সোমবার রাত থেকে মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত টানা বৃষ্টিতে কার্যত থমকে গিয়েছিল কলকাতা। এক দিকে হাঁটু থেকে কোমরসমান জল, অন্য দিকে বিদ্যুত্ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে বহু এলাকায় অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল। অফিসযাত্রী থেকে সাধারণ মানুষ, সকলে পড়েছিলেন চরম ভোগান্তিতে। দুর্গাপুজোর আগে এই পরিস্থিতি শহরবাসীর মনে আতঙ্ক তৈরি করেছে। আর তাই, এ বারের মতো অভিজ্ঞতা যাতে আর না হয়, তার জন্য আগাম প্রস্তুতিতে নেমে পড়েছে কলকাতা পুরসভা। কারণ আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, আগামী শনি ও রবিবার ফের বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। তাই পুরসভার নিকাশি বিভাগের আধিকারিকরা স্পষ্ট জানিয়েছেন, শারদোৎসবের দিনগুলিতে যদি ফের প্রবল বৃষ্টি হয়, তবে আগেভাগে পরিকল্পনা করেই পরিস্থিতি সামলানো হবে। ইতিমধ্যে মেয়র পারিষদ (নিকাশি) তারক সিংহ তাঁর প্রস্তুতি নিয়ে বিশদে জানিয়েছেন পুরসভার মেয়র ফিরহাদ হাকিমকে। এ ছাড়াও দফায় দফায় কলকাতা পুরসভার নিকাশি বিভাগে আধিকারিকদের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন তিনি। কলকাতা পুরসভার একটি সূত্র জানাচ্ছে, পুজোর দিনগুলোয় রাস্তায় সাধারণ মানুষের ঢল নামবে। যেখানে কলকাতাবাসী তো বটেই, দূরদূরান্তের জেলা থেকেও প্রচুর মানুষ কলকাতায় আসবেন। এমতাবস্থায় রাস্তায় জল জমলে, আবার ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তাই নিজেদের যাবতীয় প্রস্তুতি নিয়ে আরও সতর্ক থাকছে কলকাতা পুরসভা।
পুরসভার আগাম প্রস্তুতি
* শহরের বড় নালা ও খাল পরিষ্কার
* জলে জমার প্রবণতা রয়েছে এমন এলাকাগুলিতে মোবাইল পাম্প বসানো
* ২৪ ঘণ্টার টেকনিক্যাল টিম ও কন্ট্রোল রুম চালু
* বিদ্যুৎ সংস্থা ও পুলিশের সঙ্গে যৌথ সমন্বয়
* পুজোমণ্ডপ সংলগ্ন এলাকায় আলাদা নজরদারি।
আরও পড়ুন:
মেয়র পারিষদের (নিকাশি) বক্তব্য
এমন প্রস্তুতির পর মেয়র পরিষদ (নিকাশি) তারক বলছেন, ‘‘কলকাতা পুরসভার একটি সিস্টেম রয়েছে। যে সিস্টেম সারা বছর তৈরি থাকে, যে কোনও দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় আমরা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে নামি। কিন্তু মাত্রাতিরিক্ত বৃষ্টি হলে, পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যায়। এবং সেই পরিস্থিতি ধীর গতিতে আমরা আয়ত্তে আনি’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘পুজোর দিনগুলিতে সাধারণ মানুষের যাতে কোনও রকম অসুবিধা না হয় সে দিকে নজর থাকবে। সোম এবং মঙ্গলবার দু’দিন ধরে ৩০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টি হয়েছে। এ রকম বৃষ্টি হলে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে একটু বেশি সময় লাগবে ঠিকই, কিন্তু আমরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারব।"
নালা ও খাল পরিষ্কারে জোর
প্রথম পদক্ষেপ হিসাবে শহরের সমস্ত বড় নালা এবং খাল পরিষ্কারের কাজ জোরকদমে চলছে। ইতিমধ্যেই বিভিন্ন বরোতে বিশেষ দল গঠন করা হয়েছে, যারা প্রতি দিনই নিকাশি ব্যবস্থা পরীক্ষা করছে। আবর্জনা জমে জল যাতে আটকে না থাকে, তা নিশ্চিত করাই মূল উদ্দেশ্য। পুরসভার মতে, আগাম এই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা জল জমার ঝুঁকি অনেকটা কমাবে।
মোবাইল পাম্প এবং টেকনিক্যাল টিম
