মঙ্গলবার বিকেল বিকেলই শিয়ালদহ পৌঁছেছিল ট্রেনটা। কিন্তু সংবর্ধনার বন্যা সামলে রাত গড়িয়ে ঘরে ফিরল ঘরের ছেলে। প্রিয়জনের উষ্ণ অভ্যর্থনায় ঢেকেছে দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি। সাফল্যের আলোয় ম্লান হয়েছে সাত হাজার মিটারেরও বেশি উচ্চতার প্রখর রোদ-বরফে পোড়া চামড়ার ছোপগুলো।
এ ভাবেই স্বপ্ন সত্যি করে, জম্মু-কাশ্মীরের নুন পর্বতশৃঙ্গ ছুঁয়ে দুর্গাপুরে ফিরলেন পানাগড়ের রোহিত মজুমদার। কৃষ্ণনগরের ‘মাউন্টেনিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন অফ কৃষ্ণনগর’ (ম্যাক) এবং বাংলাদেশের ‘কোওকাডন’ নামে এক সংস্থা যৌথ ভাবে অভিযান চালায় কারাকোরামের সাত হাজার ১৩৫ মিটার উচ্চতার এই শৃঙ্গে। ম্যাকের সম্পাদক অশোক রায় বললেন, ‘‘পর্বতারোহী মহলে নুন শৃঙ্গ জয় করা বিশেষ কৃতিত্বের বলেই মনে করা হয়।’’ কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করা রোহিতের পর্বতারোহণে আগ্রহ জন্মায় বছর তিনেক আগে। পড়াশোনা শেষ করে পারিবারিক ব্যবসায় যোগ দিয়েছিলেন তিনি। জানালেন, ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সময় পর্বতারোহণের গল্প শুনেছিলেন শিক্ষক প্রোজ্জ্বল দত্তের কাছে। ২০১২ সালে প্রোজ্জ্বলবাবু পরামর্শ দেন, ম্যাক-এর এভারেস্ট, কাঞ্চনজঙ্ঘা ও অন্নপূর্ণা শৃঙ্গ আরোহী বসন্ত সিংহরায়ের কাছ থেকে এ ব্যাপারে পরামর্শ নিতে। তখনই ম্যাক-এ যোগাযোগ করেন পানাগড়ের রোহিত মজুমদার। পুরুলিয়ার বেরো পাহাড়ে সেরে ফেলেন রক ক্লাইম্বিং কোর্স। পরে এক মাসের বেসিক মাউন্টেনিয়ারিং কোর্সও করে নেন তিনি। এ’বছরের প্রথম দিকে ম্যাকের তরফে নুন শৃঙ্গ অভিযানের খবর পেয়েই মানসিক প্রস্তুতি শুরু করে দেন রোহিত। শেষ পর্যন্ত ম্যাকের অভিযাত্রী দলের অন্যতম সদস্য হিসেবে ২৩ জুন বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েন ওই অভিযানের উদ্দেশে।
কৃষ্ণনগরের ম্যাক ও বাংলাদেশের কোওকাডন মিলিয়ে মোট ২২ জন অভিযাত্রীর একটি দল জম্মু থেকে যাত্রা শুরু করে ২৩ জুন। ২৪ জুন তাঁরা পৌঁছন কার্গিল থেকে ৮০ কিমি দূরত্বের টোঙ্গলে। গাড়ির রাস্তা ফুরিয়েছে সেখানেই। এক দিন বিশ্রাম নেওয়ার পরে ২৬ জুন শুরু হয় শৃঙ্গের উদ্দেশে পাহাড়ি পথে ট্রেকিং। ৬ জুলাই রাত ১ টা নাগাদ শুরু হয় শৃঙ্গের উদ্দেশে শেষ দিনের যাত্রা, সামিট মার্চ। ৭ জুলাই সকাল পৌনে ৮ টা নাগাদ নুন শৃঙ্গে পা রাখেন রোহিত-সহ ছ’জন বাঙালি অভিযাত্রী। তাঁদের মধ্যেই এক জন বাংলাদেশি। বসন্ত সিংহ রায়ের নেতৃত্বে ম্যাকের এই সফল অভিযানটি ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রীর ক্ষেত্রেও একটি অন্যতম ফলক হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে।
দীর্ঘ অভিযানের ক্লান্তি কাটিয়ে বৃহস্পতিবার থেকে আবার স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফিরেছন রোহিত। ভবিষ্যতে বারবার পর্বত অভিযানে যেতে চান তিনি। বললেন, ‘‘ইচ্ছে আছে আরও বেশি উচ্চতার শৃঙ্গে চড়ার। নুন শৃঙ্গই আমার জীবনের প্রথম অভিযান। এমন একটা অভিযানের অংশ হতে পারা দারুণ অভিজ্ঞতা।’’
পাশাপাশিই রোহিতের আক্ষেপ, পানাগড়ের অনেক তরুণই চায় পর্বতারোহণের সঙ্গে যুক্ত হতে। কারও বা মাসাধিক কাল ধরে পর্বতারোহণের প্রশিক্ষণ নেওয়ার সময় নেই। কারও আবার আর্থিক সামর্থ্য নেই। রোহিতের দুই দিদির বিয়ে হয়ে গিয়েছে। বাড়ির ছোট ছেলে রোহিত। তাঁর বাবা রথীনবাবু ও মা ডলিদেবী বললেন, ‘‘ওকে আটকে রাখার চেষ্টা করে লাভ নেই। পানাগড়ের মুখ উজ্জ্বল করেছে ও।’’