পরিবেশ সংরক্ষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত সচেতনতা গড়ে তুলতে শহরে আয়োজিত হল এক অভিনব কর্মশালা। সৌজন্যে, স্কটিশ চার্চ কলেজ, ‘টেরি স্কুল অফ অ্যাডভান্সড স্টাডিজ়’ এবং বন্যপ্রাণপ্রেমী সংস্থা ‘সোসাইটি ফর হেরিটেজ অ্যান্ড ইকোলজিক্যাল রিসার্চেস’ (শের)। তাঁদের যৌথ উদ্যোগে ‘নোয়িং ক্লাইমেট চেঞ্জ’ শীর্ষক এক বিশেষ কর্মশালার আয়োজন করা হয় চলতি সপ্তাহে। স্কুল পর্যায়ে জলবায়ু-সচেতনতা সম্বন্ধে বাস্তব ধারণা দেওয়ার লক্ষ্যে এই কর্মশালায় মোট ২৮টি স্কুলের প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন। প্রতিটি বিদ্যালয় থেকে একজন শিক্ষক ও একজন শিক্ষার্থী যোগ দিয়েছিলেন কর্মসূচিতে।
অনুষ্ঠানের অন্যতম আয়োজক তথা শের-এর কর্ণধার জয়দীপ কুণ্ডু জানিয়েছেন, তাঁদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ‘ক্লাইমেট অ্যাম্বাসাডর’ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক সূচনা। তিনি বলেন, ‘‘এই উদ্যোগের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা কর্মশালায় জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত যে জ্ঞান অর্জন করেছে, তা প্রয়োগ করে নিজের নিজের স্কুলে বিভিন্ন আঙ্গিকে নানা প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে এবং সেরা উদ্যোগগুলিকে ভবিষ্যতে পুরস্কৃত করা হবে।’’ কর্মশালার শুরুতেই প্রতিটি অংশগ্রহণকারীর হাতে তুলে দেওয়া হয় ‘টেরি স্কুল অফ অ্যাডভান্সড স্টাডিজ়’-এর গবেষণা সহকারী শ্রী রাতুল ঘোষ রচিত বিশেষ পুস্তিকা— ‘অ্যান্থ্রোপোসিন’।
আরও পড়ুন:
কর্মশালার উদ্বোধন পর্বে উপস্থিত ছিলেন স্কটিশ চার্চ কলেজের অধ্যক্ষা মধুমঞ্জরী মণ্ডল, টেরি এসএএস-এর অধ্যাপক রঞ্জনা রায়চৌধুরী। কর্মশালার প্রথম পর্বে অবসরপ্রাপ্ত বনকর্তা শ্রী দেবল রায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রাথমিক ধারণা তুলে ধরেন। তিনি গ্রিনহাউস গ্যাসের প্রভাব, সমুদ্রের কার্বন সিঙ্ক হিসাবে ভূমিকা, জলবায়ু পরিবর্তনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, তার সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রভাব এবং পরিবেশ রক্ষায় প্রশাসনিক নীতি প্রণয়নের জটিলতা সম্পর্কে আলোচনা করেন। অন্য দিকে, রঞ্জনা ‘ক্লাইমেট স্মার্ট সিটি’ বা জলবায়ু-সচেতন নগরায়ণ বিষয়ে আলোকপাত করেন। সেখানে তিনি তাপপ্রবাহ, সমুদ্রের জলস্তর বৃদ্ধি এবং খাদ্য ও পানীয় জলের সঙ্কটের সঙ্গে বিশ্ব উষ্ণায়নের সম্পর্ক তুলে ধরেন। পাশাপাশি, ‘আরবান হিট আইল্যান্ড’ (নগরায়নের ফলে উষ্ণতা বৃদ্ধির ঘটনা) প্রভাব ও আধুনিক নগরের জন্য কার্যকর অভিযোজন-কাঠামোর প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি ব্যাখ্যা করেন। দ্বিতীয় অধিবেশন-পর্বে সাংবাদিক শ্রী জয়ন্ত বসু আন্তর্জাতিক জলবায়ু কূটনীতি ও সিওপি-কাঠামো (রাষ্ট্রপুঞ্জের জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত উদ্যোগ ‘কনফারেন্স অফ দ্য পার্টিস’)-র বিবর্তন সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের ধারণা দেন। সুন্দরবনের ক্ষয়ক্ষতি, পুনর্বাসন এবং ‘জাস্ট ট্রানজিশন’-এর প্রাসঙ্গিক উদাহরণের মাধ্যমে তিনি আন্তর্জাতিক বিষয়গুলিকে স্থানীয় বাস্তবতার নিরিখে তুলে ধরেন।
তৃতীয় পর্বের অধিবেশনে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রয়োগমূলক দিকগুলি আলোচনায় আসে। অধ্যাপক অমিতাভ রায় আধুনিক বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতির ব্যবহারিক প্রদর্শন করেন। আরটি-পিসিআর, ইউভি-ভিস স্পেক্ট্রোফোটোমিটার এবং হাই-পারফরম্যান্স লিকুইড ক্রোমাটোগ্রাফি (এইচপিএলসি)-র মাধ্যমে কী ভাবে দূষক বিশ্লেষণ ও পরিবেশ গবেষণা পরিচালিত হয়, তা শিক্ষার্থীরা হাতে-কলমে জানতে পারেন। চতুর্থ পর্বের অধিবেশনে টেরি এসএএস-এর রাতুল কৃত্রিম মেধা (এআই) এবং ‘মেশিন লার্নিং’ কীভাবে জলবায়ু বিজ্ঞানে আমূল পরিবর্তন আনছে তা আলোচনা করেন। স্যাটেলাইট ডেটা ও লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলের (এলএলএম) সমন্বয় এবং ‘ফিজিক্স-ইনফর্মড মেশিন লার্নিং মডেল’-এর প্রয়োগ তিনি বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেন। সুন্দরবনে নিজের গবেষণার অভিজ্ঞতা থেকে ম্যানগ্রোভ প্রজাতি শনাক্তকরণে এই প্রযুক্তির ব্যবহারিক উদাহরণ তুলে ধরেন তিনি। সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষাবিদ শ্রীমতী অমিতা প্রসাদ। তাঁর বক্তব্যের মূল বার্তা ছিল, ‘আমরাই জলবায়ুর চ্যাম্পিয়ন’।