ফরেন্সিক তদন্ত প্রভাবিত হতে পারে, থেকে যেতে পারে পুলিশের প্রতি পক্ষপাতিত্ব। থাকছে না স্বাধীন সংস্থা হিসাবে কাজ করার পরিস্থিতিও। এই সমস্ত কারণ দেখিয়ে ‘রাজ্য ফরেন্সিক সায়েন্স ল্যাবরেটরি’ পুলিশি নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করার আর্জি জমা পড়ল কলকাতা হাই কোর্টে। একটি জনস্বার্থ মামলায় রাজ্য ফরেন্সিক সায়েন্স ল্যাবরেটরির অ্যাডমিনিস্ট্রেটর পদ বাতিল করার আবেদন জানানো হয়েছে। ২০১৪ সাল থেকে এই পদে এক জন আইপিএস অফিসারকে নিয়োগ করে স্বরাষ্ট্র দফতর।
মামলার আবেদনকারীদের দাবি, কোনও পুলিশকর্তা এই পদে থাকলে পুলিশের স্বার্থে ফরেন্সিক তদন্ত পরিচালিত হওয়ার ভয় থাকে। এর বদলে ফরেন্সিক সায়েন্স ল্যাবরেটরির মাথায় অধিকর্তা থাকা উচিত। যিনি হবেন কোনও গবেষক বা ফরেন্সিক বিজ্ঞানী। ২০১৪ সালের আগে তেমনটাই হত, দাবি করে জনস্বার্থ মামলার পক্ষে থাকা এক ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘‘অতীতে স্বরাষ্ট্র দফতরে বিষয়টি জানিয়েও লাভ হয়নি। এ বার তাই আদালতে যাওয়া হয়েছে।’’ কলকাতা হাই কোর্ট সূত্রের খবর, আগামী ১৮ জুন প্রধান বিচারপতির এজলাসে এই মামলার শুনানি হতে পারে।
সাম্প্রতিক অতীতে একাধিক বার প্রশ্নের মুখে পড়েছে রাজ্য ফরেন্সিক সায়েন্স ল্যাবরেটরির ভূমিকা। আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ভিতরে চিকিৎসক-পড়ুয়াকে খুন ও ধর্ষণের মতো ঘটনায় ফরেন্সিক নমুনা সংগ্রহের কাজে বিশেষজ্ঞের বদলে সিভিক ভলান্টিয়াদের পাঠানোর অভিযোগ উঠেছিল। যার জেরে আদালতে প্রশ্নের মুখে পড়েছিল ফরেন্সিক নমুনা সংগ্রহের পদ্ধতি। অভিযোগ উঠেছে, পরে পুলিশি তদন্তের সঙ্গে না-ও মিলতে পারে ভেবে অপরাধস্থল ঘুরে এসে ‘ক্রাইম সিন রিপোর্ট’ দেওয়ার প্রথাই তুলে দেওয়া হয়েছে। কখনও আবার অতি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাতেও দু’-তিন মাস পেরিয়ে গেলেও ফরেন্সিক নমুনা সংগ্রহ না করার অভিযোগ উঠেছে। পুলিশের পাঠানো ‘রিকুইজ়িশন’ কাগজের উপরে ‘নট নিডেড’ লিখেই ফেলে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ! ফলে আক্রান্তের পরিবার তো বটেই, সংশ্লিষ্ট থানাও জানতে পারেনি, কত দিন ঘটনাস্থল ঘিরে রাখতে হবে বা কবে মামলা আদালতে উঠবে! বাদ যায়নি নিয়োগ নিয়ে বিতর্কও। অভিযোগ, প্রয়োজনীয় যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও রাজ্য ফরেন্সিক সায়েন্স ল্যাবরেটরির অ্যাসিস্ট্যান্ট করা হয়েছে দু’জন ‘ডোম’ (পদের নাম)-কে। ল্যাব অ্যাটেন্ড্যান্টের কাজ পেয়েছেন দু’জন সাফাইকর্মী!
এই পরিস্থিতিতে জনস্বার্থ মামলাটিতে দাবি করা হয়েছে, পুলিশকর্তার অধীনে থাকায় ওই ল্যাবরেটরির বৈজ্ঞানিক নিরপেক্ষতা, প্রাতিষ্ঠানিক স্বশাসন এবং নিরপেক্ষ তদন্তের মৌলিক নীতিগুলি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। বৈজ্ঞানিক পরীক্ষাকারী সংস্থাকে তদন্তকারী সংস্থার অধীনস্থ রাখা হলে, স্বার্থের সংঘাত সৃষ্টি হয় এবং পক্ষপাতিত্বের আশঙ্কা স্বাভাবিক ভাবেই দেখা দেয়। বর্তমান সময়ে নানা মামলায় ফরেন্সিক তদন্তের উপরে বিচার ব্যবস্থার নির্ভরতা বাড়ছে দাবি করে জানানো হয়েছে, এই কারণেই ওড়িশার মতো বেশ কিছু রাজ্য পুলিশের নিয়ন্ত্রণ থেকে ফরেন্সিক তদন্তকে মুক্ত করেছে।
রাজ্য ফরেন্সিক সায়েন্স ল্যাবরেটরির অ্যাডমিনিস্ট্রেটর কে জয়রমন এ ব্যাপারে বলেন, ‘‘মামলার বিষয়টি শুনেছি। কিন্তু এ ব্যাপারে আমার কিছু বলার নেই।’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)