Advertisement
E-Paper

দেখা দিয়েও অধরা কেন নধর ইলিশ, বিমর্ষ বাঙালি

মনকাড়া বিশাল রুপোলি ঝাঁক। জিভে শান দেওয়া শুরু হয়েছিল। কিন্তু দেখা দিয়েও ঝাঁকটা হঠাৎ কোথায় যেন মিলিয়ে গেল! কোথায় গেল? কেনই বা গেল?

মেহবুব কাদের চৌধুরী

শেষ আপডেট: ১৪ অগস্ট ২০১৫ ০৩:৫৩

মনকাড়া বিশাল রুপোলি ঝাঁক। জিভে শান দেওয়া শুরু হয়েছিল। কিন্তু দেখা দিয়েও ঝাঁকটা হঠাৎ কোথায় যেন মিলিয়ে গেল!

কোথায় গেল? কেনই বা গেল?

ভরা মরসুমে ইলিশের আকাল আর আমবাঙালির হা-হুতাশ দেখে এই প্রশ্নটাই এখন তাড়া করছে মৎস্যজীবী থেকে ব্যবসায়ী, গবেষক ও সরকারি কর্তাদের। অনেকে বলছেন, সকালের চেহারা দেখেই যদি ধরে নেওয়া হয় দিনের বাকিটা তেমনই যাবে, তা হলে হামেশা ঠকতে হয়। এ বার ইলিশের ক্ষেত্রে ঠিক সেটাই হয়েছে।

জুনের গোড়ায় মনে হয়েছিল, রুপোলি ফলনে এ বার বুঝি মাছের গোলা উপচে পড়বে। বাজার তখন ছেয়েছে পাঁচশো-সাতশো-আটশো গ্রামের ঝকঝকে ইলিশে। খুচরো বাজারে বিকোচ্ছে ছ’শো-আটশো টাকা কেজি দরে। জাতও তেমন সরেস। ‘‘পর পর দু’সপ্তাহে দু’দিন মোট তিনটে ইলিশ কিনেছিলাম। আটশো টাকা কেজি। স্বাদে-গন্ধে অপূর্ব। তেলও বেরোল দারুণ।’’— সুখস্মৃতি হাতড়াচ্ছেন দক্ষিণ কলকাতার টিপু সুলতান রোডের রাধা বেরা।

ব্যবসায়ীরা জানাচ্ছেন, বাজার কাঁপানো ওই সব ইলিশ বঙ্গোপসাগর থেকে সুন্দরবন উপকূল দিয়ে ঢুকেছিল রায়দিঘি, ক্যানিং, কাকদ্বীপ, ডায়মন্ড হারবারে। বাঁশদ্রোণীর মৎস্য-ব্যবসায়ী বাবু দাসের কথায়, ‘‘একটা বিশাল ঝাঁক সমুদ্র থেকে সুন্দরবন উপকূল ধরে মিষ্টি জলে ঢুকেছিল। সব এক জাতে। প্রতিটার স্বাদ প্রায় এক।’’ ওই তল্লাটের মৎস্যজীবীরাও চমকে উঠেছিলেন। কারণ, সুন্দরবন উপকূল দিয়ে বহু বছর এত ইলিশ ঢোকেনি।

অথচ এখন ওদের টিকিটিও নেই! দিন পনেরো-কুড়ি রমরমা দেখিয়ে ইলিশের স্রোত কমতে শুরু করে। জুলাইয়ের গোড়ায় এসে ভোজবাজির মতো একেবারে গায়েব! কেউ বুঝতে পারছেন না, অত বড় ঝাঁকটা গেল কোথায়। পশ্চিমবঙ্গ প্রাণী ও মৎস্যবিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক তেলেগুনডা শ্রীনিবাসন নাগেশের পর্যবেক্ষণ, ‘‘ইলিশের জোগান দিন-কে-দিন কমছে, সেটা অন্য কথা। কিন্তু এত ইলিশ এসেও এত তাড়াতাড়ি অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা সাম্প্রতিক অতীতে ঘটেনি।’’

এমনটা হল কেন?

বিভিন্ন মহলের বিভিন্ন মত। যেমন দিঘা মৎস্যজীবী সংগঠনের সম্পাদক শ্যামসুন্দর দাসের ব্যাখ্যা, ‘‘ইলিশ ধরার অনুকূল পরিবেশ হল পুবালি বাতাস আর ঝিরঝিরে বৃষ্টি। টানা এক মাস তেমন আবহাওয়া নেই। ইলিশও নেই।’’ রাজ্য সরকারের ইলিশ গবেষণাকেন্দ্রের প্রকল্প-অধিকর্তা সপ্তর্ষি বসুও মনে করেন, পুবালি বাতাস না-পেয়ে ইলিশের ঝাঁক বাংলাদেশে চলে গিয়েছে। পরিযায়ী মাছ হওয়ার সুবাদে ইলিশ বিভিন্ন কারণে আচমকা গতিপথ পরিবর্তন করে বলে জানান মৎস্য-বিজ্ঞানীরা।

এবং ইলিশের ঝাঁকের এ ভাবে উধাও হওয়ার পিছনে আবহাওয়ার বড় ভূমিকা দেখছেন অনেকে। তাঁরা বলছেন, জুলাইয়ের গোড়া থেকে নানা কারণে সমুদ্র বারবার উত্তাল হওয়াটা এর অন্যতম কারণ হতে পারে। ‘‘বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের জেরে সাগরে জলের পরিমাণ কখনও হঠাৎ বেড়ে গিয়েছে। জলের গভীরতাও বেড়েছে। হতেই পারে, এ সবের জন্য ইলিশের ঝাঁক গতিপথ বদলে ফেলছে। কিংবা আরও গভীর জল দিয়ে যাচ্ছে। জেলেরা নাগাল পাচ্ছেন না।’’— মন্তব্য শ্রীনিবাসন নাগেশের।

মৎস্যজীবী ও ব্যবসায়ীদের একাংশও পরিস্থিতির পিছনে প্রকৃতির হাত দেখতে পাচ্ছেন। ডায়মন্ড হারবারের আড়তদার বিজয় সিংহ বলেন, ‘‘সম্প্রতি বন্যার তোড়ে দূষিত জল সাগরে ঢুকেছে। ইলিশ ওখানে থাকতে পারছে না। চলে গিয়েছে সমুদ্রের আরও নীচে। ট্রলারের জাল

অতটা পৌঁছাতে পারছে না।’’ কাকদ্বীপের মৎস্যজীবী শ্যামল দাসের অভিমত, ‘‘দুর্যোগের জেরে ইলিশের ঝাঁক পথ পাল্টেছে। চলে গিয়েছে বাংলাদেশ, মায়ানমারের গভীর সমুদ্রে।’’

কিছু মহল আবার মানুষের হাতও দেখছেন। যেমন মৎস্য-বিজ্ঞানী অমলেশ চৌধুরী আঙুল তুলছেন নির্বিচারে ছোট ইলিশ শিকারের দিকে। ‘‘এ বার জুনের মাঝামাঝি থেকে জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহ ইস্তক কাকদ্বীপ, দিঘা, নামখানায় কয়েক হাজার ট্রলার দাপিয়ে বেড়িয়েছে। অন্য বছরে যায় সেপ্টেম্বরে। আগে-ভাগে ছোট ইলিশ ধরার খেসারত দিতে হচ্ছে।’’— মন্তব্য অমলেশবাবুর। রাজ্যের মৎস্যমন্ত্রী চন্দ্রনাথ সিংহও একমত। তাঁর বক্তব্য, ‘‘অকালে ইলিশ ধরায় এখন আকাল। আমরাও চিন্তিত।’’

কারণ যা-ই হোক, বাজারে হাহাকার। হাজার-বারোশো টাকা দিয়েও যে ইলিশ মিলছে, তাতে নেহাত কাগুজে স্বাদ। ব্যবসায়ীরা জানাচ্ছেন, পশ্চিমবঙ্গের ‘নিজস্ব’ ইলিশের বড় অংশের জোগান আসে খেজুরি-দিঘা-কোলাঘাটের মতো পূর্ব মেদিনীপুরের বিভিন্ন জায়গা থেকে। যেখানে এ বার এখনও তেমন মাছ ওঠেনি।

এমতাবস্থায় সুন্দরবনের ইলিশই আশা জাগিয়েছিল। সে-ও হাপিস! তার মানে এ মরসুমের মতো বাঙালির ইলিশ-ভাগ্যে ছাই?

কেউ কেউ অবশ্য আশাবাদী। উত্তর কলকাতার মাছ-ব্যবসায়ী বাবু দাস বলছেন, ‘‘এখনও দিন কুড়ি, মানে এই মাসটা বাকি আছে। ঝাঁকটা বোধহয় ফিরে আসবে।’’

সেই আশায় বুক বেঁধে থাকা ছাড়া উপায় কী?

mehbub kader choudhuri hilsa crisis ilish crisis frustrated bengali early july hilsa supply kolaghat hilsa bangladeshi hilsa padma hilsa ganga hilsa hilsa lost
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy