আরজি কর মেডিক্যাল কলেজে ধর্ষণ ও খুন হওয়া চিকিৎসক-পড়ুয়ার মা-কে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির প্রার্থী করা হয়েছে। যে এলাকায় আরজি করের নির্যাতিতা থাকতেন, সেই পানিহাটি থেকেই তিনি নির্বাচনে লড়বেন। এ বার সেই সংক্রান্ত সংগঠনের কিছু ধারণা পরিষ্কার করল ওয়েস্ট বেঙ্গল জুনিয়র ডক্টরস ফ্রন্ট। তাঁরা সমাজমাধ্যমে একটি বিবৃতি দিয়েছে।
ওই বিবৃতিতে বলা আছে, ‘২০২৪ সালের ৬ই অগস্টের ওই ঘটনার পর ১৯ মাস পেরিয়ে এসে নির্যাতিতা আবার সংবাদ শিরোনামে। আবার রাজনৈতিক তরজার কেন্দ্রে আরজি করের নারকীয় খুন, ধর্ষণ। তার পর রাজ্য পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় সংস্থার তদন্তের গাফিলতির অভিযোগ। তরজার উপলক্ষ পানিহাটি কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থী হিসাবে নির্যাতিতার মায়ের আত্মপ্রকাশ। এর পর থেকেই আমাদের সংগঠনগত ভাবে এবং সংগঠনের বহু সদস্যদের ব্যক্তিগত ভাবে অসংখ্য প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছে। প্রধান প্রশ্ন হচ্ছে, এই বিষয়ে আমাদের অবস্থান কী?’
সংগঠনের তরফে জানানো হয়েছে, কে কোন রাজনৈতিক দলের হয়ে ভোটে দাঁড়াবেন, সেটি একান্তই তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। এই নিয়ে সংগঠনের সমর্থন বা আপত্তি, কোনও কিছুই থাকার কথা নয়, উচিতও নয়। যাঁরা মনে করছেন যে এই পদক্ষেপের ফলে আন্দোলনের অবমাননা হচ্ছে, তাঁরা আগে প্রশ্ন তুলুক, এই নিষ্ঠুর ব্যবস্থার বিরুদ্ধে। সেই ব্যবস্থাই কি দায়ী নয়, যে ব্যবস্থা একজন সন্তানহীনা মাকে এই অনুভূতিতে পৌঁছে দিয়েছে যে, ক্ষমতার অলিন্দে না গেলে ন্যায়বিচার পাওয়া যায় না।
সংগঠনের দাবি, এই আন্দোলন ছিল মানুষের তীব্র ক্ষোভের স্বতঃস্ফূর্ত বিস্ফোরণ। মানুষ নির্যাতিতার বিচার চাইতে যেমন পথে নেমেছিলেন, তেমনই নিজের ঘরের মেয়েদের নিরাপত্তার কথা ভেবেও আন্দোলনে শামিল হয়েছিলেন।
‘সংগঠনের রাজনৈতিক অবস্থানের কারণেই, নির্যাতিতার মা যে কোনও রাজনৈতিক দলের হয়ে নির্বাচন লড়ার সিদ্ধান্ত নিলে, তাঁকে সমর্থন করার কোনও সুযোগ নেই। সেটি বিজেপি হোক, সিপিএম হোক, এসইউসিআই হোক বা কংগ্রোস হোক। তবে এটাও সত্যি, তিনি রাজ্যের প্রধান নির্বাচনী বিরোধীশক্তি হিসাবে একটি দলকে বেছে নিয়েছেন। শাসকদলকে ক্ষমতা থেকে উপড়ে ফেলার লক্ষ্যে, সেখানে অংশগ্রহণ করে তিনি বিচার ছিনিয়ে আনবেন বলে ভাবছেন। কিন্তু সেই দল অন্যান্য বহু রাজ্যে বর্তমানে ক্ষমতায় এবং সেই রাজ্যগুলোতে বিভেদকামী রাজনীতির উদাহরণ বাদ রাখলেও, কেবল নারী নির্যাতনের সাপেক্ষে রেকর্ড ও তাদের ভূমিকা ভয়ানক।’
আরও পড়ুন:
‘তারা এমন একটি দলের হয়ে দাঁড়াচ্ছেন, যেখানে বহু প্রভাবশালী নেতা নারী নির্যাতনের ঘটনায় সরাসরি যুক্ত থেকেও ক্ষমতার বলে দমন পীড়ন চালিয়েছে একাধিক নির্যাতিতা ও তাঁর পরিবারদের উপর। সেই দল শর্তসাপেক্ষে ন্যায়বিচার এনে দেবে এই ধারণা ‘সোনার পাথরবাটি’ ছাড়া কিছু নয়। কিন্তু এই কঠিন বাস্তবতাও স্বীকার করতে হয় যে একজন সন্তানহীনা মা কতটা অসহায় অবস্থায় থাকলে নিজেকে রাজনৈতিক ভাবে ব্যবহৃত হতে দেন, সেটি তাঁর জায়গায় না থাকলে বোঝা অসম্ভব। তাই যারা সমাজমাধ্যমে তাঁকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করছেন, তাঁদের কাছে আবেদন যে অন্তত তাঁর অসহায়তার অনুভূতিটুকু মনে রাখুন।’
কিন্তু, সংগঠনের মতে, নির্যাতিতার মা-বাবার বক্তব্য ‘আন্দোলনকারীরা সবাই নিজের স্বার্থে আন্দোলন করেছে’- এটি গভীরভাবে আহত করেছে। বিবৃতিতে লেখা আছে, ‘রাজনৈতিক দলগুলির কথা জানা নেই, সংগঠনের অবস্থান বলতে পারি। এই আন্দোলনে আমরা যাঁদের আমাদের প্রতিনিধি বলে মনে করি, যাঁরা টানা বৃষ্টি ভিজে রাত জেগে রাস্তায় ছিলেন, তাঁরা কেউই ক্ষমতা বা নির্বাচনী ‘স্বার্থের’ জন্য নয়, বরং ন্যায়বিচারের দাবিতে পথে নেমেছিলেন। তাঁদের লক্ষ্য ছিল এই অপরাধের পিছনে যে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিবেশ কাজ করেছে তা সামনে আনা এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে প্রয়োজনীয় কাঠামোগত পরিবর্তন দাবি করা।