মিমি চক্রবর্তী। জন্ম জলপাইগুড়ি। স্কুলজীবন সেখানেই। কাবাডি আর ব্যাডমিন্টনে প্রবল আগ্রহ ছিল, তবে রাজনীতিতে নয়। কলকাতায় পড়াশোনা করতে আসেন ২০০৮-এ। আশুতোষ কলেজ বরাবরই ছাত্র রাজনীতির একটি সক্রিয় ঘাঁটি। তবে রাজনীতি নয়, সেখানে পড়াশোনার পাশাপাশি মিমি বেছে নিলেন মডেলিং। তাতে সাফল্য এলে খুলে যায় ছোট পর্দার দরজা।
স্নাতক হতে-না-হতেই এসে গেল বড় পর্দার সুযোগ। আত্মপ্রকাশ প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় প্রযোজিত ‘বাপি বাড়ি যা’ সিনেমায়। সাল ২০১২। সে বছরই তাঁর প্রথম হিট—‘বোঝে না সে বোঝে না’।
ইতিমধ্যে রাজ্যে এক বিশাল পরিবর্তন ঘটে গিয়েছে—বাম বিদায় ও দিদির আগমন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উত্থানের পাশাপাশি উঠে এল তাঁর টলিউড তারকা ব্রিগেড। ২০১১ সালের ২১ জুলাই ব্রিগেডে তৃণমূলের শহিদ দিবসের মঞ্চ চাঁদের হাট। রঞ্জিত মল্লিক, সন্ধ্যা রায়, দীপঙ্কর দে, বিশ্বজিৎ, তাপস পাল, দেব, শতাব্দী রায়, দেবশ্রী রায়, তাপস পাল, চিরঞ্জিত চক্রবর্তী। তাঁদের কেউ কেউ ইতিমধ্যেই সাংসদ বা বিধায়ক।
মিমির প্রথম দু’টি ছবিরই পরিচালক, সুদেষ্ণা রায় ও রাজ চক্রবর্তী, তত দিনে দিদির তারকা ব্রিগেডের অংশ। মিমিও ভিড়ে গেলেন সেই দলে। তার পর ২০১৯। যাদবপুরের সাংসদ সুগত বসু তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের চাপে রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ালেন। মাস্টারমশায়ের বিকল্প হলেন তারকা।
মাসখানেক প্রচারাভিযান। তার পর বিপুল ভোটে জিতে সাংসদ মিমি। বয়স মাত্র তিরিশ। পাঁচ বছরে সংসদে উপস্থিতির হার ছিল ২১ শতাংশ। মুখ খুলেছেন ৭ বার। লোকসভা কেন্দ্রেও যে তাঁকে খুব দেখা গিয়েছে, এমনটা নয়।
বাংলা ছবির সর্বনাশ অনেক দিন ধরেই চলছে। কিন্তু এর মাঝেও পৌষ মাস ছিল টালিগঞ্জের নটনটীদের একাংশের। ছবি যদি না-চলে, প্রযোজক, পরিচালক, টেকনিশিয়ান, অভিনেতা-অভিনেত্রী, কারও অবস্থাই ভাল হওয়ার কথা নয়। নটনটীদের কথা একটু আলাদা। তাঁদের প্রধান আয় বিজ্ঞাপন, গ্রামে গিয়ে মাচা বা যাত্রাতে অংশগ্রহণ করা। কিন্তু দিদির রাজনীতি তাঁদের উপার্জনের একটা অতিরিক্ত দরজা খুলে দিয়েছিল।
রাজনীতিতে যে-কেউ আসতে পারেন। কিন্তু এঁদের অধিকাংশই বছরভর মাঠ-ময়দানের রাজনীতি করার জন্য আসেননি। দলের ইলেকশন মেশিনারির ঘাড়ে চেপে নির্বাচনী বৈতরণী পেরোনোর রাজনীতিই করেছেন অধিকাংশ। কাজ মূলত সভাশিল্পীর মতো দিদির মঞ্চে বা মিছিলে ভিড় বাড়ানো। তাঁরা দলকে তাঁদের জনপ্রিয়তার ভাগ দেবেন, বিনিময়ে ক্ষমতার ভাগ নেবেন।
