সামনেই কোরবানির ইদ। কিন্তু গবাদি পশু হত্যা এবং মাংস বিক্রিতে রাজ্য সরকারের নয়া বিধির পর ‘অস্থিরতা’ তৈরি হয়েছে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত কিছু এলাকায়। এই প্রেক্ষিতে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত মুর্শিদাবাদের মানুষের সমস্যার কথা জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে চিঠি দিলেন প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তথা কংগ্রেস নেতা অধীর চৌধুরী।
তৃণমূলের একটি সূত্রে খবর, বিধানসভার পরিষদীয় দলে এই সমস্যার কথা তুলে ধরেছিলেন সংখ্যালঘু কয়েক জন বিধায়ক। কিন্তু তেমন কোনও ‘উদ্যোগ’ না দেখে তাঁরাই কংগ্রেসের অধীরকে গোপনে বিষয়টি জানান। তার পরেই এই চিঠি।
প্রকাশ্যে গবাদি পশুর মাংস কাটা ও বিক্রিতে বিজেপি সরকার ১৯৫০ সালের প্রাণিসম্পদ আইন অনুযায়ী কয়েকটি নিয়ম বলবত করেছে। ওই নির্দেশ অনুযায়ী, প্রশাসনের অনুমোদন ছাড়া গবাদি পশু হত্যা করা যাবে না। ১৪ বছর বয়স হয়নি, এমন গবাদি পশুকে জবাই করা যাবে না। তা ছাড়াও মাংস কাটার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট স্থানীয় কর্তৃপক্ষ কিংবা পশ্চিমবঙ্গের প্রাণিসম্পদ দফতরের লিখিত অনুমতি প্রয়োজন।
শুভেন্দুকে লেখা চিঠিতে অধীর জানিয়েছেন, গত ১৩ মে পশুহত্যা সংক্রান্ত সরকারি নির্দেশিকা জারি হওয়ার পর থেকে সমাজের কিয়দংশের মধ্যে বিভ্রান্তি এবং একরকম অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে বিবিধ সম্প্রদায়ের বাস। বহু দিন থেকে যে যাঁর মতো করে ধর্মাচরণ করে আসছেন। নিজের জেলার উদাহরণ টেনে প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জানিয়েছেন, রাজ্য সরকারের নয়া নির্দেশিকার পর সংখ্যালঘু অধ্যুষিত মুর্শিদাবাদের মানুষদের মধ্যে একরকম অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। সেটা সরকারেরই দূর করা উচিত। চিঠিতে অধীর লিখেছেন, ‘‘পশ্চিমবঙ্গ বহু ভাষা, বহু সংস্কৃতি ও বহু ধর্মীয় ঐতিহ্যের এক মিলনভূমি। প্রত্যেক সম্প্রদায়ের মানুষের সামাজিক ও ধর্মীয় রীতিনীতি পালনের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি।’’
অধীরের পরামর্শ, জেলা প্রশাসন কার্যকর ভূমিকা নিতে পারে এবং কিছু জায়গা তারা চিহ্নিত করে দিতে পারে, যেখানে ধর্মীয় ঐতিহ্য এবং বিশ্বাস অনুযায়ী ধর্মাচরণ করতে পারেন।
সূত্রের খবর, মালদহ এবং মুর্শিদাবাদের বেশ কয়েক জন তৃণমূল বিধায়ক ওই সমস্যার কথা তুলে ধরে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে সুরাহা চেয়েছিলেন। সদুত্তর না পেয়ে তাঁদেরই এক বা একাধিক বিধায়ক অধীরের কাছে যান এবং তার পরেই শুভেন্দুকে চিঠি লেখা হয়েছে।
তৃণমূলের একটি সূত্রের খবর, মুর্শিদাবাদের এক ব্যবসায়ী তথা তৃণমূল বিধায়ক পরিষদীয় দলের এক প্রবীণ নেতাকে বিষয়টি জানিয়েছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, সংখ্যালঘু অংশের মধ্যে এই অস্থিরতা নিরসনের জন্য মুখ্যমন্ত্রীর কাছে একটি স্মারকলিপি দেওয়া উচিত। তখন ওই প্রবীণ নেতা তাঁকে জানান যে, দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে কথা বলতে হবে। ওই বিধায়ক জানান, এমন একটি সিদ্ধান্তের জন্যও যদি নেত্রীর নির্দেশের জন্য অপেক্ষা করতে হয়, তবে পরিষদীয় দল কী করবে! ওই ব্যবসায়ী-বিধায়ক তখন বলেন যে, তাঁরা ‘অধীরদা’কে বিষয়টি জানানোর চিন্তাভাবনা করছেন। তখন প্রবীণ নেতা পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘‘আমাদের মানে কী? তুমি কি দল পাকিয়েছ?’’ জবাবে সেই বিধায়ক বলেন, ‘‘দল পাকাইনি। আমরা মনে করছি, অধীরদাকে জানালে সুরাহা হতে পারে।’’ তখন সেই প্রবীণ তৃণমূল নেতা জানান, তাঁরা যদি মনে করে থাকেন যে কংগ্রেস নেতা বিষয়টির সুরাহা করতে পারবেন, তা হলে যেতেই পারেন। কিন্তু তাঁরা যেন মনে রাখেন যে তাঁরা তৃণমূলের টিকিটে নির্বাচিত। সূত্রের খবর, ওই সময়ে আর এক তৃণমূল বিধায়ক জবাবে জানান, তাঁরা মানুষের বিধায়ক। মানুষের সমস্যা বোঝাটা জরুরি।
আরও পড়ুন:
এখন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর কাছে কংগ্রেসের অধীর প্রস্তাব দিয়েছেন প্রশাসনের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট স্থান চিহ্নিত করে দেওয়া হোক, যেখানে মানুষ তাঁদের প্রচলিত ধর্মীয় রীতিনীতি শান্তিপূর্ণ ভাবে পালন করতে পারবেন। এতে অযথা বিভ্রান্তি দূর হবে এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিও বজায় থাকবে। নবান্ন সূত্রে খবর, অধীরের চিঠির প্রাপ্তিস্বীকার করা হয়েছে।