কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিমের পদত্যাগের জল্পনার মধ্যেই আরও একটি প্রশ্ন জোরালো হচ্ছে। তা হল, বর্তমান পুরবোর্ডের ভাঙনের আশঙ্কাও কি প্রবল? কলকাতা পুরসভার একাধিক বরো চেয়ারম্যান নিজেদের পদ থেকে ইস্তফা দেওয়ার পর থেকে এই আশঙ্কা আরও জোরদার হয়েছে।
যদিও পদত্যাগী ওই বরো চেয়ারম্যান এবং পুরপ্রতিনিধিরা এখনও শাসকদলের নির্বাচিত পুরপ্রতিনিধি হয়েই দৈনন্দিন প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করছেন। তবুও, আশঙ্কার রেশ পুরোপুরি কাটছে না। এই অনিশ্চয়তা কাটাতে মেয়রও স্পষ্ট উত্তর দিতে পারেননি। কলকাতা পুরবোর্ড কি আদৌ তার নির্ধারিত মেয়াদ সম্পূর্ণ করবে? ফিরহাদের উত্তর, ‘‘বলতে পারব না। এই বিষয়টা জানি না।’’
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, মেয়রের এই মন্তব্য বর্তমান প্রেক্ষাপটে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, তিনি শুধু মেয়রই নন। বিধানসভায় বিরোধী দলের তরফে তাঁকে মুখ্য সচেতকের (চিফ হুইপ) মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও অর্পণ করা হয়েছে। ফলে নিজের প্রতিটি বক্তব্যের গুরুত্ব সম্পর্কে তিনি জানেন, মত ওয়াকিবহাল মহলের। তাই ফিরহাদ যখন এই প্রাসঙ্গিক প্রশ্নের সরাসরি কোনও উত্তর না দিয়ে কিছুটা এড়িয়ে যাওয়ার ‘কৌশল’ অবলম্বন করেন, তখন তা কলকাতা পুরসভার অভ্যন্তরীণ জটিলতারই নির্দেশক।
কলকাতা পুরবোর্ডের শাসকদলের এক শীর্ষস্থানীয় পুরপ্রতিনিধি জানান, এই সঙ্কট কেবল কোনও পদ থেকে ইস্তফা দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। যাঁরা এত দিন দলের সামনের সারিতে থেকে মুখপাত্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতেন, তাঁরাই এখন প্রকাশ্যে দলবিরোধী মন্তব্য করছেন। ওই পুরপ্রতিনিধির মতে, ‘‘এর ফলে দলের ক্ষতি হচ্ছে।’’ শাসকদলের অপর এক পুরপ্রতিনিধি পুরসভার অভ্যন্তরীণ কোন্দল মেনে নিয়ে বলছেন, ‘‘দল একাধিক জায়গায় ভুল পদক্ষেপ করেছে, সন্দেহ নেই। কিন্তু কলকাতা পুরসভা এখনও তৃণমূলের অধীনে রয়েছে। ফলে সেখানে এই ধরনের অস্থিরতা তৈরি করে লাভ কী?’’
অন্য দিকে, শাসকদলের প্রতি ‘বিমুখ’ এবং ‘বিক্ষুব্ধ’ পুরপ্রতিনিধিদের বক্তব্য, কোনও পদ অথবা বরো চেয়ারম্যানের পদ থেকে ইস্তফা দেওয়া মানেই তৃণমূল ছাড়া বোঝায় না। এক বিক্ষুব্ধ পুরপ্রতিনিধির দাবি, পদত্যাগের কারণে নাগরিক পরিষেবা বা পুরপ্রতিনিধির দায়িত্ব পালনে খামতি হচ্ছে, এই ধারণা ভুল। আরও দাবি, তাঁরা প্রত্যেকেই নিজেদের প্রশাসনিক দায়িত্ব সম্পর্কে অবগত এবং ওয়ার্ডের বাসিন্দারা কোনও সমস্যায় পড়বেন, এমন কাজ তাঁরা কেউ করবেন না। উল্টে তাঁদের প্রশ্ন, দলের ভুল কাজের প্রতিবাদে কেউ যদি পদ থেকে ইস্তফা দেন, তাতে ভুল বার্তা যাবে কেন?
সব মিলিয়ে কলকাতা পুরসভার অন্দরে এখন এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতি। গোটা ঘটনাপ্রবাহ এবং পারস্পরিক দোষারোপের পালা পর্যবেক্ষণ করে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ প্রশ্ন তুলেছেন— বর্তমানের এই ধারাবাহিক ভাঙন এবং আস্থার সঙ্কট চলতে থাকলে আগামী পুর নির্বাচনে দলের হয়ে প্রার্থী করার মতো কাউকে আদৌ খুঁজে পাওয়া যাবে তো?
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)