এক বার সাংসদ বা বিধায়ক হতে পারলে সুবিধা কম নয়। বর্তমানে মাসিক এক লাখ টাকার মূল বেতনের পাশাপাশি সাংসদেরা একাধিক ভাতা পান। নিকটাত্মীয়দের সঙ্গে নিয়ে দেশের মধ্যে বছরে ৩৪ বার বিনামূল্যে বিমান সফর। রাজধানীর অভিজাত এলাকায় পাঁচ বছরের জন্য বাংলো। সেখানে থাকতে না-চাইলে বাড়িভাড়া বাবদ মাসে ২ লক্ষ টাকা। সারা বছর বিনামূল্যে ট্রেনের প্রথম শ্রেণির কামরার সওয়ারি হতে পারেন, এমনকী ব্যক্তিগত কাজেও। বিনামূল্যে চিকিৎসা, এমনকী নিকটাত্মীয়েরও। শুধু ফোন খরচ বাবদই বছরে পাওয়া যায় দেড় লক্ষ টাকা।
প্রাক্তনেরা পান নিজের ও তাঁর ওপর নির্ভরশীলের জন্য আজীবন পেনশন। এ ছাড়া, বিনামূল্যে ট্রেনের বাতানুকূল কামরায় এক জন সঙ্গী-সহ যাতায়াত ও স্বাস্থ্য পরিষেবার সুযোগ।
অন্য দিকে, ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করে টিকে থাকতে হলে পরিচালক, প্রযোজক তো বটেই, টালিগঞ্জের বিশ্বাস ভ্রাতৃদ্বয়কেও খুশি রাখতে হবে। চরিত্র বুঝতে হবে, প্র্যাকটিস করতে হবে, দিনে ৮-১০ ঘণ্টা খাটতে হবে। তার পরেও ছবি ফ্লপ হলে তার দায়ও নিতে হবে। কিন্তু রাজনীতির সূত্রে মাঝে মাঝে দিদির বা দলের কিছু অনুষ্ঠানে ফ্রি-তে উপস্থিত থেকে নিজেদের সারা বছরের কাজ বাড়িয়ে নেওয়া যেত। রাজ্যের অধিকাংশ মাচা বা মেলার উদ্যোক্তা ছিলেন তৃণমূলের নেতারা আর তাঁরা শুধু তৃণমূলের নটনটীদেরই ডাকতেন।
রাজনীতিতে বিনোদন জগতের ব্যক্তিত্বদের আসা নতুন কিছু নয়। স্বাধীন ভারতের প্রথম দশকগুলিতে কলকাতা বা বম্বের (এখনকার মুম্বই) বিনোদন জগতের অনেক তারকাই সরাসরি বাম রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। মূলত গণনাট্য সঙ্ঘের সূত্রে।
সোনার কেল্লার ‘সিধু জ্যাঠা’, লেখক-অভিনেতা হারীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় থাকতেন হায়দরাবাদে। ১৯৫২-র লোকসভা নির্বাচনে সিপিআই-সমর্থিত নির্দল প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জেতেন। সরাসরি ভোটে না-দাঁড়ালেও বলরাজ সাহনি বা এ কে হাঙ্গলদের মতো অনেকেই বামেদের হয়ে প্রচার করেছেন। ১৯৬৭-এ অসমে বাম সমর্থিত নির্দল বিধায়ক হয়েছিলেন ভূপেন হজারিকা। ১৯৯৩-তে যেমন কলকাতার চৌরঙ্গী কেন্দ্র থেকে বাম সমর্থিত নির্দল বিধায়ক অনিল চট্টোপাধ্যায়। এঁরা সবাই তখন বামেদের সঙ্গে রাজনৈতিক ও আদর্শগত ভাবে যুক্ত ছিলেন।
কিন্তু এমজি রামচন্দ্রন হোন বা এনটি রাম রাও, নির্বাচনের ময়দানে বিনোদন জগতের তারকাদের দাপট মূলত দক্ষিণ ভারতেই সীমাবদ্ধ ছিল ১৯৮০-র দশক পর্যন্ত।
আরও পড়ুন:
জাতীয় রাজনীতিতে তারকা নির্ভরতার দরজা, ওই রামমন্দিরের তালার মতোই, খোলেন রাজীব গান্ধী। ১৯৮৪-তে দাঁড় করিয়ে দেন তিন তারকাকে—ইলাহাবাদে অমিতাভ বচ্চন, বম্বেতে সুনীল দত্ত, মাদ্রাজে (এখনকার চেন্নাই) বৈজয়ন্তীমালা। তিন জনই জেতেন। অমিতাভ দ্রুত রাজনীতি ছাড়লেও, ১৯৯১-এ রাজেশ খন্না কংগ্রেসের হয়ে বিজেপির লালকৃষ্ণ আডবাণীর বিরুদ্ধে লড়ে সামান্য ভোটে হেরে যান। পরের বছর দিল্লিতে লোকসভা উপনির্বাচনে কংগ্রেসের রাজেশের বিরুদ্ধে শত্রুঘ্ন সিন্হাকে নামিয়ে দেয় বিজেপি। জেতেন অবশ্য বড় তারকা রাজেশ।
তারকা-রাজনীতিতে বিজেপির হাতেখড়ি এ সময়েই। মূলত রামায়ণ, মহাভারতের মতো সিরিয়ালের নায়ক-নায়িকাদের দিয়ে। ১৯৯১-এ গুজরাত থেকে সাংসদ হন রামায়ণের ‘সীতা’ দীপিকা চিখলিয়া ও ‘রাবণ’ অরবিন্দ ত্রিবেদী। প্রার্থী না-হলেও, বিজেপির হয়ে চুটিয়ে প্রচার করেন ‘রাম’ অরুণ গোভিল, ‘হনুমান’ দারা সিংহ। অন্য তারকা প্রার্থীদের মধ্যে ছিলেন কলকাতা উত্তর-পশ্চিমে ভিক্টর বন্দ্যোপাধ্যায়, যদিও হেরে যান।
১৯৯৮-৯৯ থেকে দুই বড় দলেই তারকাদের ভিড় বাড়ে—বিজেপিতে বিনোদ খন্না, ধর্মেন্দ্র, হেমামালিনী, কিরণ খের; কংগ্রেসে গোবিন্দ, রাজ বব্বর, নাগমা। তার পরেও, দুই দলেরই যা ব্যাপ্তি, সেই তুলনায় বিনোদন জগতের হার কমই। কিন্তু ২০০৯ থেকে তৃণমূল বাংলার রাজনীতিতে তারকা-কেন্দ্রিকতা দক্ষিণ ভারতের মতোই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে দিল।
ভোটের ময়দানে মমতার তারকাপ্রীতির প্রথম পরিচয় ২০০১-এ। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দিলেন মাধবী মুখোপাধ্যায়কে। ও দিকে চৌরঙ্গীতে অভিনেত্রী তথা সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়-জায়া নয়না। মাধবী হারলেন, কিন্তু নয়না জিতলেন। পরের বছর আলিপুর থেকে তৃণমূলের টিকিটে জিতলেন তাপস পাল। তাঁর ক্যারিয়ার তখন আর কোনও গগনেই নেই। তখনও তিনি ‘চন্দননগরের’ মাল বলে খ্যাত হননি, কিন্তু ফিল্মি ডায়লগ নেমে এল রাজনীতির মাঠে। আর, কে না জানে, ফিল্মি ডায়লগ দিদির পরম পছন্দ! নিজেও দিতে ভালবাসতেন।
আরও পড়ুন:
২০০৬-০৮ সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম কেন্দ্রিক নাগরিক আন্দোলনের কারণে তাঁর সঙ্গে শিল্পী ও বিনোদন জগতের তারকাদের ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। ২০০৯ লোকসভা নির্বাচনে কবীর সুমনের পাশাপাশি কৃষ্ণনগর থেকে তাপস পাল ও বীরভূম থেকে শতাব্দী রায়কে দাঁড় করিয়ে দেন। সবাই জেতেন। ২০১১-র বিধানসভা ভোটে বারাসতে দীপক ‘চিরঞ্জিত’ চক্রবর্তী, রায়দিঘিতে দেবশ্রী রায়, উত্তরপাড়ায় অনুপ ঘোষাল। বাংলার রাজনীতিতে এল এক নতুন অধ্যায়।
দু’টি রাজনৈতিক অঙ্কের বিষয় ছিলই। এক, তারকাদের জনপ্রিয়তা ব্যবহার করা। দুই, যে আসনে দলীয় গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব প্রবল, সেখানে অন্তর্ঘাত এড়াতে এ রকম ‘অরাজনৈতিক’ প্রার্থী দিয়ে দেওয়া। কিন্তু এর চেয়েও বড় সম্ভবত ছিল দিদির নিজের তারকাপ্রীতি।
বস্তুত, ২০১৪-য় তারকার হাট বসিয়ে দেন মমতা। বছরের শুরুতে মিঠুনকে পাঠালেন রাজ্যসভায়। লোকসভায় শতাব্দী, তাপসের পাশাপাশি বাঁকুড়ায় মুনমুন, মেদিনীপুরে সন্ধ্যা রায়। শহিদ দিবসের মঞ্চে ‘পাগলু ড্যান্স’-খ্যাত দেবকে দিলেন ঘাটালে। একমাত্র দেবই তখনও কেরিয়ারের শীর্ষে। বাকিরা মূলত অতীত। তবে, ওঁদের দেখে আরও ভিড় বাড়ল দিদির বৃত্তে। দিদির মঞ্চ মানেই ডজনে ডজনে তারকা।
যত দিন গড়াল বিনোদন জগতের সাংসদ-বিধায়কদের তালিকাও লম্বা হল— ইন্দ্রনীল সেন, মিমি চক্রবর্তী, নূসরত জহান, জুন মালিয়া, সোহম চক্রবর্তী, কাঞ্চন মল্লিক, রাজ চক্রবর্তী, অদিতি মুন্সী, লাভলি মৈত্র, সায়নী ঘোষ, রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়, শত্রুঘ্ন সিন্হা, সায়ন্তিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, কোয়েল মল্লিক।
বিজেপি যখন রাজ্যে জমি শক্ত করার কাজ শুরু করল, তখন তারাও বিনোদন জগতের তারকাদের নিয়ে এল সামনে। রূপা ‘দ্রৌপদী’ গঙ্গোপাধ্যায়, বাবুল সুপ্রিয়, বাপ্পি লাহিড়ী, জর্জ বেকার। ক্রমে তৃণমূল হয়ে বিজেপিতে এলেন রুদ্রনীল ঘোষ, লকেট চট্টোপাধ্যায়রা। ২০১৬-য় তৃণমূল-সংশ্রব ও সাংসদ পদ ছেড়ে ২০২১-এর ভোটের আগে বিজেপি শিবিরে ঢোকেন মিঠুন। বিজেপিতে যোগ দেন পার্নো মিত্র, পায়েল সরকার, যশ দাশগুপ্ত, হিরণ চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ। ভোটের পরে বিজেপি ছেড়ে তৃণমূলে যান বাবুল।
তারকা সাংসদদের মধ্যে কেউ কেউ কার্যত পূর্ণ সময়ের রাজনীতিবিদ হয়ে উঠেছেন। যেমন, শতাব্দী, রূপা ও লকেট। চার বারের সাংসদ শতাব্দীর প্রথম দফায় সংসদে হাজিরা ছিল ৭৫ শতাংশ। ছ’টি বিষয়ে বক্তব্য রেখেছিলেন। দ্বিতীয়ে উপস্থিতি ৭৪ শতাংশ, বিতর্ক ৪টি। তৃতীয়ে উপস্থিতি ৭৭ শতাংশ, ২৪টি বিষয়ে কথা বলেন। বর্তমান টার্মে এখন উপস্থিতির হার ৭৩ শতাংশ ও ১৫টি বিতর্কে অংশ নিয়েছেন। নিজের কেন্দ্রেও যান নিয়মিত।
তবে অধিকাংশেরই পারফরম্যান্স কহতব্য নয় না। তিন বারের সাংসদ দেব। প্রথম দফায় সংসদে উপস্থিতি ছিল মাত্র ১১ শতাংশ। দু’বার মুখ খুলেছিলেন। দ্বিতীয় দফায় তাঁর উপস্থিতির হার ১২ শতাংশ। দু’টি বিতর্কে অংশ নেন। তৃতীয় দফায় উপস্থিতি ৮ শতাংশ। এক বারও মুখ খোলেননি।
পাঁচ বছরের টার্মে সংসদে মুনমুনের উপস্থিতির হার ৬৯ শতাংশ, মুখ খুলেছেন মাত্র এক বার। সন্ধ্যা রায়ের উপস্থিতির হার ছিল ৫৩ শতাংশ। তিন বার বিতর্কে অংশ নিয়েছেন। নুসরতের উপস্থিতির হার ছিল ২৩ শতাংশ। বিতর্কে অংশ নেন ১২ বার।
এখন যদি জাতীয় গড়ের সঙ্গে তুলনা করি, তবে ২০১৪-১৯ সালে লোকসভার সাংসদদের গড় উপস্থিতির হার ছিল ৭৯ শতাংশ ও তাঁরা গড়ে ৪৭টি করে বিতর্কে অংশ নেন।
আর বিধায়ক? উত্তরপাড়ার অধিকাংশ মানুষ, এমনকী ঘোর তৃণমূলী পর্যন্ত, দিদির বাপান্ত করতেন ২০১১-তে অনুপ ঘোষালের পর ২০২১-এ আবার কাঞ্চন মল্লিককে তাঁদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়ায়।
ঘটনাচক্রে, এ বার তৃণমূলের তারকা প্রার্থীরা প্রায় সবাই হেরেছেন, বিজেপির তারকা প্রার্থীরা প্রায় সবাই জিতেছেন— রূপা, রুদ্রনীল, হিরণ, পাপিয়া অধিকারী, শর্বরী মুখোপাধ্যায়। কারণ, সম্ভবত, এ বার ভোট হয়েছে সিম্বলে। আর ৯ তারিখ মমতার কালীঘাটের বাড়িতে রবীন্দ্রজয়ন্তী পালনেও দেখা মেলেনি তৃণমূলের তারকাদের।
সাংবাদিক গৌতম ভট্টাচার্য মনে করেন, রাজনৈতিক দল ও অভিনেতা অভিনেত্রী-দু’পক্ষই জানে, তাদের সম্পর্ক আসলে বাড়িওয়ালা-ভাড়াটের মতো একটা এগারো মাসের চুক্তি। তাঁর কথায়, ‘‘দল জানে, সে কোনও নেতাকে এনে বসাচ্ছে না, যাঁর সংগঠনের ওপর একটা হাত থাকবে। আবার অভিনেতাও ভাবেন, না-পোষালে ছেড়ে দিয়ে মূল পেশাতেই মন দেবেন।’’
তাঁর মনে আছে, ১৯৯৫-তে কংগ্রেসের তরফে আসা রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন মিঠুন। তখন তাপস পাল এক বার গৌতমকে বলেছিলেন যে, মিঠুন ভুল সিদ্ধান্ত নিলেন। “তাপসের যুক্তি ছিল, অভিনেতা মিঠুন তো মিঠুন হয়ে গেছেন। ওখানে তো তিনি আর দ্বিতীয় বার মিঠুন হতে পারবেন না। কিন্তু রাজনীতিতে এলে নেতা হিসেবে আবার মিঠুন হয়ে উঠতে পারতেন। একটা নতুন সাম্রাজ্য,” বলেন গৌতম।
শেষ পর্যন্ত তাপসই মিঠুনের আগে রাজনীতিতে আসেন। সেই থেকে নতুন সাম্রাজ্যের খোঁজে ক্রমশ দিদি ও মোদীর মঞ্চে ভিড় বাড়িয়েছেন টালিগঞ্জের নটনটীরা।
দিদি নিজেই এ রঙ্গমঞ্চে প্রযোজক তথা পরিচালক। প্রযোজক দিদি দেখেন স্টার ভ্যালু। পরিচালক দিদি আর তাঁদের দিয়ে কাজ করাতে পারেন না। তাঁর সব পদক্ষেপ বোধগম্যও হয় না। যেমন, ২০১৪-য় মুনমুন। বাঁকুড়া আসনে সে বছর তৃণমূলের জয় কার্যত নিশ্চিত। ২০১১-র হিসাবেই তৃণমূল ৫০,০০০ ভোটে এগিয়ে ছিল আর তার পর তো সিপিএমে আরও ধস নেমেছিল। তৃণমূলের টিকিটে যে-কেউ দাঁড়ালেই জিততেন। সে ভাবেই ২০১৯-এ বসিরহাটে নুসরত বা যাদবপুরে মিমি। আসনগুলি কার্যত ওঁদের উপহার দেওয়া হয়েছিল। সাংসদ সদস্যপদ শেষ হওয়ার পরে এঁদের কাউকেই আর দলীয় কর্মসূচিতে দেখা যায়নি। সাংসদগিরি ও রাজনীতি, এক সঙ্গেই শেষ।
আরও পড়ুন:
সে ভাবেই বুঝে ওঠা যায় না মন্ত্রিসভা থেকে সরিয়ে বাবুলকে কেন রাজ্যসভায় পাঠানো হল। আরও ধোঁয়াশা কোয়েলকে রাজ্যসভায় পাঠানো নিয়ে। কোয়েলকে তো নির্বাচনী প্রচারের ঘোরাঘুরিটুকুও করতে হয়নি। মুখ্যমন্ত্রী মমতা আগেই তাঁর বাবা রঞ্জিত মল্লিককে কলকাতার শেরিফ বানিয়েছিলেন। এ বার মেয়ে!
তৃণমূলের একটি সূত্র জানিয়েছিল, কোয়েলের যে হেতু পঞ্জাবি পরিবারে বিয়ে, তাই তাঁকে রাজ্যসভায় পাঠিয়ে নাকি ভবানীপুরের পঞ্জাবী ভোটারদের কাছে বার্তা দিতে চেয়েছিলেন মমতা। এই অঙ্ক ভ্রান্ত। ভবানীপুরে পঞ্জাবীদের ভোট এমন কিছু বেশি নয়। ফলে, কোয়েলকে রাজ্যসভায় পাঠানোটা তেলা মাথায় অতিরিক্ত তেল দেওয়ার মতো ঘটনা।
দলের অন্দরে কান পাতলে আরেকটা কথাও শোনা যায়। কোয়েলের স্বামী বর্তমানে প্রযোজনা ছাড়াও কিছু রিয়েল এস্টেটের কাজের সঙ্গে যুক্ত। রিয়েল এস্টেট ব্যবসার স্বার্থেই নাকি তিনি মুখ্যমন্ত্রীর অনুরোধ ফেলতে কোয়েলকে না করেন। কোয়েল-ঘনিষ্ঠ এক অভিনেতা অবশ্য এই সম্ভাবনা উড়িয়ে দেন।
কারণ যেটাই হোক, তৃণমূলের পতন-পরবর্তী পর্যায়ে দলের দিকে আসা কাদার ভাগ কোয়েল কী ভাবে এড়িয়ে যাবেন? উল্টো দিক থেকে দেখলে, দিদির প্রতিবাদ কর্মসূচিতে কি এই রাজ্যসভা সাংসদকে দেখা যাবে?
দিদির সভাশিল্পী হওয়ার পেশাটি আপাতত গিয়েছে। গেরুয়া শিবির এঁদের কী ভাবে ব্যবহার করে, তা দেখার বাকি। তবে দিদি যদি আবার ঘুরে দাঁড়াতে চান, তাঁকে সম্ভবত অভিনেতা নয়, নেতাদের ওপরই ভরসা করতে হবে।