E-Paper

নাম-অজ্ঞতায় ভোগান্তি, মুসলিম ভোটারদের দাবিতে সরব মঞ্চ

রাজ্যের নানা প্রান্তে বিভিন্ন বুথের নথি বিশ্লেষণ করে উত্তর থেকে দক্ষিণ যে ছবিটা আসছে, তাতে ‘বিবেচনাধীন’ তকমাধারীদের মধ্যে মুসলিমেরা সুস্পষ্ট ভাবেই পাল্লায় ভারী।

ঋজু বসু

শেষ আপডেট: ০৩ মার্চ ২০২৬ ০৯:০৬

—প্রতীকী চিত্র।

গত কয়েক মাস ভোটার তালিকা সাফসুতরো করার কাজে খেটেছেন দক্ষিণ ২৪ পরগনার জয়নগর এলাকার এইআরও তথা শিশুকল্যাণ উন্নয়ন আধিকারিক (আইসিডিএস সুপারভাইজ়ার) নাজমা সুলতানা। তাঁর নামই চূড়ান্ত তালিকায় ‘বিবেচনাধীন’ তকমা পেয়েছে। নিজে মুখ খোলেননি মধ্য পঞ্চাশের সরকারি কর্মী নাজ়মা। কিন্তু তাঁর ঘনিষ্ঠ জনের সূত্রে জানা যাচ্ছে, ২০০২এর ভোটার তালিকায় তাঁর নামের মধ্যে কী ভাবে ‘খাতুন’ শব্দটি ঢুকে পড়েছিল।

পুরনো ভোটার তালিকার সঙ্গে যোগসূত্র খোঁজার পর্বে বিষয়টি নজরে এলে শুনানিতে আদালতের হলফনামা, নিজের পুরনো শিক্ষাগত শংসাপত্র— পেশ করেন স্কুলশিক্ষক বাবার সন্তান সেই মহিলা। তাতে শিকে ছেঁড়েনি। নাজমার দুই পুত্র এসআইআর পরীক্ষায় উতরে গেলেও নাজমার ৭৫ বছর বয়সী মা এবং জেঠিমা বেথুন কলেজের প্রাক্তনী, অশীতিপর এমএ-বিএড মহিলার নামও বিবেচনাধীন ভোটারের তালিকায়।

সীমাহীন দুশ্চিন্তায় রয়েছেন, সল্টলেকের বাসিন্দা সালেহিনা সারিয়রও। প্রয়াত বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী ঈশা মহম্মদের তিনি পুত্রবধূ। তাঁর স্বামী সেন্ট জ়েভিয়ার্স কলেজের ইতিহাসের শিক্ষক সামির ঈশার নাম রয়েছে প্রকাশিত চূড়ান্ত তালিকায়। কিন্তু সালেহিনার নামটিই ‘বিবেচনাধীন’। তিনি বলছিলেন, ‘‘আমার বাবা, বহরমপুরের বাসিন্দা মহম্মদ আতাউর রহমান ডোমকল বিটি স্কুলের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক। রাষ্ট্রপতির পুরস্কার পেয়েছেন। ২০০২এর ভোটার তালিকায় কোনও ভাবে বাবার নাম মণ্ডল আতাউর রহমান বলে বেরিয়েছিল।’’ ২৪ বছর আগের ভুলের মাসুল এ বার দিতে হচ্ছে। শুনানিতে পাসপোর্ট, আধার, মাধ্যমিকের নথিটথি দেখিয়েও রেহাই মেলেনি। স্থানীয় বিএলও সালেহিনাকে বলেছেন, নিজের এবং বাবার নথি প্রস্তুত রাখতে। সালেহিনার পৈতৃক বাড়িতে ছ’জন, আরও এক জন বিবাহিতা বোন এই নামেরগেরোয় বিবেচনাধীনের তালিকায়ঢুকে গিয়েছেন।

রাজ্যের নানা প্রান্তে বিভিন্ন বুথের নথি বিশ্লেষণ করে উত্তর থেকে দক্ষিণ যে ছবিটা আসছে, তাতে ‘বিবেচনাধীন’ তকমাধারীদের মধ্যে মুসলিমেরা সুস্পষ্ট ভাবেই পাল্লায় ভারী। জলপাইগুড়ির একটি সরকারি মাদ্রাসার শিক্ষিকা তথা লেখিকা মৌমিতা আলম বললেন, ‘‘জলপাইগুড়ির বেতগুড়ি বস্তি বিএফপি স্কুলের বুথেই ১১১২ জন ভোটারের মধ্যে ৩৫৮ জনকে শুনানিতে ডাকা হয়েছিল। বিবেচনাধীন থেকে গিয়েছেন ১৭৮ জন। তাঁদের মধ্যে ১৭৭ জনই মুসলিম।’’

রাজ্যের সরকারি কর্মীদের অভিজ্ঞতায়, বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পে নাম তোলার সময়েও দেখা যায়, সংখ্যালঘু সমাজে এক ব্যক্তির বিভিন্ন নথিতে নাম লেখার আলাদা ধরন দেখা যায়। কোথাও মহম্মদ, কোথাও এমডি। মহম্মদ বানানেরও রকমফের। নামের বানানের এতশত হেরফেরে মুসলিমদের নাম নিয়ে বিভ্রান্তির কারণ আছে বলে মনে করছেন রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দফতরের সঙ্গে সংশ্লিষ্টেরা। তবে মৌমিতার ব্যাখ্যা, ‘‘মুসলিম নাম নিয়ে অন্যদের অজ্ঞতাও এই সন্দেহের একটা কারণ। আঞ্চলিক উচ্চারণ ভেদে কেউ মহম্মদ বা মুহাম্মদ লেখেন। অনেক অবিবাহিত মেয়ে মোসাম্মত বা এমএসটি লেখেন। এগুলো অনেকেই জানেন না। বিষয়গুলির শুনানিতে নিষ্পত্তি হওয়াই উচিত ছিল।’’ হিন্দু পদবির বানানের তার তম্যে যেমন কম জনই বিবেচনাধীন তকমা পেয়েছেন। হুগলির চাঁপাডাঙা কলেজের পদার্থবিদ্যার শিক্ষক সফি মল্লিক, চিত্রশিল্পী তৌসিফ হকেরা ‘সারা বাংলা বিচারাধীন ভোটার মঞ্চ’ গড়ার ডাক দিয়েছেন। সফি বলেন, ‘‘অনেকেই ভাল ভাবে বুঝছেনও না, কেন তাঁর নামটি ভোটার তালিকায় বিবেচনাধীন। তাঁদের পাশে দাঁড়ানো, সাহায্য করা ছাড়াও আমরা সবাইকে বোঝাচ্ছি, দুশ্চিন্তার মধ্যেও ধৈর্য রাখতে হবে। উৎকণ্ঠার বশে কোনও হঠকারিতা কাম্য নয়।’’

এসআইআর আবহে গড়ে ওঠা সংগ্রামী মঞ্চের কুশল দেবনাথ জানান, ৫ মার্চ তাঁরা মিছিলের পরে হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি এবং মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিককে স্মারকলিপি দেবেন। স্রেফ সন্দেহের বশে বিবেচনাধীন তকমায় কারও ভোটাধিকার কাড়ার বিরুদ্ধে তাঁরা সরব।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

SIR Election Commission

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy