রাস্তা সম্প্রসারণে ফুটপাতে থাকা পানের গুমটি উচ্ছেদ হয়ে গিয়েছিল বাবার। মুড়ি খেয়ে মাধ্যমিক পরীক্ষায় বসে প্রাপ্তি ছিল ৬২৮ নম্বর। সংসারের অভাবকে সঙ্গী করে তারপরও উচ্চ মাধ্যমিকে বিজ্ঞান নিয়ে পড়েছিল সে। আর এ বার ৪৪০ নম্বর পেয়ে পরিবারের সকলের মুখে হাসি ফুটিয়েছে অমিত বেরা।
রেলশহরের কৌশল্যার হরিমন্দির এলাকার বাসিন্দা অজয় বেরা ও ঝুমা বেরার একমাত্র ছেলে অমিত। ছোট থেকে ছেলেকে নিয়ে দু’চোখ জুড়ে স্বপ্ন ছিল অভাবী বাবা-মায়ের। কিন্তু উদ্যোগী ছেলের একের পর সাফল্যে আর্থিক সংস্থানের চিন্তায় কপালে ভাঁজ পড়েছে বেরা দম্পতির। একমাত্র সম্বল পানের গুমটি উচ্ছেদ হয়েছে বছর চারেক আগে। সে সময়ের কথা ভেবে এখনও শিউরে ওঠেন ঝুমা বেরা। তবে বর্তমানে অজয়বাবু স্থানীয় একটি ধাতব সরঞ্জাম নির্মাণের কারখানায় শ্রমিকের কাজ করেন। মাসিক আয় গড়ে ৫ হাজার টাকা। এই টাকায় সংসার চালানোই কঠিন। এরই মধ্যে খড়্গপুরের সিলভার জুবিলি হাইস্কুলের ছাত্র অমিত বিজ্ঞান নিয়ে পড়ে উচ্চ মাধ্যমিকে পেয়েছে ৪৪০।
অমিতের মা ঝুমাদেবীর বক্তব্য, “সংসারে অভাব নিয়েই ছেলে উচ্চ মাধ্যমিকে এত ভাল নম্বর পেল। তবে ভয় লাগছে আর ছেলেকে পড়াতে পারব তো!” অমিতের কথায়, “জয়েন্ট দিয়েছি। তবে আমার ইচ্ছে যাদবপুর থেকে পদার্থবিদ্যায় পড়াশুনো করে ভবিষ্যতে গবেষণা করার।” অজয়বাবু বলেন, “যেটুকু কষ্ট করি সবটা ছেলের জন্য। জানি ছেলে অন্ধকার থেকে আলো জ্বালাবে। তার জন্য যদি নিজের ভিটে বাড়ি বিক্রি করতে হয় করব।” স্কুলের প্রধান শিক্ষক শিথিকন্ঠ দে বলেন, “আমরা স্কুল থেকে ওঁকে সাহায্য করার চেষ্টা করেছি। ভবিষ্যতে যদি ওকে কোনওভাবে সাহায্য করতে পারি পিছুপা হব না।”
নিজে কখনও সাহায্য পায়নি, তাই শিক্ষিকা হয়ে দু:স্থদের পাশে দাঁড়াতে চায় উচ্চ মাধ্যমিকে কৃতী কণিকা সিংহ। খড়্গপুরের ইন্দা কৃষ্ণলাল শিক্ষা নিকেতনের ছাত্রী কণিকা উচ্চ মাধ্যমিকে কলা বিভাগে ৩৭১ নম্বর পেয়েছে। ভূগোল তার প্রিয় বিষয়।।
কণিকার বাবা রেনুকান্ত সিংহ দিনমজুরের কাজ করেন। মাসের মধ্যে অর্ধেক দিনই কাজ মেলেনা। মা সরস্বতী সিংহ কয়েকটি বাড়িতে কাজ করেন। কণিকার ভূগোল পড়ার ইচ্ছে কতটা সামলানো যাবে, তা নিয়ে দিশেহারা রেনুকান্তবাবু বলেন, “আমি কলেজ পাশ করেও দিনমজুরের কাজ করছি। কিন্তু আমার ইচ্ছে মেয়ে উচ্চশিক্ষিত হয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াক।” সরস্বতীদেবী বলেন, “মেয়ের ভাল নম্বরে খুশি হয়েছি। কিন্তু ওর ভবিষ্যত আমাদের আর্থিক অবস্থার কাছে হার মানবে ভেবে কান্না পাচ্ছে।” কণিকার কথায়, “আমি কোনওদিন কারও সাহায্য পাইনি। তাই ভূগোল নিয়ে পড়ে শিক্ষিকা হয়ে এই দরিদ্র মানুষদের পাশে দাঁড়াতে চাই। কিন্তু জানিনা বাবা পারবেন কি না। না হলে অর্থনীতি নিয়েই পড়তে হবে।” স্কুলের প্রধান শিক্ষক পার্থ ঘোষ বলেন, “কণিকার যে বিষয় নিয়ে পড়ার ইচ্ছে পড়ুক। আর্থিক সঙ্কট ওর পড়াশোনায় বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। স্কুল কণিকার পাশে থাকবে।”