সাত বছরেও বদলাল না ছবিটা!
২০০৯ সালে ঘণ্টায় ১২০ কিলোমিটার গতিবেগে আধ ঘণ্টার আয়লা-ঝড় উপড়ে ফেলেছিল কলকাতার ফুটপাথের সাড়ে ৪০০ গাছ। ডাল ভেঙেছিল আরও শ-পাঁচেক গাছের। তখনই জানা গিয়েছিল, কলকাতার ফুটপাথের ধারে যে সব গাছ লাগানো রয়েছে, একটু বেশি ঝড়ে সেগুলির এমনই হাল হবে। বুধবার রাতে ঘণ্টায় ৭০ কিলোমিটার গতিবেগের মিনিট সাতেকের ঝড়েই তার প্রমাণ পেল কলকাতা। ওই ঝড়ে ৮২টি গাছ উপড়ে পড়েছে। যার জেরে মৃত্যু হয়েছে চার জনের। বৃহস্পতিবার সারা দিনেও উপড়ে যাওয়া সবক’টি গাছ শহরের রাস্তা থেকে সরাতে পারেনি পুরসভা।
গাছ পড়ে মৃত্যুর ঘটনায় উদ্বিগ্ন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যাপাধ্যায়ও। বুধবার রাতেই পুলিশ ও পুর-প্রশাসনের কাছ থেকে সবিস্তার খবর নিয়েছেন। ঝড়ে বড় গাছ ভেঙে পড়লে শহরের জনজীবনের কী ক্ষতি হতে পারে, বুধবারের ঘটনার পরে বিষয়টি তাঁকে ভাবিয়ে তুলেছে। এক দিকে পরিবেশ রক্ষায় গাছ কাটার নানা বিধিনিষেধ, অন্য দিকে এই ধরনের বিপদের মোকাবিলা কী ভাবে একসঙ্গে করা যায়, তা গুরুত্ব দিয়ে ভাবছেন তিনি। প্রয়োজনে বড় গাছের বদলে ছোট গাছ লাগিয়ে সবুজায়নে জোর দিতে চান মুখ্যমন্ত্রী। এ ব্যাপারে নিজের ভাবনার কথা পরিবেশমন্ত্রী তথা মেয়র শোভন চট্টোপাধ্যায়কেও জানিয়েছেন মমতা। তাতে যে পরিবেশকর্মীদের খুব একটা আপত্তি রয়েছে তা নয়। পরিবেশকর্মী সুভাষ দত্তের কথায়, ‘‘পরিবেশকর্মীদেরও কখনও কখনও বাস্তবজ্ঞান প্রয়োগ করা উচিত।’’
পুরসভা ও বন দফতর সূত্রে বলা হচ্ছে, কলকাতায় ভেঙে পড়া গাছের বেশির ভাগই কয়েকটি নির্দিষ্ট প্রজাতির। আয়লার ঝড়ে মূলত বট, অশ্বত্থ, কৃষ্ণচূড়া এবং রাধাচূড়া গাছ ভেঙে পড়েছিল। বুধবারের ঝড়েও যে সব গাছ শিকড়বাকড়-সহ উল্টে পড়েছে, সেগুলিও মূলত ওই জাতীয়। আয়লার বিপর্যয়ের পরেও ওই সব গাছ কেন শহরে থেকে গেল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। শুধু আয়লাই নয়, ২০১২ সালে এপ্রিলের এক সন্ধ্যায় জোড়া কালবৈশাখীর ধাক্কাতেও মহানগরে উপড়ে পড়েছিল শ’তিনেক গাছ। তাতে কারও মৃত্যু না হলেও, বেশ কিছু বাড়ি-গাড়ির ক্ষতি হয়েছিল। সে বারও বহু রাস্তা বন্ধ ছিল ২৪ ঘণ্টা পরেও।
উদ্যানবিদেরা বলছেন, বট-অশ্বত্থ, কৃষ্ণচূড়া বা রাধাচূড়া গাছের শিকড় মাটির গভীরে যায় না। মূলত তা গাছের কাণ্ডের চারদিকে ছড়িয়ে যায়। মাটির খুব নীচেও ঢোকে না। কিন্তু কলকাতা শহরের ফুটপাথে গাছ লাগানোর জন্য যে জায়গা বরাদ্দ হয়, তাতে গাছ বাড়ে ঠিকই, কিন্তু জায়গার অভাবে শিকড় ছড়াতে পারে না। এর মধ্যে খোঁড়াখুড়ি বা নির্মাণকাজ হলে শিকড়ের অনেকটাই কাটা পড়ে। ফলে গাছের ভিত দুর্বল হয়ে যায়। একটু জোরালো হাওয়াতেই তা নড়ে গিয়ে গাছ উল্টে পড়ে। উদ্যানবিদেরা বলছেন, অনেকটা ফাঁকা জায়গা জুড়ে ওই গাছগুলি লাগালে এমন সমস্যা হওয়ার কথা নয়। কারণ সে ক্ষেত্রে শিকড় অনেক দূর ছড়াতে পারে। ফলে তা মাটির গভীরে না গেলেও গাছের গো়ড়া আলগা হয় না।
