ইরান-আমেরিকার সংঘাতে পাকাপাকি ভাবে দাঁড়ি পড়েনি। তার ফল ভুগছে ভারতের সাধারণ মানুষও। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, দেশে তেল-গ্যাস জোগানে সঙ্কট নেই বলে মোদী সরকার পাখিপড়ার মতো দাবি করছে বটে। তবে বাস্তবের ছবিটা অনেক ক্ষেত্রে আলাদা। হাজার বার চেষ্টা করেও রান্নার গ্যাস (এলপিজি) বুক করতে না পারা, বুকিংয়ের পরে ঠিক সময়ে ওটিপি না আসা, গ্যাস পেতে বিপুল সময় লাগার মতো অসংখ্য অভাব-অভিযোগ রয়েছে বহু মানুষের। গ্রাহকদের একাংশের দাবি, সব স্তর থেকে আশ্বস্ত করা হলেও উদ্বেগ কমছে না। ইতিমধ্যেই রান্না কমাতে খাবারের পদে কাটছাঁট করেছেন। তার পরেও অস্বস্তি ও আশঙ্কা বহাল।
তবে তেল-গ্যাসের ঘাটতি নেই বলে দাবি রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থাগুলিরও। শুক্রবার ইন্ডিয়ান অয়েলের ইডি এবং রাজ্যে সংস্থার প্রধান জিতেন্দ্র কুমার জানান, পশ্চিমবঙ্গে পেট্রল-ডিজ়েল কিংবা রান্নার গ্যাসের সমস্যা নেই। হাতে যথেষ্ট পরিমাণ জ্বালানি রয়েছে। গ্রাহকেরা যেন অযথা আতঙ্কিত না হন।
সূত্র অবশ্য জানাচ্ছে, সম্প্রতি ৬০০০ টন এলপিজি নিয়ে একটি জাহাজ ভিড়েছিল হলদিয়া বন্দরে। তার মধ্যে ১০০০ টন বাণিজ্যিক এবং বাকিটা গৃহস্থালির প্রয়োজনে ব্যবহৃত হচ্ছে। পরের জাহাজ আসার কথা আগামী ২৬ কিংবা ২৭ তারিখে। অথচ তিনটি তেল সংস্থা মিলিয়ে দৈনিক কমপক্ষে ৬০০-৬৫০ টন গ্যাস প্রয়োজন। কাজেই প্রয়োজনের চেয়ে জোগান যে কম রয়েছে সংস্থাগুলির হাতে, সেটা স্পষ্ট। দেশেও দৈনিক চাহিদার থেকে ৪ লক্ষ ব্যারেল কম এলপিজি হাতে পাওয়া যাচ্ছে।
ইন্ডেন গ্যাস বণ্টনকারীদের পক্ষে বিজন বিশ্বাস বলেন, “এমনিতেই আমরা সিলিন্ডারের চাহিদার ৭০-৭২ শতাংশ পাচ্ছি। ফলে পরের জাহাজ না আসা পর্যন্ত একটু চাপ তো আছেই।” গ্যাস বিক্রেতা বা ডিলারেরা এখন বাণিজ্যিক সিলিন্ডারের ৭০% এবং গৃহস্থালির ৬৮-৭০% হাতে পাচ্ছেন। হিন্দুস্তান পেট্রলিয়ামের এক এলপিজি বিক্রেতা জানান, গৃহস্থালির সিলিন্ডারে পরিস্থিতি এক থাকলেও বাণিজ্যিকে সমস্যা রয়েছে।
বিজনের দাবি, তাঁরা যা হাতে পাচ্ছেন, সেই সিলিন্ডার দিয়ে সব চাহিদা মেটানো কঠিন। তাই গ্রাহকদের বাড়িতে পৌঁছতে সময় লাগছে। গড়ে বুকিং-এর ১০-১২ দিন বাদে গ্যাস মিলছে। সব বিক্রেতারই প্রশ্ন, এ ভাবে কত দিন চলবে? যদিও জিতেন্দ্র কুমারের বার্তা, জ্বালানি পরিস্থিতিতে নজর রাখা হচ্ছে। কোথাও তা শূন্য হওয়ার খবর নেই। সূত্রের খবর, আগামী সপ্তাহে এলপিজি ডিলারেরা সর্বভারতীয় স্তরে বৈঠক করতে পারেন। তেল সংস্থাগুলির কাছে জমা দিতে পারেন স্মারকলিপি। শুক্রবার কেন্দ্রীয় পেট্রলিয়াম সচিব জ্বালানির সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে সমস্ত রাজ্যের প্রতিনিধি এবং তেল সংস্থাগুলির সঙ্গে বৈঠক করেন।
সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত পেট্রল-ডিজ়েল নিয়েও। ‘ইন্ডিয়ান অয়েল ডিলার্স ফোরাম’-এর কর্তা জন মুখোপাধ্যায় জানান, তেল নিয়েও কোনও চিন্তা নেই। সব পাম্পে যথেষ্ট জ্বালানি রয়েছে। যদিও খবর মিলেছে, মহারাষ্ট্রে গত দু’দিনে জ্বালানির বিক্রি ২০% বেড়েছে, যা কার্যত আতঙ্কে পড়ে কেনা বা ‘প্যানিক বায়িং’। রাজস্থানে বহু পাম্পে তেল শেষ হয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তেলঙ্গানা কিংবা ছত্তীসগঢ়ে অনেক পেট্রল পাম্প তেল বিক্রির নির্দিষ্ট সীমা বেঁধে দিয়েছে বলেও অভিযোগ ক্রেতাদের একাংশের। পাম্প মালিকদের একাধিক সংগঠন জানিয়েছে, কলকাতা বা শহরতলিতে এমন অভিযোগ নেই। গ্রামীণ এলাকায় তেল বিক্রিতে সাময়িক ভাবে কিছু সীমা থাকতে পারে। তবে আগামী দিনে যুদ্ধ বন্ধ না হলে পরিস্থিতি কোন দিকে গড়াবে, বলা যাচ্ছে না।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)