দু’-চার দিনের শীত-আমেজের স্বাদ কেমন? কখনও বিলিতি টার্কি, কখনও আওয়াধি কোরমার মতো? নাকি ইতালীয় জেলাতোয় খানিকটা নলেন টপিংয়ের ফিউশন সোয়াদ?
কনকনে বাতাসে ফিরে আসা কলোনিয়াল হ্যাংওভার, কলকাতার বাঙালির কাছে নতুন নয়। শহুরেদের সচেতনতা বেড়ে আবার তার সঙ্গেই পাল্লা দিচ্ছে দেশ প্রীতিও। ছুটির মরসুমে শহর জুড়ে তাই জবরদস্ত হইচই। কখনও টেবিল সাজছে পশ্চিমের ট্র্যাডিশনাল টফি ব্র্যান্ডি সস্ সহযোগে ক্রিসমাস পুডিংয়ে তো কোথাও গোস্ত নিজামিই জমিয়ে তুলছে শীত-সন্ধ্যা। কল্লোলিনী কলকাতা বছর শুরুর ভুরিভোজে পছন্দ যে এক্কেবারে কসমোপলিটন!
মাছ-ভাতে বাঙালিকে সাহেবিয়ানার পাঠ দিয়ে এক কালে নাম করেছিল শহরের বহু বড়সড় হোটেল-রেস্তোরাঁ। পশ্চিমী পোশাক, পশ্চিমী মিউজিক আর বিলিতি খানা। সব মিলিয়ে কয়েক ঘণ্টার ‘ফরেন ট্রিপ’। টেবিল এটিকেটের পাঠও সে সব সাহেবি খানা-পিনার ঠিকানাতেই। বাতাসের তাপমাত্রা নামতে থাকলেই সে সব অভ্যাস এখনও হাতছানি দেয় শহর জুড়ে। বছর শুরুর সকালটায় ফ্লুরিজের ইংলিশ ব্রেকফাস্ট তো এখন রীতিমতো রেওয়াজ।
বছরের শুরুতে রুটিন সাহেবিয়ানার সেই ইচ্ছেটাই আরও উস্কে দিতে ব্যস্ত এখন আরও অনেক রেস্তোরাঁ। পাঁচতারা হোটেলই হোক বা কন্টিনেন্টাল খানা সহযোগে আড্ডার ছোট্ট নতুন ঠেক। অন্য রকম স্বাদের খোঁজ দিতে তৎপর সকলেই। বাঙালি এখন যখন-তখন ইউরোপ যায় যে, পরিষেবায় আরও সুক্ষ্মতা তো আনতেই হবে!
স্টেক-রিসোতো-পিৎজার সম্ভার নিয়ে কোমর বেঁধেছে কাফে মেজুনার শেফও। সেখানে বাকি বিশ্বের ফেসটিভ-মুডের সঙ্গে তাল মিলিয়ে টার্কি রোস্ট আর পর্ক চপ চেখেও উৎসবে মাতছেন আম বাঙালি। ক্রেপ-র্যাপে মন দিতে বালিগঞ্জের কাফে প্রাণাও আহ্বান জানাচ্ছে সাহেবি ভোজ-বিলাসে। সেখানকার স্ট্রবেরি উৎসব সেজেছে স্ট্রবেরি অ্যান্ড হানি ক্রেপ, স্ট্রবেরি-চিকেন স্যালাডের মতো নানা কম চেনা রেসিপিতে। পার্ক সার্কাসের ঝাঁ চকচকে শপিং মলের উপরে কেতাদুরস্ত সেরাফিনায় আবার বিশেষ আকর্ষণ বেকড্ সোকড্ ফ্রুট চিজ কেক। মেন কোর্সে থাকছে ইতালির উত্তর প্রান্তের হেঁশেল থেকে বাছাই করা কিছু চমক।
কিছু বছর আগেও শহুরে শীত উদ্যাপনে এগিয়ে ছিল কোট-টাই-স্টেক-পুডিংয়ের সন্ধ্যা। পিছনে হাল্কা করে লাইভ গ্র্যান্ড পিয়ানো। গ্লোবাল বাঙালি এখন আরও সচেতন আপন আহার-সংস্কৃতি নিয়ে। ঝাঁ চকচকে শীত-পার্টিতেও তাই এখন আর পিছিয়ে থাকে না মোচার চপ, পায়েস বা বিরিয়ানি। ওহ্! ক্যালকাটা তাই তেমন পছন্দকে প্রশ্রয় দিতে সাজিয়ে তুলেছে মরসুমি মেনু। বছরের প্রথম দিনটায় সেখানে গিয়ে চেখে দেখা যায় নবাবী দম বিরিয়ানি, চট্টগ্রামের মশলা মুরগি।
তেল-ঝালের উষ্ণতায় শীত উদ্যাপনে নবাবী আবহ সাজিয়ে তৈরি হোটেল হিন্দুস্থান ইন্টারন্যাশনালও। নতুন বছরকে বাদশাহি কায়দায় আহ্বান জানাতে সেখানে পার্টি হতে পারে গোস্ত বড়ড়া চাপ, দম কি সব্জিতে। সঙ্গে রইল লাইভ গজল। বর্ষবরণে একটু অন্য ছোঁয়া দিতে যাওয়া যায় তাজ বেঙ্গলের বিভিন্ন রেস্তোরাঁয়। মিশর, ইরান, মরক্কো, লেবানন— নানা দেশের নবাবী চমকে জমে উঠতে পারে নিউ ইয়ার্স পার্টি।
কোনও উৎসবেই চিনা চমক ছাড়া মন মজে না যে সকল কলকাতাবাসীর, তাঁদের জন্যও রয়েছে বন্দোবস্ত। মেনল্যান্ড চায়নায় বুফে সেজেছে লুং ফুং চিকেন সুপ, জিয়াংস্ চিলি পোটেটোস, চিলি ওয়েস্টার প্রন, প্লাম কেকের মতো অচেনা আশ্বাসে। চাউম্যানে চিনা স্বাদের পার্টি জমতে পারে আবার সুই মাই, সেজওয়ান অরেঞ্জ রোস্টেড পর্কে।
আর নতুন বছরের মিষ্টিমুখ? তাতেও তো থাকতে হবে চমক। সময়ের চাহিদা খেয়াল রেখে মামা মিয়া-র শো কেস সাজছে রেড ভেলভেট কেক, ক্যারট কেক, বাটারস্কচ ব্রাউনিতে। নিউ ইয়ার আর পৌষ পার্বণের আনন্দে একই সঙ্গে মাতিয়ে তুলতে রয়েছে বিশেষ স্বাদের চমকও— নলেন গুড় জেলাতো!