যে সব এলাকায় অতীতে জল বেশি জমেছে, সেখানে আগে থেকেই মোবাইল পাম্প বসানো হচ্ছে। টানা বৃষ্টিতে যদি ঘণ্টার পর ঘণ্টা জল দাঁড়িয়ে যায়, তবে এই পাম্প দিয়েই দ্রুত জল বার করা হবে। সেই সঙ্গে বিশেষ টেকনিক্যাল টিম তৈরি করা হয়েছে, যারা ২৪ ঘণ্টা কর্মরত থাকবে। কোথাও বিপদ দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিদ্যুত্ সংযোগে নিরাপত্তা
প্রবল বর্ষণে জল জমে যাওয়ার কারণে বিদ্যুত্স্পৃষ্ট হয়ে ১০ জনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে শহরে। এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে এ বার বিদ্যুৎ সংস্থা সিইএসই এবং পুলিশ প্রশাসনের মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয় গড়ে তোলা হচ্ছে। পুরসভার তরফে জানানো হয়েছে, আলাদা কন্ট্রোল রুম খোলা হবে এবং বিশেষ হেল্পলাইন চালু থাকবে। এ ছাড়াও যেখানে জল জমা বা বিদ্যুতের তার থেকে দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকবে, সেখানেও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করা হবে।
আরও পড়ুন:
পুজোমণ্ডপ এলাকায় বিশেষ নজরদারি
শারদোৎসবের ভিড় সবচেয়ে বেশি জমে পুজোমণ্ডপগুলিকে। তাই সেখানেও আলাদা নজরদারি থাকবে। বিদ্যুতের তার উঁচুতে তোলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে পুজো উদ্যোক্তাদের। পাশাপাশি পুজোমণ্ডপের চারপাশে জল বেরনোর ব্যবস্থা রাখতে বলা হয়েছে। প্রয়োজনে পুরসভা নিজে থেকেই সহযোগিতা করবে।
বরোভিত্তিক নজরদারি
কলকাতা পুরসভার প্রতিটি বরোতে আলাদা নজরদারি দল থাকবে। তারা নিয়মিত পরিস্থিতি খতিয়ে দেখে রিপোর্ট দেবে। কন্ট্রোল রুম থেকে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য অতিরিক্ত কর্মী এবং যন্ত্রপাতি প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
পুরসভার এক শীর্ষ কর্তা বলেন, ‘‘আমরা চাই না উৎসবের আনন্দ মাটি হোক। সোম এবং মঙ্গলবারের বৃষ্টিতে শহরবাসী যে দুর্ভোগ পোহালেন, তা থেকে শিক্ষা নিয়েই আমরা এগোচ্ছি। শারদোৎসবে আবার বৃষ্টি হলে শহর যাতে তৎপরতার সঙ্গে তা সামলাতে পারে, তার জন্য চূড়ান্ত প্রস্তুতি চলছে।” সব মিলিয়ে, দুর্গাপুজোর আগেই চূড়ান্ত সতর্কতার পথে হাঁটছে কলকাতা পুরসভা। প্রশাসনের বার্তা একটাই — যে কোনও সমস্যায় সঙ্গে সঙ্গে কন্ট্রোল রুমে যোগাযোগ করুন। শহরবাসী যাতে নির্ভয়ে উৎসব উপভোগ করতে পারেন, তার জন্য যাবতীয় পদক্ষেপ ইতিমধ্যেই করা হচ্ছে বলে আশ্বাস দিচ্ছে কলকাতা পুরসভা।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
- শারদোৎসবের সময় এমন নজিরবিহীন বৃষ্টি এর আগে কখনও দেখেনি কলকাতা।
- বৃষ্টির দুর্যোগের মধ্যে ট্রেন পরিষেবা বিঘ্নিত হওয়ার কারণে দুর্ভোগ বেড়েছে যাত্রীদের।
-
জলে গেল লক্ষ লক্ষ টাকা, বই হারিয়ে বিপর্যস্ত বইপাড়া, ক্ষতি পূরণ কী ভাবে? উত্তর নেই কলেজ স্ট্রিটে
-
বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে প্রাণ গেল প্রাণতোষের, বাবাকে হারিয়ে ছেলের প্রশ্ন, ‘কে দায়ী?’
-
কলকাতার বহু এলাকা এখনও জলমগ্ন, সবচেয়ে খারাপ হাল বালিগঞ্জের! দুপুরে ফের বৃষ্টির আশঙ্কা, বাড়তে পারে ভোগান্তি
-
চেনা ছন্দে ফেরার চেষ্টা চালাচ্ছে কলকাতা! শহরের কিছু অংশে যান চলাচল স্বাভাবিক হলেও অনেক রাস্তাই এখনও ভাসছে
-
২৪ ঘণ্টা পরেও জলযন্ত্রণা থেকে সম্পূর্ণ নিস্তার পেল না কলকাতা! উত্তর থেকে দক্ষিণের বহু এলাকা এখনও জলমগ্ন