অনেকে বলছেন, ঝড়ে উপড়ে পড়া নির্ভর করে গাছের বয়সের উপরেও। দিল্লির এক পরিবেশপ্রেমী সংগঠন সমীক্ষা করে জানিয়েছিল, মহানগরের ২৭ শতাংশ গাছের বয়স ১০০ বছরের বেশি। বয়সের ভারে তারা দুর্বল হয়ে পড়েছে। কলকাতার মেয়র পারিষদ (উদ্যান) দেবাশিস কুমার বলেন, ‘‘বুধবার ভেঙে পড়া গাছগুলি অনেক পুরনো। এগুলি পোঁতার সময় দুর্ঘটনা নিয়ে ভাবা হয়নি।’’ পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক স্বদেশরঞ্জন মিশ্রের মতে, “কলকাতার রাস্তার দুধারে গাছগাছালির চেয়েও উঁচু হয়ে গিয়েছে কংক্রিটের জঙ্গল। কালবৈশাখী বা বর্ষায় দুর্যোগের সময়ে ঝোড়ো বাতাস বহুতলে ধাক্কা খেয়ে রাস্তা বরাবর গতি বাড়িয়ে ছোটে। সেই ‘টানেল এফেক্ট’ সামাল দেওয়ার ক্ষমতা অপুষ্ট গাছগাছালির নেই।’’
রাজ্য বন দফতরের এক কর্তা জানান, যে সব গাছের শিকড় সোজা মাটির গভীরে ঢুকে যায়, তারা ঝড়ে এ ভাবে উল্টোত না। উদ্যানবিদের পরামর্শ মেনে গাছ লাগানো হলে এই সমস্যা হতো না। তিনি বলছেন, ‘‘যে যেখানে পারছে, নিজের মতো করে গাছ লাগাচ্ছে। কিন্তু তা সেখানকার পরিবেশের সঙ্গে মানানসই কি না, তা কেউ দেখছে না। তাই গা ঘেঁষাঘেষি করেই বাড়ছে গাছ। কারও গোড়াই শক্ত হচ্ছে না।’’
কলকাতা পুরসভার অবসরপ্রাপ্ত উদ্যানবিদ রণজিৎ সামন্ত বলেন, ‘‘রাস্তার ধারে গাছ পোঁতার কিছু নিয়ম আছে। দু’টি গাছের মধ্যে অন্তত ১৫ ফুট দূরত্ব দরকার। গাছ পুঁততে যে গর্তটি করতে হবে, তার ব্যাস হতে হবে অন্তত দেড় থেকে দু’ফুট। গর্তের গভীরতাও হবে অন্তত দু’ফুট। তা না হলে গাছের শিকড় মাটির গভীরে যেতে পারে না।’’
গাছ লাগানোর সময়ে এই নিয়ম মানা হয় কি? উদ্যান বিভাগের কর্তাদের দাবি, অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিয়ম মেনেই গাছ পোঁতা হয়। কিন্তু তার পরে রাস্তা ও ফুটপাথে খোঁড়াখুঁড়ি, ইঁদুরের উপদ্রব এবং পুরসভার অনুমতি ছাড়াই যথেচ্ছ ভাবে বৃক্ষরোপণের জেরে গাছের গোড়া আলগা হয়ে যায়। ঝড়ে গাছ উপড়ে পড়ার সেটাও একটা কারণ। মেয়র পারিষদ বলেন, ‘‘সব ফুটপাথে নজরদারি করার মতো পরিকাঠামো আমাদের নেই।’’ পুরকর্তাদের একাংশ বলছেন, গাছের চার পাশে মাটি দিয়ে কংক্রিটের রেলিং দেওয়া হলে পুরনো গাছের উপড়ে যাওয়া আটকানো সম্ভব। আগে তা-ই করা হতো। কিন্তু পরিবেশকর্মীদের আপত্তিতে এখন তা বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। প্রশাসনের একাংশ বলছেন, ওই গাছগুলি এতটাই বড় হয়ে গিয়েছে যে, সেগুলি তুলে অন্যত্র বসানোর মতো পরিকাঠামো বন দফতর বা পুরসভার নেই। এ বার যদি গাছ কাটতে যাওয়া হয়, তাতেও পরিবেশকর্মীরা আপত্তি করবেন।
পরিবেশকর্মী সুভাষ দত্ত অবশ্য বলছেন, গাছ না কেটেও তার পতন ঠেকানো সম্ভব। পরিবেশকর্মী বা সরকারি কর্তা, কারও কথাই গ্রাহ্য না করে এ ব্যাপারে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেওয়া উচিত। রেলিং প্রসঙ্গে তাঁর মন্তব্য, ‘‘আপত্তি করার ক্ষেত্রে পরিবেশকর্মীদেরও কখনও কখনও বাস্তবজ্ঞান প্রয়োগ করা দরকার।’’
পুর ও বন দফতর সূত্রের খবর, আয়লার পর থেকেই শহরে বনসৃজনের ধরনে পরিবর্তন এসেছে। কৃষ্ণচূড়া বা রাধাচূড়া গাছ আর লাগানো হয় না। বদলে ছাতিম, জারুল, নিম, বকুল লাগানো হচ্ছে। বন দফতরের এক কর্তা বলেন, ‘‘শহরে জারুল, নিম, বকুলের মতো গাছই লাগাতে বলা হয়। কারণ এগুলির শিকড় অনেক গভীরে যায়।’’