নির্বাচন কমিশনের ফুল বেঞ্চের বৈঠকে ‘সতর্কবাণী’ পেয়েছেন রাজ্যের বেশ কয়েক জন আমলা এবং পুলিশ আধিকারিক। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ‘কোপে’ পড়তে হয় রাজ্য পুলিশের ডিজি (আইনশৃঙ্খলা) বিনীত গোয়েলকেও। কমিশন, জানিয়ে দেয়, ভোটের পরেও তাদের নজরদারি থাকবে। তার পরেই ধর্মতলার ধর্নামঞ্চ থেকে কমিশনকে একহাত নিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি মুখ্য নির্বাচনের কমিশনারের উদ্দেশে বলেন, ‘‘যাঁরা অফিসারদের ভয় দেখাচ্ছেন, তাঁদের বলব, মূর্খের স্বর্গে বাস করছেন। এখানকার মানুষ মাথা নত করবে না।’’ শুধু তা-ই নয়, তিনি রাজ্যের আমলা এবং পুলিশকর্তাদের ‘কৌশলে সামলে নিতে’ আবেদন করেছেন। সোমবার ধর্নামঞ্চ থেকে জ্ঞানেশকে চ্যালেঞ্জ ছুড়েছেন তৃণমূলের দ্বিতীয় প্রধান অভিষেকও।
জেলাশাসক, পুলিশ কমিশনার থেকে পুলিশ সুপারদের সোমবার ‘সতর্কবার্তা’ দিয়েছে কমিশন। বলা হয়েছে, বিধানসভা নির্বাচনের সময়ের গন্ডগোল, রাজনৈতিক হিংসা বরদাস্ত করা হবে না। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ জানান, নির্দেশ মতো না-চললে পরিণামে বিচার বিভাগীয় তদন্তের মুখেও পড়তে হতে পারে পুলিশ বা আমলাকে। ভোটের পরেও নজর রাখবেন তাঁরা। ২০২১ সালের মতো ২০২৬ সালে ‘ভোট পরবর্তী হিংসা’র অভিযোগ বরদাস্ত করা হবে না।
তার পর এসআইআর ইস্যুতে তৃণমূলের ধর্নার চতুর্থ দিনে মমতা সান্ধ্যকালীন ভাষণে তোপ দাগেন কমিশনকে। তিনি বলেন, ‘‘আজ আমি শুনলাম, মিটিং করে অফিসারদের বহুত থ্রেট (অনেক হুমকি) দেওয়া হয়েছে। শুধু অ্যাকশন নেবেন তা-ই নয়, ভ্যানিশ পাউডার মে মাসের পরেও নাকি অ্যাকশন নেবেন! আমি বলি, সাহস থাকা ভাল, দুঃসাহস ভাল নয়।’’
পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর প্রক্রিয়ায় রাজ্যের বিভিন্ন আমলা এবং পুলিশকর্তার ভূমিকায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছে কমিশনের ফুল বেঞ্চ। বৈঠকে কমিশন বার্তা দিয়েছে, প্রত্যেকের কাজের ‘ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট’ তাদের কাছে আছে। জেলাশাসক হোন বা পুলিশ কমিশনার, গাফিলতি দেখলে কাউকে রেয়াত করা হবে না। অন্য দিকে, এসআইআর ইস্যুতে কমিশনকে নিয়মিত তোপ দেগে আসছেন তৃণমূল নেতৃত্ব। জীবিত ভোটারদের মৃত বলে ঘোষণা করা হচ্ছে, এই অভিযোগে জ্ঞানেশ কুমারকে ‘ভ্যানিশ কুমার’ বলে কটাক্ষ করে আসছেন তৃণমূলনেত্রী। সোমবার তিনি আরও সুর চড়িয়ে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের উদ্দেশে বলেন, ‘‘মে মাসের পর আপনি থাকবেন তো ওই চেয়ারে? আগে সেটা ঠিক করুন, তার পর বাংলার অফিসারদের ‘থ্রেট’ করবেন, বাংলার মানুষকে থ্রেট করবেন।’’ এসআইআরের কাজে বিএলও, ইআরও, এইআরও, ডিআরও-দের ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘যাঁরা রাত দিন কাজ করেছেন, এমনকি, চাপ সহ্য করতে না-পেরে কেউ কেউ মারাও গিয়েছেন, তাঁদের নিয়ে একটি বাক্যও বলেননি। তাঁদের আত্মারা ঘুরে বেড়াচ্ছে। অন্যায় কাউকে ছাড়ে না। ভয় দেখিয়ে লাভ নেই।’’
এর পর আরও অভিযোগ করেছেন মমতা। তাঁর দাবি, রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনে ইভিএম কারচুপির ছক কষা হচ্ছে। ভোটের আগে ভোটারদের অধিকার কেড়ে নেওয়ার ষড়যন্ত্র হয়েছে। পাশাপাশি, লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি বা যুক্তিগত অসঙ্গতির ক্ষেত্রের এআই ব্যবহার নিয়েও কমিশনের সমালোচনা করে মমতা বলেন, ‘‘ওই এআই এক দিন ব্রেনটাকে খাবে।’’
আরও পড়ুন:
ভর্ৎসিত পুলিশকর্তা এবং আমলাদের উদ্দেশে মুখ্যমন্ত্রীর বার্তা, ‘‘একটু জবরদস্তি করবে। ‘ট্যাক্টফুলি হ্যান্ডল’ করে নেবেন অফিসারেরা। তার পর আপনি (মুখ্য নির্বাচন কমিশনার) নিজে কোথায় থাকবেন, তার ঠিক নেই। আপনি মে-র পরেও ব্যবস্থা নেবেন?’’ জ্ঞানেশকে ‘সুপার গড’, ‘স্পাইউডারম্যান’ বলে খোঁচা দেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘‘স্পাইডারম্যান যা ইচ্ছে তাই করতে পারে। ওটা তো ছোটদের ভোলানোর জন্য। আর এখানে উনি ভোটারদের ভয় দেখাচ্ছেন। এক দিন আপনাদের মানুষের পায়ে পড়তে হবে। আপনাদের মতো লোক থাকলে গণতন্ত্রের সর্বনাশ হয়।’’
কমিশনকে নিশানা করেন অভিষেকও। তিনি বলেন, ‘‘অমিত শাহকে (কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) বলতে চাই, আপনার জ্ঞানেশ কুমারকে বলুন না , কত জন ‘ঘুসপেটিয়া’ আছে? সংখ্যা প্রকাশ্যে বলুন। না-হলে প্রকাশ্যে ক্ষমা চান।’’
ভোটাভুটি ছাড়া সোমবারই রাজ্যসভা নির্বাচনে বাংলা থেকে পাঁচ জন সাংসদ নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে তৃণমূলের চার জন— বাবুল সুপ্রিয়, রাজীব কুমার, মেনকা গুরুস্বামী এবং কোয়েল মল্লিক। শংসাপত্র নিয়ে ধর্নামঞ্চে পৌঁছে গিয়েছিলেন বাবুল। অভিষেকের কাছে গিয়ে তাঁকে শংসাপত্র দেখান তিনি। হাত মেলান দুই নেতা।