E-Paper

ভাঁড় নেই, তাই মুখ ভার শহরের

শহর জুড়ে হঠাৎ কেন এই সঙ্কট? উত্তর মিলল উল্টোডাঙা ও তিলজলার ভাঁড়পট্টিতে। শহরের চায়ের দোকানগুলিতে ভাঁড় যায় মূলত এই সব এলাকা থেকেই। সেখানে দেখা গেল, কারিগরদের হাতে কাজ থাকলেও নেই পর্যাপ্ত কাঁচামাল।

হিন্দোল ভট্টাচার্য

শেষ আপডেট: ১৪ জুন ২০২৬ ০৮:৫৬
মাটি অমিল। (বাঁ দিকে) তিলজলা এলাকার কুমোরপাড়ায় ফাঁকা পড়ে আছে মাটি রাখার জায়গা।

মাটি অমিল। (বাঁ দিকে) তিলজলা এলাকার কুমোরপাড়ায় ফাঁকা পড়ে আছে মাটি রাখার জায়গা। ভাঁড়ের অভাবে কাঁকুড়গাছির এক দোকানে চা বিক্রি হচ্ছে কাগজের কাপেই (ডান দিকে)। ছবি: দেবস্মিতা ভট্টাচার্য।

“ভাঁড়ে চা দিন” বলতেই চাঁদনি চক বাজারের চায়ের দোকানি মহম্মদ আলতাব বললেন, “ভাঁড় নেই। কাগজের কাপ চলবে?” এ শহরের বহু দোকান এখন এই পথেই হাঁটতে বাধ্য হচ্ছে। কারণ, রাতারাতি মাটির ভাঁড় উধাও। বদলে জায়গা করে নিয়েছে কাগজের কিংবা প্লাস্টিকের কাপ।

কাঁকুড়গাছি মেন রোডের চায়ের দোকানদার শচীন গুপ্তেরও একই বক্তব‌্য। তাঁর কথায়, নিয়মিত ভাঁড় মিলছে না বলেই বিকল্প ব্যবস্থা রাখছি। পার্ক সার্কাসের একটি বেসরকারি স্কুলের সামনে চায়ের দোকানদার রতন দাসেরও দাবি, ভাঁড় না পাওয়ায় ব্যবসা ভাল যাচ্ছে না। কারণ, ভাঁড় ছাড়া অনেকেই চা খান না।

শহর জুড়ে হঠাৎ কেন এই সঙ্কট? উত্তর মিলল উল্টোডাঙা ও তিলজলার ভাঁড়পট্টিতে। শহরের চায়ের দোকানগুলিতে ভাঁড় যায় মূলত এই সব এলাকা থেকেই। সেখানে দেখা গেল, কারিগরদের হাতে কাজ থাকলেও নেই পর্যাপ্ত কাঁচামাল। অধিকাংশ কারখানায় এক বা দু’দিনের বেশি সরবরাহ করার মতো ভাঁড় মজুত নেই।

উল্টোডাঙা ভাঁড়পট্টির কারিগর কুন্দন প্রজাপতির প্রশ্ন, “মাটি না থাকলে ভাঁড় বানাব কী করে? যে মাটি দিয়ে ভাঁড় তৈরি হয়, সেটাই আসছে না।” একই সুর তিলজলা ভাঁড়পট্টির কারিগর ভূপেন্দ্র পণ্ডিতের গলায়। তিনি বলেন, “অর্ডার আছে, মাটি নেই। ফলে দোকানদারেরা ভাঁড় চাইলেও দিতে পারছি না। এ দিকে, বহু পরিবার এই কাজে নির্ভরশীল।” কারিগরদের দাবি, এত দিন ডায়মন্ড হারবার, ক্যানিং-সহ দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন এলাকা থেকে ভাঁড় তৈরির উপযোগী মাটি আসত। পুকুর খনন, জমি কাটা-সহ নানা উপায়ে সেই মাটি সংগ্রহ হত। সম্প্রতি প্রশাসনের কড়াকড়িতে মাটি সংগ্রহ কার্যত বন্ধ। মাটি কাটা ‘অবৈধ’ বলে চিহ্নিত করে তা বন্ধ করা হয়েছে। ফলে, কাঁচামালের জোগানে ধাক্কা লেগেছে।

এর প্রভাব পড়েছে গোটা শৃঙ্খলে। এক দিকে চায়ের দোকানদারেরা ভাঁড় পাচ্ছেন না, তাই অন্য ব্যবস্থা নিতে হচ্ছে। তাঁদের দাবি, আগে ভাঁড়-পিছু লাগত আট আনা থেকে এক টাকা। এখন দ্বিগুণ দামে বাইরে থেকে আনতে হচ্ছে। অন্য দিকে, ভাঁড়পট্টির শত শত শ্রমিক ও কারিগরের রুজিরুটিও সঙ্কটে। তাঁদের মতে, গঙ্গার মাটি নয়, এ কাজে এঁটেল মাটিই দরকার। যা ওই অঞ্চল থেকে বেশি পাওয়া যেত। মাটি নেই, তাই কাজ নেই।

পশ্চিমবঙ্গ মৃৎশিল্পী কল্যাণ সমিতির রাজ্য সভাপতি মোহনলাল প্রজাপতি জানান, মাটির সমস্যা নিয়ে প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। তাঁর কথায়, “জেলাশাসকের সঙ্গে কথা হয়েছে। লিজ়ের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত উপায়ে মাটি কাটার ব্যবস্থা হলে অন্তত দু’-তিন মাসের জন্য কাঁচামালের জোগান নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। দ্রুত সমাধানের আশায় রয়েছি।” তবে দক্ষিণ ২৪ পরগনার অতিরিক্ত জেলাশাসক (ভূমি অধিগ্রহণ) মঞ্জিতকুমার যাদবের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে এ নিয়ে তিনি কোনও মন্তব্য করতে চাননি।

কাঁকুড়গাছির বাসিন্দা, চা-প্রেমী বিমল দাসের মতে, ভাঁড়ে চা খাওয়া স্বাস্থ্যের পক্ষে ভাল। প্লাস্টিক বা অন্য কিছুর কাপ পরিবেশের পক্ষেও ভাল নয়।’’ দক্ষিণ কলকাতার বাসিন্দা কুহেলি মণ্ডলের মতে, ‘‘ভাঁড়ে চা খাওয়ার আলাদাই অনুভূতি।’’ ক্রেতা থেকে বিক্রেতা— শহর জুড়ে একটাই দাবি, চায়ের দোকানগুলিতে দ্রুত ভাঁড় ফিরে আসুক।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Tea shop soil Earthen Pot

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy