‘যুব সাথী’ প্রকল্প চালু হতেই পরিষেবা পেতে জেলায় জেলায় ভিড় জমালেন বেকার যুবক-যুবতীরা। লাইনে ছিলেন মাধ্যমিক পাশ করা শ্রমিক থেকে পিএইচডি করে চাকরির খোঁজে থাকা যুবক। কোথাও আবার ভাতার জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে গন্ডগোলও হল।
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে ‘যুব সাথী’ প্রকল্প চালু করেছে তৃণমূল সরকার। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে কর্মহীনদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে আগামী ১ এপ্রিল থেকে মাসিক ১৫০০ টাকা ভাতা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে বিধানসভা কেন্দ্রভিত্তিক শিবির শুরু হল রবিবার থেকে। প্রথম দিনেই ‘অভূতপূর্ব সাড়া’ মিলেছে বলে জানাচ্ছে প্রশাসন। হুগলির চুঁচুড়ায় ‘যুব সাথী’র ফর্ম জমা নেওয়া সরকারি শিবির হয়েছে রবীন্দ্র ভবনে। আগামী ১০ দিন ধরে এই শিবির চলবে। প্রথম দিনে তদারকি করতে উপস্থিত হয়েছিলেন চুঁচুড়ার বিধায়ক অসিত মজুমদার। তিনি জানান, চুঁচুড়া বিধানসভায় চারটি শিবির হয়েছে। প্রতিটিতেই ২১ থেকে ৪০ বছর বয়সিদের ভিড়। তাঁদের কেউ বলছেন, ‘‘বেকার বলে বাড়ির গঞ্জনা শুনছি। ভাতা হোক, তা-ও ক’টা টাকা তো পকেটে থাকবে।’’ কেউ আবার বলছেন, চাকরির পরীক্ষার ফর্ম কেনার জন্য এই টাকা কাজে লাগবে।
চুঁচুড়ায় ‘যুব সাথী’র জন্য আবেদনকারীদের ভিড়ে ছিলেন তুহিনকুমার নাথ। বিশ্বভারতী থেকে পিএইচডি করছেন তিনি। ভাতা নিয়ে কী বক্তব্য? চাকরি না ভাতা? প্রশ্ন শুনেই হেসে ফেলেন তুহিনকুমার। নথিপত্র হাতে যুবক বলেন, ‘‘সরকারের সিদ্ধান্ত মানুষের ভালর জন্যই বলে মনে করছি।’’ তাঁর সংযোজন, ‘‘যে চাকরির চেষ্টা করবে, সে ভাতা পেলেও চেষ্টা করবে, না পেলেও চাইবে। যত দিন চাকরি না পাওয়া যাচ্ছে, তত দিন সরকারি সাহায্য পাওয়া যাবে, সেটাই কম কী! সকলেরই তো আর্থিক সাহায্যের দরকার হয়।’’ যুক্তি যুবকের। তুহিনকুমারের মতো ওই লাইনে দাঁড়ানো আর এক যুবক বলেন, ‘‘চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছি। কিন্তু ফর্মের যা দাম! ভাতার টাকাটা দিয়ে চাকরির ফর্ম-ই কিনব।’’ অনেক কলেজ পড়ুয়া জানিয়েছেন, ভাতার টাকাটা যাতায়াতের সময় খরচ করবেন।
বিরুদ্ধমতও রয়েছে। কোচবিহারে ‘যুব সাথী’র প্রকল্পের জন্য আবেদনকারী বলেন, ‘‘চাকরি যখন নেই, ভাতা-ই নিই। এ এমন সময়, যা পাই, তা-ই সই।’’ আবার তিন মাসের সন্তান কোলে ‘যুব সাথী’র লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন তুহিনা খাতুন। তিনি বলেন, ‘‘গ্রাজুয়েট হয়ে বেকার। চাকরি পেলে তো ভাল হয়. আপাতত ভাতা পাব, তা-ই ভাল।’’
আরও পড়ুন:
মালদহের চাঁচলে ‘যুব সাথী’র ফর্ম পূরণের লাইনে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। পরিকল্পনা এবং পরিকাঠামো অভাব ছিল বলে জানান বিধায়ক। মালদহের চাঁচল-১ ব্লকের পাঞ্চালী মাঠে ‘যুব সাথী’ সহায়তাকেন্দ্রে সকাল থেকেই লম্বা লাইন ছিল। আবেদনকারীদের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি হয়। পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পুরুষ এবং মহিলাদের জন্য আলাদা লাইনের ব্যবস্থা করা হয়নি বলে অভিযোগ ওঠে। বিধায়ক নিহাররঞ্জন ঘোষ জানান, পরিকল্পনার অভাব ছিস। মালদহের জেলাশাসক প্রীতি গোয়েল বলেন, ‘‘পুলিশ দেখছে বিষয়টা। আর কোথাও বিশৃঙ্খলা হবে না।’’
কোচবিহারের ন’টি বিধানসভা কেন্দ্রে মোট ৩৪টি সহায়তাকেন্দ্র খোলা হয়েছে। উৎসব অডিটোরিয়াম, ঠাকুর পঞ্চানন ভবন এবং রবীন্দ্র ভবন, পুরসভা এলাকার তিনটি শিবিরেই সকাল থেকে যুবক-যুবতীদের লম্বা লাইন ছিল। মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেছিলেন, ২৯৪টি বিধানসভায় ২৯৪টি শিবির হবে। কিন্তু সাধারণ যুবক-যুবতীদের কথা মাথায় রেখে শিবিরের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে কোচবিহারে। পঞ্চানন ভবনের সহায়তাকেন্দ্রের উদ্বোধন করেন জেলাশাসক রাজু মিশ্র।
উল্লেখ্য, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা করেছেন, ‘‘২১ থেকে ৪০ বছর বয়স পর্যন্ত মাধ্যমিক পাশ করা যুবকেরা পাঁচ বছর আপাতত এই সুবিধা পাবেন। তার পরে পুনর্বিবেচনা করা হবে, যত দিন তাঁরা চাকরি না পান।’’ মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণার পরে ‘যুব সাথী’ প্রকল্পের জন্য যে আবেদনপত্র তৈরি হয়েছে, তার সঙ্গে আধার কার্ড, ভোটার কার্ড, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের নথি বা বাতিল চেক এবং মাধ্যমিক বা সমতুল পরীক্ষার মার্কশিট অথবা শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রমাণ হিসেবে শংসাপত্র দিতে হবে। সংশ্লিষ্ট আবেদনকারী শিক্ষাগত বৃত্তি ছাড়া সরকারি আর কোনও সুবিধা পান কি না, জানাতে হবে। সেই সঙ্গেই অঙ্গীকার করতে হবে, আবেদনকারী এখন বেকার, কোনও ভাতার আওতায় নেই এবং তাঁর দেওয়া কোনও নথি বা তথ্য অসত্য প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। ‘দুয়ারে সরকার’-এ নথিভুক্তির নম্বর দিয়ে আবেদনপত্র গৃহীত হবে। যদিও বিরোধীদের বক্তব্য, সরকারি কর্মীদের ডিএ দিতে পারেনি রাজ্য। সরকারি চাকরি নেই। কর্মহীন যুবক-যুবতীদের সামান্য ভাতা দিয়ে ভোটের রাজনীতি করছে তৃণমূল।