রাত তখন ২টো হবে। সবেমাত্র চোখ দুটো লেগে এসেছিল। অত রাতে হঠাৎ ফোন বেজে ওঠায় ধড়মড়িয়ে উঠে পড়ি। ঘুম চোখেকোনও মতে ফোন ধরতেই ও-প্রান্ত থেকে চিৎকার, ‘‘গুদামে আগুন লেগে গিয়েছে। তাড়াতাড়ি আয়। আমাদের বাঁচা!’’ ফোনে সহকর্মীর এ কথা শুনে আমি আর দেরি করিনি।মোটরবাইক নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে সোজা গুদামে চলে গিয়েছিলাম। সেখানে পৌঁছে বুঝতে পারলাম, ওইটুকু সময়ের মধ্যেই সবাই আগুনের গ্রাসে চলে গিয়েছেন।
বছরখানেকের বেশি হল, মোমোর গুদামে আমি কাজ করছি। রবিবার সারা দিন গুদামেই ছিলাম।নানা কাজ সেরে নাজিরাবাদের ওই গুদাম থেকে যখন বেরোই, তখন রাত প্রায় ৮টা বেজে গিয়েছিল। সহকর্মী বাসুদেব হালদার-সহ আরও কয়েক জন গুদামে রাতেরডিউটিতে ছিলেন। কিন্তু ওঁদের সঙ্গে সেটাই যে শেষ দেখা, তা কি আর তখন জানতাম!
কাজের জায়গায় বাসুদেবের সঙ্গেই আমার সব থেকে বেশি বন্ধুত্ব ছিল। একই শিফ্টে ডিউটিথাকলে দু’জনে একসঙ্গেই থাকতাম। আগুনের গ্রাস থেকে বেরোতে না-পেরে বাঁচার শেষ চেষ্টা করতেই হয়তো আমাকে ফোন করেছিল। বাইক চালিয়ে যখন যাচ্ছিলাম,তখন রাস্তা থেকেই বার বার ওর মোবাইলে ফোন করছিলাম। বার দু’য়েক বেজেওছিল। কিন্তু তার পরে আর ফোন বাজেনি। এর পরে তো ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে গিয়েছে। সেই ফোন এখনও বাজছে না।আমার বন্ধুটা বেঁচে আছে, না কি বাকিদের মতো পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছে, জানি না!
ফোন পেয়ে আমি যখন গুদামে পৌঁছই, আগুন তখনও এতটা ছড়ায়নি। সবে দমকলেরএকটি-দু’টি গাড়ি আসতে শুরু করেছে। জল দেওয়া তখনও শুরু হয়নি বললেই চলে। আশপাশের লোকজন বাইরে জড়ো হলেও তাঁদের কারও কিছু করার ছিল না। সেই ভিড় ঠেলে আমি ভিতরে ঢুকতে চেয়েছিলাম বাসুদেবকে খুঁজে আনতে।কিন্তু পুলিশ আর দমকলকর্মীরা আমাকে আটকে দেন। ওঁরা ঝুঁকি নিতে চাননি।
এর পরে কিছু ক্ষণের মধ্যেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে। আগুন দাউ দাউ করে ঘিরে ফেলে গোটা চত্বর। আগুনের শিখা গুদামের টিনের ফাঁক দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসতে থাকে। সেই সঙ্গে বেরোতে থাকে ধোঁয়া। মাঝেমধ্যেই কিছু ফাটার বিকট শব্দ হচ্ছিল। তার পরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ওই ভাবেই কেটেছে। দমকলকর্মীরা চেষ্টা করে গিয়েছেন। কিন্তু চোখের সামনেই পুরো গুদামটি পুড়ে যেতে দেখলাম। সহকর্মীরা হয়তো ভিতরে পুড়ে ছাই হয়ে গেলেন, কিন্তু আমরা কেউ কিছু করতে পারলাম না।
সহকর্মীদের খোঁজ পেতে কাল সারা দিন থানায় হন্যে হয়ে ঘুরেছি। পুলিশ শুধু সব জেনে নিয়ে নানা জায়গায় সইসাবুদ করাল। কিন্তু বাসুদেব কোথায় আছে, বাকি বন্ধুরা কোথায় আছে, সেই প্রশ্নের কোনও উত্তর পুলিশের কাছে নেই। মঙ্গলবার সকালেওনরেন্দ্রপুর থানায় গিয়েছিলাম। গুদামেও ঘুরেছি। কিন্তু কেউ কিছু বলছে না। যে গুদামে সারা দিন কাটাতাম, সেটার দিকে এখন তাকাতে পারছি না। চার দিকে শুধু ধ্বংসের চিহ্ন। লোহালক্কড়ের ওই স্তূপে, ছাইয়ের মধ্যেবন্ধুদের কারও দেহাংশ আছে কিনা, কে জানে!
(অনুলিখন: চন্দন বিশ্বাস)
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)