হাট আছে। গরু নেই! গরুহাটের চেনা হাঁকডাক, দরাদরি, ব্যস্ততা উধাও। মার খাচ্ছে ব্যবসা। নতুন রাজ্য সরকারের কিছু বিধিনিষেধের জেরে গো-পালক এবং পশু ব্যবসায়ীরা বেকায়দায় পড়েছেন বলে অভিযোগ।
হুগলির আরামবাগের মায়াপুরে গরুহাটের বয়স ৯০ বছর পেরিয়েছে। হাট বসে প্রতি রবিবারে। গত দুই রবিবার বসেনি। বকরি ইদের আগের দুই বৃহস্পতিবারেও এই হাট বসে। এ বার তা-ও বসেনি।
হাট মালিকদের অন্যতম অর্ধেন্দু সাহা জানান, রবিবার গড়ে দেড়শো গরু কেনাবেচা হয়। লেনদেন কমপক্ষে কোটি টাকার। ইদের সময়ে বিক্রি বাড়ে। গোঘাটের বলরাম কোলে, পুরশুড়ার শেখ হায়দার প্রমুখ জানান, ৩০-৪০ হাজার টাকায় বাছুর কিনে বছর দেড়েক প্রতিপালন করে ৬০ থেকে ৮০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। হাট বন্ধে তাঁরা দুশ্চিন্তায়। সরকারি নির্দেশিকা কার্যকর করে দ্রুত হাট চালুর দাবি করছেন গো-পালক এবং ব্যবসায়ীরা।
পান্ডুয়ায় জিটি রোডের ধারে গরুহাট চলছে ১৯৪৫ সাল থেকে। প্রতিদিন হাট বসে। এই হাটের সঙ্গে ১২-১৫ হাজার মানুষ যুক্ত। এখানেও বেশ কিছু দিন ধরে গরু নেই। খদ্দের এসে ফিরে যাচ্ছেন। বুধবার, বকরি ইদের আগের দিনও একই পরিস্থিতি দেখা গেল। গরুহাটের মালিকদের অন্যতম মফিজুর রহমান জানান, অন্যান্য জেলা বা ভিন্ রাজ্য থেকে গরু আসছে না। স্থানীয় চাষিরাও গরু বেচতে আসছেন না। হাটের এই পরিস্থিতিতে এলাকার অর্থনৈতিক বুনিয়াদ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
পান্ডুয়ার ডিভিসি পারের ঘাটাল-মালিক ওমপ্রকাশ সাউ বলেন, ‘‘আমরা দুধের ব্যবসা করি। বয়স হলে গরু হাটে বিক্রি করি। তার বদলে নতুন গরু কিনি। আমার ৩২টি গরু আছে। এ বার ২০টি গরু বেচে ২০টি কেনার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু হাটে কেনাবেচাই তো বন্ধ!’’ তাঁর সংযোজন, ‘‘ব্যবসার জন্য ঋণ নিতে হয়। এই পরিস্থিতি চললে কয়েক লক্ষ টাকা লোকসান হবে।’’ একই বক্তব্য পান্ডুয়া স্টেশন রোডের খাটাল-মালিক মনোতোষ সিংহের।
এই গরুহাট থেকে আশপাশের ৫০০ জনের বেশি প্রান্তিক মানুষ বিনামূল্যে গোবর নিয়ে যান। ঘুঁটে বেচে সংসার চালান। হাটে গরু না আসায় তাঁদের সংসারেও টান পড়েছে। মুর্তজা বিবি নামে এক যুবতীর কথায়, ‘‘হাট শুনশান। গোবর পাচ্ছি না। আমার মতো অনেকেই সমস্যায় পড়েছেন।’’
গরু বিক্রি না হওয়ায় মাথায় হাত হাওড়ার উলুবেড়িয়ার বীরশিবপুর পশু হাটের ব্যবসায়ীদেরও। ব্যবসায়ীরা জানান, কুরবানির এক মাসে পাঁচ-ছ’হাজার গরু বিক্রি হয়। হাটের মালিক আসপিয়ার রহমান জানান, এ বছর বিক্রি কার্যত শূন্য। তিনি বলেন, ‘‘মুসলিম সম্প্রদায়ের বেশিরভাগ মানুষই গরু কুরবানি দিচ্ছেন না। গরুবোঝাই গাড়িও আসছে না।’’ তিনি জানান, এখানে বেশির ভাগ গরু ওড়িশা থেকে আসে। অনেক গৃহস্থও গরু বিক্রি করেন। সব বন্ধ।
আমতার এক গৃহবধূ বলেন, ‘‘আমার একটি গরু আছে। সেটি দুধ দেওয়া বন্ধ করায় বিক্রি করে একটি দুধেল গরু কেনার কথা ভেবেছিলাম। গরু কেনাবেচা বন্ধ হওয়ায় সেই পরিকল্পনা ভেস্তে গিয়েছে।’’ স্থানীয় চা-জলখাবারের দোকানের মালিকেরা জানান, গরুহাটে লোকজন না আসায় তাঁদের বিক্রিও তলানিতে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)