E-Paper

নিরাপদতম শহরেও গুলি, খুন! পিলখানার আতঙ্ক কলকাতায়

বখরা নিয়ে গোষ্ঠী কোন্দল সর্বত্র। গুলি চলে, বোমা পড়ে। মতের অমিল হলেই করা হয় খুন। রাজনীতির ছত্রচ্ছায়ায় এই অপরাধের জাল কত দূর? ভোটের আগে খোঁজ নিল আনন্দবাজার। আজ দ্বিতীয় কিস্তি।

নীলোৎপল বিশ্বাস, চন্দন বিশ্বাস

শেষ আপডেট: ০২ মার্চ ২০২৬ ০৮:৪৩

—প্রতীকী চিত্র।

দু’হাত বাঁধা। মাথা ঢাকা বালতি দিয়ে। সেই অবস্থায় বাঁশ, লাঠি দিয়ে মারতে মারতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এক যুবককে। ঘরের মধ্যে ঢুকিয়ে শুরু হয়েছে বেধড়ক মার। শেষে মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে সরাসরি চালিয়ে দেওয়া হয়েছে গুলি! অনেক পরে যুবকের মৃতদেহ ফেলে দিয়ে যাওয়া হয়েছে একটি বেসরকারি হাসপাতালের গেটে।

হাওড়ার পিলখানায় পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে এক প্রোমোটারকে গুলি করে খুনের ঘটনায় উত্তপ্ত রাজ্য-রাজনীতি। কিন্তু, বেলেঘাটার এই তুলে এনে মারধরের পরে মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে গুলি করে খুনের দৃশ্যও কি কম ভয়াবহ? হাওড়ার ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে খোঁজ করতে গিয়ে উত্তর-পূর্ব কলকাতার দুই সিন্ডিকেটের গন্ডগোলে এমন খুনের ভিডিয়োর উল্লেখ করে প্রশ্ন করলেন এক পুলিশ অফিসার। তিনি জানান, ওই খুনের পরে বিরুদ্ধ গোষ্ঠী রাতভর বোমাবাজি করে। চলে গুলিও। সেই সময়ে তদন্তে নামা এক পুলিশ আধিকারিকের মন্তব্য, ‘‘এখনও বেশ কিছু এলাকা রয়েছে, যেখানে ঢোকা যায় না। নিষিদ্ধ নগরীর মতো সেখানে যা-খুশি-তাই চলতে থাকে।’’ অথচ, এই কলকাতাই সর্বশেষ প্রকাশিত ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস বুরো (এনসিআরবি)-র রিপোর্ট অনুযায়ী দেশের মধ্যে নিরাপদতম শহর। তার পরেও এমন ঘটে কী ভাবে? মেলে না স্পষ্ট উত্তর।

পুলিশেরই একাংশের দাবি, এক সময়ে যে উত্তর কলকাতায় স্বপন চক্রবর্তী, আনোয়ার খান, রশিদ আলম ওরফে গব্বর বা উল্লু রাজারা দাপিয়ে বেড়াত, এখন সেখানেই উঠে এসেছে রাজু নস্করের মতো কারও কারও নাম। প্রোমোটিং থেকে নির্মাণ সামগ্রী সরবরাহের সিন্ডিকেটে এক গোষ্ঠীকে ক্ষমতাছাড়া করার জন্য ছুটছে আর এক গোষ্ঠী। বেআইনি অস্ত্রের কারবার, পার্কিং বাবদ তোলা আদায়, জলা ভরাট-সহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বখরার গন্ডগোল চলতে থাকে। অভিযোগ, সবটাই হয় রাজনৈতিক নেতাদের নজরের সামনে। তাই রাজুর মতো লোকেরাও রাজনীতির লোক হয়ে যান।

বেলেঘাটা, মানিকতলা, উল্টোডাঙা এলাকায় কান পাতলে শোনা যায়, এই মুহূর্তে হাজতে থাকলেও রাজুকে অতীতে অনেক অপরাধেই ছোঁয়নি পুলিশ। ২০১৪ সালে চৌরঙ্গি বিধানসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনে এক তরুণীকে রাস্তায় ফেলে মারধরের অভিযোগ উঠেছিল রাজুর বিরুদ্ধে। বিধাননগর পুরসভায় সাংবাদিকদের লক্ষ্য করে ইট ছুড়তেও দেখা গিয়েছিল তাঁকে। ২০২০ সালে রাজুর নিজের ক্লাব বেলেঘাটা গান্ধী ময়দান ফ্রেন্ডস সার্কলে বোমা বিস্ফোরণ হয়। ওই ক্লাবের সভাপতি হিসাবে ঘটনায় রাজুর নাম জড়ালেও পুলিশ তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদও করেনি।

একই দৃশ্য দেখা গিয়েছিল ২০২১ সালের অক্টোবরে, বেলেঘাটায় ১৪ কাঠা একটি পুকুর বোজানোর সময়ে। পুরসভার করা এফআইআরে রাজুর নাম থাকলেও তাঁকে ধরা হয়নি। গত বছরের জুন মাসেও এক ব্যবসায়ীর কারখানায় টিন লাগানোর বরাত না পেয়ে তাঁকে বেধড়ক মারধর করার অভিযোগ উঠেছিল রাজুর বিরুদ্ধে। কিন্তু পুলিশ তাঁকে ছোঁয়নি।

সেই সঙ্গেই চলতে থাকে রাজুর ‘কারবার’। এলাকায় কোনও বাড়ি খালি করতে হবে? ‘রাজুদা’ ভরসা। ইট-বালি-সিমেন্ট সরবরাহ? ডাক পড়ে তাঁর দলের। সালকিয়া থেকে খিদিরপুর, সল্টলেক থেকে বেহালা— দলে দলে ছেলে চলে আসে রাজুর ডাকে। একে একে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী নির্মাণ ব্যবসায়ীদের কার্যত এলাকাছাড়া করেছেন রাজু।

‘মাঠ ফাঁকা’ করার এই কৌশলে রাজুর হাত পাকানো শুরু বাম আমলেই। স্থানীয়দের দাবি, বেলেঘাটার এক সিপিএম নেতার হাত ধরে ‘মানবদরদী’ হিসাবে কম বয়সেই রাজনীতিতে প্রবেশ তাঁর। ওই নেতার প্রভাব খাটিয়েই শুরু নির্মাণ ব্যবসা। সেই আমলের দাদাদের হাত ধরেই পেশিশক্তির প্রয়োগ। ট্যাংরার একটি খুনের মামলাতেও নাম জড়ায় তখনই। রাজ্যে পালাবদলের পরে দল বদলেছেন। বিরোধীদের জব্দ করার মূল মন্ত্র যাঁদের কাছ থেকে রপ্ত করেছিলেন, সেই মন্ত্রে ঘায়েল করেন তাঁদেরই। প্রথমে বেলেঘাটার বিধায়ক পরেশ পালের বিরুদ্ধ গোষ্ঠীতে থাকলেও ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন বিধায়কেরই কাছের লোক। বিধায়কের সঙ্গে বিরোধ থাকাকালীন রাজুর গোষ্ঠীর সঙ্গে সংঘর্ষ লেগেই থাকত কুখ্যাত কানপুরিয়া শঙ্কর ওরফে শঙ্কর চক্রবর্তীর। এখন রাজুর গোষ্ঠীর সঙ্গে ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডের পুরপ্রতিনিধি অলোকানন্দা দাসের লোকের বিরোধের খবর শোনা যায়।

অলকানন্দা যদিও বলেন, ‘‘এই ৩৪ নম্বর ওয়ার্ড আমার সংসার। এখানে যে গন্ডগোল পাকাবে, তাকে সরিয়ে দিতে হবে। তা ছাড়া ওই ব্যক্তি আমার কাজে কখনও বাধা দিতে পারেননি, পারবেনও না।’’ রাজুর অফিসের বাইরে বসা এক ব্যক্তি অবশ্য বললেন, ‘‘দাদাকে ফাঁসানো হয়েছে। বড় বড় নেতারা এখানে মিটিং করতে আসেন। বেশি দিন দাদা ভিতরে থাকবেন না।’’

একই নিদান মিলল উত্তর কলকাতার আর এক দাদা রতন দাস ওরফে হাবার খোঁজ করতে গিয়ে। অভিযোগ, তাঁর হাতে থাকলে তেতলা বাড়ি অনায়াসেই চারতলা হয়ে যায়! তাঁর ইশারাতেই চলে একাধিক সিন্ডিকেট ব্যবসা। কখনও তিনি ছিলেন সিপিএম, মন্ত্রী-পুরপ্রতিনিধির হাত ধরে তিনিই আবার হয়েছেন তৃণমূল! যদিও ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূল সভাপতি রবি পাল বললেন, ‘‘এখন হাবা নিজের প্রোমোটারি নিয়েই থাকেন।’’ কিন্তু মানিকতলার প্রয়াত বিধায়ক সাধন পাণ্ডেকেও এক অনুষ্ঠানে গিয়ে হাবার দলের মুখে পড়তে হওয়ার অভিজ্ঞতা মনে পড়ে অনেকেরই। প্রবীণ মন্ত্রীকে বলতে হয়েছিল, ‘‘হাবাকে নিয়ে যাঁরা ঘুরছেন, তাঁরা সতর্ক হন।’’

সতর্কতা কি এসেছে? উত্তরের উত্তেজনার চোরা স্রোত অন্য কথাই বলে।

(চলবে)

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Gunfire

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy