ইকো পার্ক
পর্যটন স্থানগুলির মধ্যে ইতিমধ্যেই পয়লা নম্বরে এটি। মুখ্যমন্ত্রীর স্বপ্নের ইকো পার্কের পরিচ্ছন্নতাও দেখার মতো। চোখ ধাঁধানো চাকচিক্য চার দিকে। কোথাও প্রজাপতির বাগান কোথাও চা বাগান। ইতিউতি ছড়িয়ে স্থাপত্য, সার দেওয়া রঙিন ফুলের গাছ। বাইরে থেকে দেখে মনে হয় রূপকথার রাজ্য। কিন্তু এত বড় পার্কে পানীয় জলের কল নেই! কেন?
অধিকর্তা দেবাশিস সেনের সাফাই, ‘‘সকলে যাতে পরিষ্কার জল পান তাই বোতলের জলের ব্যবস্থা আছে। মানুষ প্রয়োজনে কিনবেন। উন্নত সব দেশের পার্কে পানীয় জলের আলাদা ব্যবস্থা থাকে না। সুস্বাস্থ্যকর জল বলতে সকলে বোতলের জল কিনে খান।’’ ‘সরকারের গড়া পার্কে মানুষ জল কিনে খাবেন?’— প্রশ্ন আমজনতার। অনেকের যুক্তি, উন্নত দেশগুলিতে সাধারণ কলে যে জল আসে তাই গুণগত ভাবে পানের যোগ্য। সেখানে পানীয় জল বলে আলাদা জলের প্রয়োজন হয় না। অথচ আমাদের রাজ্য তথা দেশে এখনও সব জল পানের যোগ্য নয়, পানীয় জলকে পৃথক ভাবে চিহ্নিত করে দিতে হয়। সেখানে এই তুলনা কতটা প্রাসঙ্গিক সে প্রশ্নও তুলেছেন তাঁরা।
আলিপুর চিড়িয়াখানা
২ জানুয়ারি দুপুর ২টো। গিজগিজে ভিড়। কেউ ব্যস্ত কাগজ পেতে ভুরিভোজে, কেউ খেলতে। গাছের তলায় জমছে এঁটো থালা, উচ্ছিষ্ঠ। বক, কাকাতুয়ার খাঁচার উল্টো দিকে শৌচালয়। অপেক্ষার দীর্ঘ লাইন সেখানে। কৃষ্ণনগর থেকে আসা প্রতিমা সেনের প্রশ্ন, ‘‘দুর্গন্ধে দাঁড়াতে পারছি না। এত লোক আসেন, একটু পরিষ্কার রাখা যায় না?’’ বাঘের খাঁচার আগেই পানীয় জলের কল। অনেক চেষ্টা করে বিরক্ত হয়ে বারুইপুরের অর্ণব রায় বললেন, ‘‘কল রেখেছে কেন? ফোঁটা ফোঁটা জলে কতক্ষণে বোতল ভরবে।’’
ডিরেক্টর আশিসকুমার সামন্ত অবশ্য বলেন, ‘‘জলের কল নিয়ে লিখিত অভিযোগ পেলেই ঠিক করার ব্যবস্থা করি।’’ পরিচ্ছন্নতা সম্পর্কে তাঁর জবাব, ‘‘প্রয়োজনীয় কর্মী নিযুক্ত আছেন। তাঁরা সময় মতো পরিষ্কার করেন।’’
ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল
জানুয়ারির রবিবারের বিকেলে উপচে পড়া ভিড়। সঙ্গে প্রকট অব্যবস্থা। দু’তিনটি শৌচালয়ে দুর্গন্ধে যাওয়া যাচ্ছে না। বালিগঞ্জের মহুয়া সেন বলেন, ‘‘নোংরা, দুর্গন্ধে আমার মেয়ে বমি করছে।’’ অপরিচ্ছন্নতার অভিযোগ অস্বীকার করে ডিরেক্টর জয়ন্ত সেনগুপ্ত বলেন, ‘‘আমরা দেশের ‘ক্লিনেস্ট মনুমেন্ট’। শৌচালয় পরিষ্কারের দায়িত্ব এক এজেন্সিকে দেওয়া আছে। আমরা তদারকি করি।’’
মিলেনিয়াম পার্ক
রাজ্যের নতুন সরকার আসার পরে মুখ্যমন্ত্রীর উদ্যোগে যে পার্কের সংস্কার হয়েছিল তার দশা প্রায় বেহাল। উৎসব মরসুমে শহরের বিভিন্ন প্রান্ত সেজে উঠলেও এই পার্ক অন্ধকারেই। ২১টি বাতিস্তম্ভের আলো জ্বলে মাত্র দশটিতে। অথচ এক সময়ে এই পার্কটি আলো দিয়ে সাজাতে সেনা, বন্দর কর্তৃপক্ষ-সহ বিভিন্ন স্তরে আলোচনার মাধ্যমে নানা টানাপড়েন পেরোতে উদ্যোগী হয়েছিলেন খোদ মুখ্যমন্ত্রীই। সৌন্দর্যায়ন নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বরাবর এতটাই সজাগ যে নানা সময়ে তাঁর আসা যাওয়ার পথে রাস্তার আলোকস্তম্ভে বাতি না জ্বলতে না দেখলে গাড়ি থেকে নেমে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশও দিয়েছেন। শহরবাসীর একাংশের আক্ষেপ, আজকাল বোধহয় মুখ্যমন্ত্রী আর এ পথে যাতায়াত করেন না। পার্ক কর্তৃপক্ষের দাবি, বাল্ব কেটে গেলে নতুন বাতি আসতে সময় লাগে। তবে তাঁরা দ্রুততার সঙ্গেই কাজ করেন।
নলবন
সামগ্রিক ভাবে হতশ্রী দশা এখানে। কার্যত কোনও পরিকাঠামো নেই। লেকের চারপাশে কচুরিপানা, ভাঙা নৌকো, বোট। ভেঙে গিয়েছে পার্কের সাঁকোটিও। অথচ কর্তৃপক্ষের দাবি, সময় মতো পরিষ্কারের ব্যবস্থা করা হয়।
সরকারের বক্তব্য
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘অনুপ্রেরণায়’ আলোয় সেজেছে শহর। বারবারই সরকারের বিভিন্ন স্তর থেকে দাবি উঠেছে কলকাতার সৌন্দার্যায়নে যথেষ্ট সফল এই সরকার। শহরবাসীর প্রশ্ন, তা হলে পর্যটক আকর্ষণের মূল স্থানগুলির ন্যূনতম মৌলিক পরিকাঠামোর অভাব কেন সরকারের চোখে পড়ছে না?
কর্তৃপক্ষের তরফে সাফাই, এই মরসুমে এত মানুষ আসেন। তবুও তাঁরা যথেষ্ট সক্রিয় ভাল পরিষেবা দিতে। সঙ্গে তাঁদের দাবি, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে শুধু সরকারি প্রচেষ্টা যথেষ্ট নয়। এর জন্য জন-সচেতনতাও দরকার।
ছবি: স্বাতী চক্রবর্তী ও শুভাশিস ভট্টাচার্য।