Advertisement
E-Paper

দেহ ফিরিয়ে হাসপাতাল বলে দিল, ‘নেব না, যান’

শববাহী গাড়ি এসে গিয়েছে। এক গোছা ধূপ গুঁজে তাতে দেশলাই ঠোকার সময়েই ফোনটা এল— ‘জায়গা নেই, বডি আনবেন না।’ছোট থেকে বিজ্ঞানমনস্ক, পুজো-আচ্চা, ঠাকুর-দেবতায় তেমন ভরসা কোনও দিনই পাননি অজিত বড়াল। মারা যাওয়ার আগে তাই পইপই করে বাড়ির লোকজনকে বলে গিয়েছিলেন— ‘দেহটা যেন দান করে দেওয়া হয়। অ্যানাটমির ছেলেদের কাজে লাগবে।’

সুপ্রকাশ মণ্ডল

শেষ আপডেট: ০৯ মার্চ ২০১৬ ০২:৩৩
মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল — নিজস্ব চিত্র

মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল — নিজস্ব চিত্র

শববাহী গাড়ি এসে গিয়েছে। এক গোছা ধূপ গুঁজে তাতে দেশলাই ঠোকার সময়েই ফোনটা এল— ‘জায়গা নেই, বডি আনবেন না।’ ছোট থেকে বিজ্ঞানমনস্ক, পুজো-আচ্চা, ঠাকুর-দেবতায় তেমন ভরসা কোনও দিনই পাননি অজিত বড়াল। মারা যাওয়ার আগে তাই পইপই করে বাড়ির লোকজনকে বলে গিয়েছিলেন— ‘দেহটা যেন দান করে দেওয়া হয়। অ্যানাটমির ছেলেদের কাজে লাগবে।’

কল্যাণী জওহরলাল নেহরু মেমোরিয়াল মেডিক্যাল কলেজ অবশ্য সে আশায় কর্ণপাত করতে রাজি ছিল না। প্রায় ‘দূর ছাই’ করার ভঙ্গিতে তারা জানিয়ে দিয়েছে ‘দেহ নেওয়া যাবে না।

অ্যানাটমি বিভাগ সাড়া না দিলেও মেডিক্যাল কলেজ কর্তৃপক্ষ অবশ্য মনে করছে কাজটা ‘ঠিক হয়নি।’ কলেজ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ওই মরদেহ নেওয়ার ব্যবস্থা অনায়াসেই করা যেত। কলেজ সূত্রে জানা গিয়েছে, অ্যানাটমি বিভাগের প্রধানের এমন ব্যবহার নতুন নয়। এর আগেও নিজের খেয়ালখুশি দান করা দেহ ফিরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। তবে মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ জানিয়েছেন, ‘‘অভিযোগ গুরুতর। অভিযোগ পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’’

হুগলির ঘুটিয়া বাজারের অজিতবাবু ইছাপুর রাইফেল কারখানার কর্মী ছিলেন। বছর পঁচিশ আগে তিনি মরনোত্তর দেহ দানের অঙ্গীকার করেছিলেন। তাঁর ছেলে সুমন্তবাবু বলেন, ‘‘বাবা আগাগোঁড়া বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ ছিলেন। ছিলেন চরম নাস্তিকও। বিজ্ঞান বিষয়ক বিভিন্ন কাজকর্ম নিয়েই মেতে থাকতেন। সেই জায়গা থেকেই তাঁর এই মরনোত্তর দেহ দানের অঙ্গীকার।’’ স্পষ্টতই হতাশ সুমন্তবাবু বলছেন, ‘‘এটা বাবার ইচ্ছেকে বড্ড বেশি অমর্য়াদা করা হল।’’

অজিতবাবুর পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, আটপৌরে মধ্যবিত্তের বাড়ি। দেহদান নিয়ে তাই সকলেরই কম বেশি আপত্তি ছিল। তবে সে সবে কান দেননি তিনি। উল্টে নিজের স্ত্রী নীলিমাদেবীরও দেহ দানের অঙ্গিকারপত্র তৈরি করিয়েছিলেন। বেশ কয়েক মাস ধরে অসুস্থ ছিলেন অজিতবাবু। গত তিন মাস ধরে প্রায় শয্যাশায়ী। চিকিৎসকেরা জানান, অ্যাকিউট রেনাল ফেলিওর' থেকে সোমবার রাতে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তিনি।

সুমন্তুবাবু বলেন, ‘‘এ দিন সকালে আমরা কল্যাণী মেডিক্যাল কলেজের অ্যানাটমি বিভাগে ফোন করি।’’ তিনি জানান, তখন তাঁদের কিছুক্ষণ পরে ফোন করতে বলা হয়। কিন্তু তাঁরা যখন রওয়ানা দিচ্ছেন তখন মেডিক্যাল কলেজ থেকে জানিয়ে দেওয়া হয় যে, তারা দেহ নিতে পারবে না। কেন? দায়সারা ভঙ্গিতে জবাব আসে, জাযগা নেই।

বেগতিক দেখে এ বার স্থানীয় এক বিজ্ঞানপ্রেণী সংগঠনের সভাপতি বিবর্তন ভট্টাচার্য বড়াল পরিবারের হয়ে ফোন করেন হাসপাতালে। তিনি বলেন, ‘‘ওঁদের ফোন পেয়ে আমি অ্যানাটমি বিভাগের প্রধান ডাঃ ধ্রুব চক্রবর্তীকে ফোন করি। তিনি আমার সঙ্গে চরম দুর্ব্যবহার করেন। জানিয়ে দেন, এই দেহ তাঁরা নেবেন না।’’ অপমানিত হয়ে তিনি কলেজের অধ্যক্ষ শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায় ফোনে বিষয়টি জানান।

শান্তনুবাবু বলেন, '‘‘মৃতদেহ সংরক্ষণের জন্য আমাদের চারটি ট্যাংকার রয়েছে। সেগুলি খালি না থাকলে বিকল্প ব্যবস্থা করা যেত। কেন তা করা গেল না তা খোঁজ নিয়ে দেখতে হবে।’’ তবে, ধ্রুববাবু সে সবের তোয়াক্কা করছেন না। তিনি স্পষ্ট বলছেন, ‘‘উনি কি বললেন তা দিয়ে কিছু যায় আসে না। ওঁর (শান্তনুবাবুর) অধ্যক্ষ হওয়ার কোনও যোগ্যতা নেই। ওই চেয়ারে আমার বসা উচিৎ ছিল’’

তবে বিষয়টি ভাল বাবে নিচ্ছে না স্বাস্থ্যভবন। রাজ্যের স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিকর্তা সুশান্ত বন্দ্যোপাধ্যায় বলছেন, ‘‘দেহদান স্বাস্থ্য আন্দোলনের একটা অঙ্গ। কেউ স্বেচ্ছায় দেহদান করতে চাইছেন আর তা সরকারি হাসপাতাল থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হল, এটা অন্যায়। বিষয়টা খোঁজ নিয়ে দেখা হবে।’’

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy