বিজেপির একটি রুদ্ধদ্বার বৈঠক এবং সেখানে রাজ্য বিজেপির এক শীর্ষনেতার অনুপস্থিতি ঘিরে জল্পনা। বৈঠক বসেছিল বৃহস্পতিবার কলকাতায় জাতীয় গ্রন্থাগারের অতিথি নিবাসে। রাজ্য বিজেপির সর্বোচ্চ নেতৃত্ব এবং কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষকদের মধ্যে বৈঠক। সেই গোত্রে যাঁরা পড়েন, তাঁদের মধ্যে এক জন ছাড়া প্রত্যেকে সেখানে হাজির ছিলেন। অনুপস্থিত ছিলেন রাজ্য বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। বৈঠকে বিধানসভা নির্বাচনের প্রার্থিতালিকা নিয়ে ‘অত্যন্ত জরুরি’ আলোচনা হয়েছে বলেই বিজেপি সূত্রের দাবি। তা সত্ত্বেও শুভেন্দুর অনুপস্থিতি নিয়ে জল্পনা এবং কাটাছেঁড়া শুরু হয়েছে। কারণ, শুভেন্দু ওই বৈঠকের সময় শহরেই ছিলেন।
রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য, প্রাক্তন সভাপতি তথা রাজনীতি বিষয়ক বিভাগের প্রধান সুকান্ত মজুমদার, সংগঠন সম্পাদক অমিতাভ চক্রবর্তী, যুগ্ম সংগঠন সম্পাদক সতীশ ঢোন্ড রাজ্য দলের তরফে ওই বৈঠকে ছিলেন। আর কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের তরফে ছিলেন সুনীল বনসল, ভূপেন্দ্র যাদব, মঙ্গল পাণ্ডে, বিপ্লব দেব এবং অমিত মালবীয়। ওই বৈঠকের বিষয়ে বিজেপি আনুষ্ঠানিক ভাবে কোনও বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেনি। ফলে আলোচ্যসূচি সম্পর্কেও বিজেপি নেতাদের তরফে প্রকাশ্য মন্তব্য করা হয়নি। বিজেপির অন্যান্য বৈঠকের ক্ষেত্রে যেমন ছবি প্রকাশ করা হয়, বৃহস্পতিবারের বৈঠকের ক্ষেত্রে তা-ও করা হয়নি। কিন্তু জাতীয় গ্রন্থাগারে সকাল ১১টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত বৈঠক চলেছে (সাড়ে ৮টার পরে এক কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষক শুধু বেরিয়ে গিয়েছিলেন)। বৈঠকের দৈর্ঘ্যেই তার গুরুত্বের পরিচয় রয়েছে।
বিজেপি সূত্রের দাবি, বিধানসভা আসন ধরে ধরে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নাম নিয়ে আলোচনা হয়েছে বৈঠকে। এমন বৈঠকে রাজ্য বিজেপির অন্যতম প্রধান ‘মুখ’ হিসাবে শুধু নয়, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগ্রহণকারী হিসাবেই শুভেন্দুর থাকার কথা। কারণ, প্রথমত তিনি বিরোধী দলনেতা। দ্বিতীয়ত, রাজ্য বিজেপির প্রথম সারিতে থাকা অন্য দুই মুখ শমীক বা সুকান্ত বিধানসভা ভোটে লড়বেন না। শুভেন্দু নিজে বিধানসভা ভোটে তো লড়বেনই। অন্য যাঁরা লড়বেন, এই মুহূর্তে তাঁদের দলনেতাও শুভেন্দুই।
বৈঠকের গুরুত্ব সম্পর্কে শুভেন্দু অবহিত ছিলেন না, এমন নয়। দলকে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ কোনও বার্তা দিতে চাওয়াই তাঁর অনুপস্থিতির কারণ কি না, তা নিয়ে জল্পনা শুরু হয়েছে। সেই বার্তা প্রার্থিতালিকায় তাঁর পছন্দ-অপছন্দের গুরুত্ব সংক্রান্ত কি না, আলোচনা শুরু হয়েছে তা নিয়েও। শুভেন্দুর নিজের জেলা পূর্ব মেদিনীপুরের বিধানসভা আসনগুলিতে প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে শেষ কথা যে শুভেন্দুই বলবেন, তা বিজেপিতে একটি ‘প্রকাশ্য গোপন কথা’। নেতৃত্বেরও সে বিষয়ে কোনও আপত্তি নেই বলেই খবর। কিন্তু বিজেপির একটি সূত্রের দাবি, সম্প্রতি শুভেন্দু একটি তালিকা দলকে দিয়েছেন, যা তাঁর নিজের জেলায় সীমাবদ্ধ নয়। রাজ্যের অন্য জেলার ক্ষেত্রেও প্রার্থীদের নাম সেখানে রয়েছে। কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষকদের তরফে সেই সমস্ত নাম মেনে নেওয়ার ‘নিশ্চয়তা’ আসেনি বলেই ওই সূত্রের দাবি। অনেকের মতে, সেই কারণেই বৃহস্পতিবারের বৈঠক শুভেন্দু এড়িয়ে গিয়েছেন।
রাজ্যের বিজেপি নেতৃত্ব অবশ্য এ নিয়ে কোথাও মুখ খোলেননি। কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষদেরও মুখে কুলুপ। বরং বৈঠকে উপস্থিতদের মধ্যে কেউ কেউ ঘনিষ্ঠমহলে জল্পনার অবসান ঘটানোর চেষ্টা করেছেন। কেউ বলেছেন, ‘‘শুভেন্দু অধিকারী নিজে উপস্থিত হতে না-পারলেও তথ্য এবং পরামর্শ পাঠিয়েছিলেন।’’ কেউ বলেছেন, ‘‘শুভেন্দুদা আগেই জানিয়েছিলেন, এই বৈঠকে তিনি থাকতে পারবেন না। তাঁর পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি রয়েছে।’’
দলের অন্য একটি অংশের ব্যাখ্যা, বিজেপির দীর্ঘ বৈঠকের পরম্পরার সঙ্গে শুভেন্দু এখনও পুরোপুরি অভ্যস্ত হয়ে ওঠেননি। তিনি দীর্ঘক্ষণ বৈঠকে থাকেন না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে নিজের প্রয়োজনীয় কথাটুকু বলে নিজের পরের কর্মসূচিতে চলে যান। দিনভর নানা প্রকাশ্য তথা জনসংযোগ কর্মসূচিতেই তিনি বেশি স্বচ্ছন্দ। বছরখানেক আগে রাজ্য বিজেপির তৎকালীন সভাপতি সুকান্ত এ কথা প্রকাশ্যেই বলেছিলেন। সে দিন যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গন চত্বরের একটি প্রেক্ষাগৃহে বিজেপির ‘বিশেষ সাংগঠনিক কর্মশালা’ ছিল। শুভেন্দু সেখানেও ছিলেন না। সুকান্ত সে প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘‘শুভেন্দুদা তো সাংগঠনিক বৈঠকে থাকেন না। উনি কমফর্ট ফিল (স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব) করেন না। আমাদের যে সাংগঠনিক প্রক্রিয়া রয়েছে, সেগুলো অনেক লম্বা সময় ধরে চলে তো! উনি অত ক্ষণ সময় দিতে পারেন না।’’ তবে তার অব্যবহিত পরের বক্তব্যেই শুভেন্দুর প্রশস্তি শোনা গিয়েছিল সুকান্তের মুখে। তিনি বলেছিলেন, ‘‘শুভেন্দু অধিকারী এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গের ব্যস্ততম নেতা। তাঁর অনেক কর্মসূচি থাকে। এত সময় পাবেন কী করে?’’
ঠিক সেই সুরেই বিজেপির এক কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষকও তাঁর ঘনিষ্ঠমহলে বৃহস্পতিবার রাতে শুভেন্দুর অনুপস্থিতি নিয়ে অভিমত প্রকাশ করেছেন। ঘনিষ্ঠদের তিনি জানিয়েছেন, শুভেন্দুর মতো ‘ব্যস্ত নেতা’র পক্ষে সারা দিন ধরে বৈঠকে বসে থাকা কঠিন। যদিও তাতে জল্পনা থামেনি। প্রসঙ্গত, বৃহস্পতিবার বেশি রাতে দক্ষিণ কলকাতার একটি হোটেলে শুভেন্দুর সঙ্গে কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষকদের আলাদা এবং একান্ত বৈঠক হয়েছে বলেও বিজেপি সূত্রের খবর। তবে তা দিনের বৈঠকে গরহাজির থাকার কারণে কি না, তা নিয়ে কেউই কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি। রাতের ওই বৈঠকে কী আলোচনা হয়েছে, তা নিয়েও কেউ মন্তব্যে নারাজ। তবে সকলেরই অনুমান, ভোটের আগে বিরোধী দলনেতার সঙ্গে কেন্দ্রীয় নেতাদের আলোচনা যে বিধানসভা নির্বাচন এবং তার সম্ভাব্য প্রার্থী এবং ভোট লড়ার কৌশল নিয়েই হবে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।