Advertisement
E-Paper

বদলেছে অনেক, তবু রয়ে গিয়েছে জীবনযাত্রার সারল্যটা

এখানে এখন আর ফাঁকা জমি নেই বললেই চলে। কিছু কিছু পুরনো বাড়ি ভেঙে তৈরি হচ্ছে বহুতল। আসলে বাড়তে থাকা জমি এবং বহুতলের দাম মধ্যবিত্ত বাঙালিদের নাগালের বাইরে।

অরুণকুমার চক্রবর্তী

শেষ আপডেট: ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ ০১:৩৯
ছবি: বিশ্বনাথ বণিক

ছবি: বিশ্বনাথ বণিক

পাশাপাশি মিলেমিশে সুখ-দুঃখে যেখানে থাকি, সেটাই তো পাড়া। যেখানে পা ফেলে রোজ বাড়ি থেকে বেরোই, আবার দিনের শেষে সেখানেই পা রেখে বাড়ি ফিরে আসি। পাড়া মানে ঠিক যেন এক পরম আত্মীয়। জীবনের সব পরিস্থিতির নেপথ্যে নীরব দর্শক সে। গত তিরিশ বছর এ পাড়ায় বসবাস। আমার জন্ম যদিও কাছেই অবিনাশচন্দ্র ব্যানার্জি লেনে। তাই ছেলেবেলার পাড়া বদলালেও অঞ্চলটা একই রয়েছে।

হেমচন্দ্র নস্কর রোডটি বেশ বড়। তার দু’দিকে অনেকগুলি পাড়া। সুভাষ সরোবর এবং বেলেঘাটা থানা সংলগ্ন অঞ্চলটাই আমার পাড়া। ফুলবাগান মোড় থেকে শুরু হয়ে রাস্তাটি মিশেছে বেলেঘাটা মেন রোডে। গাছ-গাছালিতে ভরা আমাদের পাড়াটি বেশ পরিচ্ছন্ন। ফুটপাথে রয়েছে বেঞ্চ। সেখানে সকালে সন্ধ্যায় কিংবা অবসরে পাড়ার মানুষ বসে গল্প করেন। আগে ভোর হতো পাখির ডাকে। এখন সকলটা শুরু হয় গাড়ির হর্নের আওয়াজে। ভোরেই স্বাস্থ্য সচেতন কিছু মানুষ বেরিয়ে পড়েন প্রাতর্ভ্রমণে। যার জন্য এলাকাবাসীর পছন্দের জায়গা সুভাষ সরোবর। সেখানে চলছে সংস্কার ও সৌন্দর্যায়নের কাজ। সবুজে ঘেরা এই সরোবরটি যেন এলাকার ফুসফুস।

কাছেই রয়েছে চিকিৎসকদের একটি ক্লাব। সেখানেই প্রতিদিন সকালে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বসে প্রভাতী আড্ডা। ক্লাবের আড্ডায় শুধু ডাক্তারেরা নন, যোগ দেন অন্য পেশার বিশিষ্ট মানুষও। তবে শুধু আড্ডা নয়, এই ক্লাবের উদ্যোগে সপ্তাহে দু’দিন দুঃস্থদের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসা ও ওষুধ বিতরণও করা হয়।

Advertisement

অন্যান্য পাড়ার মতো এখানেও মিলছে প্রয়োজনীয় নাগরিক পরিষেবা। জঞ্জাল সাফাই, রাস্তা পরিষ্কারের পাশাপাশি এলাকাটাকে পরিচ্ছন্ন রাখতে পাড়ার মানুষ সব সময়ে উৎসাহী। রাতেও ঝলমলে আলোয় চারদিক উজ্জ্বল থাকে। তবে কিছু সমস্যা তো থাকবেই। কাছেই বেলেঘাটা থানা। বাজেয়াপ্ত করা কিংবা দুর্ঘটনাগ্রস্ত অসংখ্য গাড়ি রাস্তার উপরে সার দিয়ে থাকে। এর জন্য অনেকেরই বাড়ির সামনে গাড়ি রাখতে সমস্যা হয়। আর বাড়তে থাকা গাড়ির সংখ্যার জন্য পার্কিং সমস্যা তো আছেই। ইদানীং বেড়েছে মশার উপদ্রবও।

এখানে এখন আর ফাঁকা জমি নেই বললেই চলে। কিছু কিছু পুরনো বাড়ি ভেঙে তৈরি হচ্ছে বহুতল। আসলে বাড়তে থাকা জমি এবং বহুতলের দাম মধ্যবিত্ত বাঙালিদের নাগালের বাইরে। তাই এই পাড়ায় নতুনেরা সকলেই অবাঙালি। পুরনো প্রতিবেশীদের মধ্যে অবশ্য ভালই যোগাযোগ আছে। এখনও হারিয়ে যায়নি উৎসব-অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রণ করার রীতিটা।

আগে এ পাড়ায় ভোর থেকে শুরু হত খেলাধুলা। কমেছে এ অঞ্চলের বিভিন্ন ক্রীড়া প্রতিযোগিতাও। কাছাকাছি রয়েছে ভলিবল, ক্রিকেট কোচিং ক্যাম্প। তবে পড়াশোনার চাপে ছোটদের খেলার প্রতি আগ্রহ দিনে দিনে কমছে। এখন শুধু রবিবার কিংবা ছুটির দিনে মাজেমধ্যে পাড়ার গলিতে ছোটদের খেলতে দেখা যায়।

পাড়ার কিছু ক্লাব সামাজিক কাজকর্মের সঙ্গে যুক্ত। প্রয়োজনে তারা মানুষের পাশে থাকে। তেমনই এ পাড়ার যুব সম্প্রদায়কে যে কোনও প্রয়োজনে পাশে পাওয়া যায়। পরিচিত হোক বা অপরিচিত, লোকবলের অভাবে কাউকে এখানে সমস্যায় পড়তে হয় না।

এ পাড়ার পুজো মানেই সন্ধানী এবং নব মিলনের পুজো। দুর্গাপুজোর ক’টা দিন এখনও সকলের সঙ্গে দেখা হয়। মাঝেমাঝে বসে আড্ডাও। এই ফাঁকে অনেক অপরিচিতও পরিচিত হয়ে যান। গড়ে ওঠে নতুন বন্ধুত্ব। কাছেই রাসমণি বাজার কিংবা জোড়ামন্দির বাজার। তবে পার্কিং সমস্যার জন্য গাড়ি রাখতে সমস্যা হয়। যদিও কাছেই বি সরকারের বাজারে পার্কিংয়ের সুবিধা থাকায় এখানেই বাজার করতে যাই।

ছোটবেলার পাড়াটা ছিল আকর্ষণীয়। কঠোর অনুশাসনের মাঝেও ছিল অনাবিল আনন্দ। সে সময়ে আশেপাশে অনেক বাগান ছিল। নিঝুম দুপুরে বন্ধুদের নিয়ে সেই সব বাগান দাপিয়ে বেড়িয়ে আম, জামরুল, পেয়ারা পাড়ার আনন্দ আজ কোথায়? সেই বাগানগুলো আজ
আর নেই। তখন এলাকাটা ছিল অনেক নিরিবিলি। সে সব দিন আজ স্মৃতি।

তবে এখানকার অতি সাধারণ জীবনযাত্রায় এখনও মিশে আছে আন্তরিকতা, ভালবাসা আর সারল্য। তাই এ পাড়াটাই এখনও আমার বাড়ি।

লেখক চিকিৎসক

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy