প্রথম কিস্তিতে ৩৫ হাজার, দ্বিতীয় এবং তৃতীয় কিস্তিতে যথাক্রমে ২৫ এবং ১০ হাজার টাকা মেলে। প্রথম কিস্তির পরে ঘর তৈরির ভিত সহ বেশ কিছুটা অংশের ছবি পাঠাতে হয় উপভোক্তাদের। ছবি এবং ঘর ঠিকঠাক হয়েছে কি না তা দেখে রিপোর্ট পাঠায় পঞ্চায়েত। নান্দাই পঞ্চায়েত এলাকায় এ বার ১৭৭ জন এই প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। শাসকদলের একাংশের খবর, এই প্রকল্পে উপভোক্তাদের কাছে টাকা নেওয়া হচ্ছে দু’ভাবে। প্রথমে পরের কিস্তির টাকা পেতে ঝামেলায় পড়তে হবে এই হুমকি দিয়ে টাকা নেওয়া হচ্ছে। তারপরে আগের তালিকায় যাঁদের ঘর তৈরি হয়েছে তাঁদের নাম নতুন তালিকায় ঢোকানো হচ্ছে।

কালনা ১ ব্লক প্রশাসন সূত্রে খবর, মির্জাপুর সংসদ থেকে এরকম একটি অভিযোগ পেয়ে দু’জনের নামে তদন্ত শুরু হয়। এরপরেই ওই দু’জনেরই নাম তালিকা থেকে বাদ যায়। নান্দাই এলাকার এক তৃণমূল নেতা বলেন, ‘‘বিপিএল তালিকা তো ভুলে ভরা। অনেক বিত্তবান লোকেদের নাম ঢুকে রয়েছে এই তালিকায়। ফলে তাঁদের নাম তালিকায় ঢুকিয়ে দিয়ে ভাগাভাগি করে ভাল টাকা হাতানো আর কি এমন কঠিন!’’

তবে টাকা তোলার অভিযোগ নিয়ে কালনা ১ ব্লকের তৃণমূল সভাপতি উমাশঙ্কর সিংহ রায় বলেন, ‘‘নান্দাই এলাকায় আমাদের দলীয় কার্যালয় রয়েছে। তাছাড়া দল কোনও অনৈতিক কাজকে সমর্থন করে না। আমার কাছে এ ব্যাপারে কেউ অভিযোগ জানাননি। জানালে তদন্ত হবে।’’ নান্দাই পঞ্চায়েতের প্রধান তাপসী হাঁসদার অবশ্য বক্তব্য, ‘‘অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। কোনও উপভোক্তাদের কাছ থেকে অনৈতিক অর্থ নেওয়া হয়নি।’’ তাঁর দাবি, ‘‘হয়তো আমায় পছন্দ করেন না এমন লোকেদের এটা ষড়যন্ত্র।’’

কালনার মহকুমাশাসক সব্যসাচী ঘোষ জানান, নান্দাইয়ের অভিযোগটি নিয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে। তবে জেলা প্রশাসনের আর এক আধিকারিকের কথায়, ‘‘এ আর নতুন কি। নান্দাইয়ের মতো উদাহরণ ভুরি ভুরি রয়েছে। যেখানে শাসকদলের অন্তর্কলহ চরম পর্যায়ে পৌঁছায় সেখানে লিখিত অভিযোগ জমা পরে।’’

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy