আগামী বিধানসভা নির্বাচনের জন্য বারাসত সাংগঠনিক জেলার কোর কমিটি গঠন করেছে তৃণমূল। সেই কোর কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে রাজ্যের খাদ্যমন্ত্রী রথীন ঘোষকে। যুগ্ম আহ্বায়ক হয়েছেন হাবড়ার বিধায়ক তথা প্রাক্তন মন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক, রাজ্য রাজনীতিতে যাঁর পরিচিতি বালু নামে। নতুন এই কমিটি গঠনের সঙ্গে সঙ্গেই প্রশ্ন উঠছে, রথীনকে আহ্বায়ক ও বালুকে যুগ্ম আহ্বায়ক করে কি হাবড়ার বিধায়কের গুরুত্ব কমানো হল? সঙ্গে আরও প্রশ্ন উঠছে, আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে কি প্রার্থী হবেন বালু?
রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এ বারের বিধানসভা নির্বাচনে দুর্নীতিতে অভিযুক্ত কিংবা দুর্নীতির অভিযোগে জেল খেটে আসা বিধায়কদের আর প্রার্থী করবে না তৃণমূল। সেই তালিকায় রয়েছেন তৃণমূলের প্রাক্তন মহাসচিব তথা প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়, পলাশীপাড়ার বিধায়ক মানিক ভট্টাচার্য, বড়ঞার তৃণমূল বিধায়ক জীবনকৃষ্ণ সাহার মতো নেতারা। এঁরা সকলেই শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতিতে জেল খেটেছেন। পার্থ এবং মানিক বর্তমানে জামিনে মুক্ত হলেও, জীবনকৃষ্ণ রয়েছেন জেলবন্দি। পার্থ আবার দল থেকে নিলম্বিতও (সাসপেন্ড) রয়েছেন। তাই রাজ্যের হেভিওয়েট নেতা হলেও, এ বার আর তাঁর তৃণমূলের টিকিটে প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
আরও পড়ুন:
অন্য দিকে, রেশন দুর্নীতি মামলায় ২০২৩ সালের ২৭ অক্টোবর ইডির হাতে গ্রেফতার হন জ্যোতিপ্রিয়। এক বছর দু’মাস জেলে থাকার পর গত বছর ১৫ জানুয়ারি জামিনে মুক্তি পান তিনি। জেলযাত্রার কারণে তাঁকে মন্ত্রিসভা থেকে সরিয়ে দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাই জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর নিজের বিধানসভা কেন্দ্র হাবড়ায় পরিষেবা দেওয়ার পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার অধিবেশনে নিয়মিত যোগদান করেছেন তিনি। পলাশীপাড়ার তৃণমূল বিধায়ক মানিকও জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর বিধায়ক হিসাবে কাজ শুরু করেছেন। তবে তৃণমূল নেতৃত্বের কাছে জ্যোতিপ্রিয়ের গুরুত্ব অন্যদের তুলনায় বেশি। কারণ, তৃণমূল গঠনের প্রথম দিন থেকেই মমতা উত্তর ২৪ পরগনা জেলায় সংগঠনের দায়িত্ব তাঁর হাতে তুলে দিয়েছিলেন। আর বালুর চষা জমিতেই ২০১১ সালে উত্তর ২৪ পরগনায় ভাল ফল করে তৃণমূল, সরকার গঠনে যা সহায়তা করেছিল। তাই পার্থ-মানিক-জীবনকৃষ্ণের সঙ্গে যে বালুকে এক আসনে বসানো যাবে না, তা মানছেন তৃণমূলের অন্দরের অনেকেই। তাই কোর কমিটিতে যুগ্ম আহ্বায়কের দায়িত্ব পাওয়ার পর যে তাঁর বিধানসভা ভোটে টিকিট পাওয়ার সম্ভাবনা কমছে, এমনটা ভাবতে নারাজ তৃণমূল রাজ্য নেতৃত্বের বড় একটি অংশ। একটি অংশ বালুর এই পদপ্রাপ্তিকে তাঁর পক্ষে ‘শুভ ইঙ্গিত’ বলেও মনে করছে।
তবে তৃণমূলের একটি সূত্র জানাচ্ছে, বালু নিজে আর হাবড়া থেকে ভোটে দাঁড়াতে চাইছেন না। বরং এ ক্ষেত্রে তাঁর পছন্দের আসন বারাসত। কিন্তু বারাসত আসনের জন্য আরও অনেক দাবিদার রয়েছেন। যেমন, লোকসভার এক সাংসদ তাঁর পুত্রকে বারাসত কেন্দ্রে তৃণমূলের প্রার্থী করতে চান বলেই খবর। আবার, বিজেপি থেকে তৃণমূলে ফিরে নিজের জন্য নিরাপদ একটি আসন খুঁজছেন বিধাননগরের এক হেভিওয়েট নেতা। তাঁর নজরও রয়েছে বারাসত কেন্দ্রের দিকেই। বারাসত পুর এলাকার এক নেতা বারাসাত কেন্দ্রে প্রার্থী হতে চান বলে খবর। এ ক্ষেত্রে তাঁর পক্ষে রয়েছেন রাজ্যের এক মন্ত্রী। উত্তর ২৪ পরগনার আরও এক প্রভাবশালী বিধায়ক নিজের আসন বদল করে বারাসত যেতে চাইছেন। তবে উত্তর ২৪ পরগনা জেলা তৃণমূলের এক প্রবীণ নেতার কথায়, ‘‘বালুর দিদির প্রতি আনুগত্য অনেকের চেয়ে বেশি। যাঁরা টিকিট পাওয়ার জন্য দৌড়াদৌড়ি করছেন, তাঁদের একটা কথা মাথায় রাখা দরকার, বালুর দু’বারের জেতা কেন্দ্র গাইঘাটা সংরক্ষিত প্রার্থীর জন্য নির্ধারিত হয়ে যাওয়ায় ২০১১ সালে দিদিই তাঁকে হাবড়ায় লড়াই করতে পাঠিয়েছিলেন। তাই কোর কমিটিতে বালুর জায়গা যা-ই হোক না কেন, দিদি জানেন, বালুর তাঁর প্রতি ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা কতখানি।’’
প্রসঙ্গত, এই কোর কমিটিতে মন্ত্রী রথীন এবং বিধায়ক জ্যোতিপ্রিয় ছাড়াও রয়েছেন বারাসতের সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার, দমকলমন্ত্রী সুজিত বসু, বিধাননগর পুরসভার চেয়ারম্যান সব্যসাচী দত্ত, বারাসত পুরসভার চেয়ারম্যান সুনীল মুখোপাধ্যায়, অশোকনগরের বিধায়ক তথা উত্তর ২৪ পরগনা জেলা পরিষদের সভাধিপতি নারায়ণ গোস্বামী, রাজারহাট নিউটাউনের বিধায়ক তাপস চট্টোপাধ্যায়, দেগঙ্গার বিধায়ক রহিমা মণ্ডল প্রমুখ। এ ছাড়াও কমিটিতে জায়গা দেওয়া হয়েছে তৃণমূল নেতা মিনু দাস চক্রবর্তী, আনিসুর রহমান বিদেশ, তাপস দাশগুপ্ত, লিংকন মল্লিক, মহম্মদ আফতাবউদ্দিন, অসিত হালদার ও সোহম পালকে।