রাজ্যের বিরোধী দলনেতা কে হবেন, সেই সিদ্ধান্ত নেবে তৃণমূল। দলের প্রতীকে জয়ী কয়েক জন বিধায়ক সেই সিদ্ধান্ত নেবেন না। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে রাজ্যের বিরোধী দলনেতা করার সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে হাই কোর্টে যে মামলা হয়েছিল, তাতে সওয়াল করে এ কথাই জানালেন মামলাকারী শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের আইনজীবী তথা সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি এ-ও জানান, ঋতব্রতকে যে বিরোধী দলনেতা ঘোষণা করা হয়েছে, তা নিয়ে কোনও পাবলিক নোটিস (বিজ্ঞপ্তি) দেওয়া হয়নি। এই মামলার পরবর্তী শুনানি আগামী মঙ্গলবার।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মনোনীত তৃণমূল পরিষদীয় নেতা শোভনদেব মামলাটি করতে চেয়ে আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। মামলায় যুক্ত রয়েছেন মমতা, এন্টালির বিধায়ক সন্দীপন সাহা এবং ঋতব্রত নিজেও। বৃহস্পতিবার শুনানিতে কল্যাণের সওয়াল, ঋতব্রতকে বিরোধী দলনেতা করা নিয়ে কোনও পাবলিক নোটিস দেওয়া হয়নি। প্রকাশ্যে কিছু জানানো হয়নি।
এর পরে কল্যাণের সওয়াল, গত ৬ মে বৈঠক ডেকে রেজ়োলিউশন করে তৃণমূল। তার ভিত্তিতে ১৯ মে সই করা হয়। ৭০ জন বিধায়ক তাতে সই করেন। ৬ মে যখন রেজ়োলিউশন করা হয়, সে দিন শোভনদেবকে বিরোধী দলনেতা করার কেউ বিরোধিতা করেননি। ২৮ মে স্পিকারের কাছে রেজ়োলিউশন পাঠানো হয়। ১ জুন ঋতব্রত, সন্দীপনকে বহিষ্কার করে তৃণমূল। ৩ জুন তাঁরা স্পিকারকে জানান, রেজ়োলিউশনে সই জাল করা হয়েছে।
শোভনদেবের আইনজীবীর বক্তব্য, এটা ঠিক বিরোধী দলনেতা বাছাই নিয়ে নির্দিষ্ট কোনও আইন নেই। তবে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার অতীত বলছে, এর আগে প্রতিবারই বিরোধী রাজনৈতিক দলের সুপারিশ অনুযায়ী বিরোধী দলনেতা নিযুক্ত হয়েছেন। রাজনৈতিক দল এবং পরিষদীয় দলের মধ্যে তফাৎ রয়েছে। নির্বাচিত সব সদস্যই নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের। রাজনৈতিক দলের গুরুত্ব না থাকলে পরিষদীয় দলের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। কারণ, সে ক্ষেত্রে পরিষদীয় দল কার নির্দেশ মেনে কাজ করবে?
কল্যাণের সওয়াল, একটি রাজনৈতিক দলের মতাদর্শ, চিন্তাধারা, ভাবনা থাকে। তারা বিধানসভায় পরিষদীয় দলকে কাজে লাগিয়ে বিরোধী ভূমিকা পালন করে। রাজনৈতিক দলকে অস্বীকার করলে বিধানসভায় পরিষদীয় দল কার নির্দেশ মেনে কাজ করবে? ফলে রাজনৈতিক দল ঠিক করে সেই দলের বিরোধী দলনেতা কে হবেন। কখনই পরিষদীয় দল ঠিক করে না। কয়েক জন বিদ্রোহী বিধায়ক ওই সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। তাঁরা যদি অন্য কোনও দলে যুক্ত হন তখন সম্ভব হবে। সে ক্ষেত্রে অবশ্য দলত্যাগ বিরোধী আইন কার্যকর হবে কি না সেটাও দেখার। অর্থাৎ, বিরোধী দলনেতা কে হবেন তা বিরোধী দলই ঠিক করবে। কখনই বিক্ষুব্ধরা নন।
গণতান্ত্রিক উপায়ে ভোট হয়। যারা জয়ী হয়, তারাও রাজনৈতিক দল। বিরোধী যারা হয়, তারাও রাজনৈতিক দল। নির্বাচিতেরা রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি। তৃণমূল যে সিদ্ধান্ত নেবে, সেটাই হবে। তারাই স্থির করবে, কে হবেন রাজ্যের বিরোধী দলনেতা। বিধায়কদের একাংশ ঠিক করতে পারেন না, কে বিরোধী দলনেতা হবেন। বিরোধী দলনেতা রাজনৈতিক দলের চিন্তাধারা মেনে চলবেন। দলের ইস্যু তুলে ধরবেন। তৃণমূল ৮০টি আসন পেয়েছে। মানুষ তাদের বিরোধী দলের আসনে বসিয়েছে। সেই দলের চেয়ারপার্সন মমতা স্থির করবেন, কে হবেন বিরোধী দলনেতা। যাঁরা জয়ী, তাঁরা সিদ্ধান্ত নেবেন না।
বিচারপতি কৃষ্ণ রাওয়ের প্রশ্ন, যদি নির্দল বিধায়কদের সংখ্যা বেশি হয় সে ক্ষেত্রে বিরোধী দলনেতা কী ভাবে বাছাই হবে? সে ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলের ধারণা কী ভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে? তার জবাবে কল্যাণের সওয়াল, সে রকম পরিস্থিতিতে স্পিকার ঠিক করবেন, কে হবেন রাজ্যের বিরোধী দলনেতা। সেই সিদ্ধান্ত তিনি নেবেন। পশ্চিমবঙ্গে বিরোধী দলনেতার মর্যাদা পেতে গেলে ৩০টি আসন পেতে হয় সেই দলকে। ২০০৬ সালে ২৯টি আসন পেয়েছিল তৃণমূল। তখন রাজ্যে বিরোধী দল হলেও তৃণমূলের থেকে কেউ বিরোধী দলনেতার মর্যাদা পাননি। পরে উপনির্বাচনে জিতলে তৃণমূলের আসনসংখ্যা হয় ৩০টি। তার পরে পার্থ চট্টোপাধ্যায় বিরোধী দলনেতা হন।
কল্যাণের আরও সওয়াল, রথীন্দ্র বসু স্পিকার হিসাবে শপথগ্রহণের পরে ‘স্বাগত ভাষণ’ দেন। সে সময় মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শুভেন্দুকে বলতে দেওয়া হয়। বিরোধী দলনেতা হিসাবে সে সময় শোভনদেবকে ভাষণ দিতে দেওয়া হয়েছিল বিধানসভায়। সে দিন শুভেন্দু এবং শোভনদেব প্রোটোকল মেনে এক সঙ্গে রথীন্দ্রকে স্পিকারের আসনে বসিয়েছিলেন। তখন কিন্তু ঋতব্রতকে সেই দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। কল্যাণের প্রশ্ন, তা হলে আজ কেন তাঁকে বিরোধী দলনেতার মর্যাদা দিয়ে বিধানসভায় ঘর দেওয়া হল? তাঁর সওয়াল, সংবিধানের কাঠামো এই যে, বিরোধী দল বিরোধী দলনেতাকে বেছে নেবে। মানুষের রায় বদলানো যায় না। তাই ঋতব্রতকে বিরোধী দলনেতার পদ দিয়ে স্পিকার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তার উপরে অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ দেওয়া হোক। অবিলম্বে তা না দিলে ১৮ জুন থেকে অধিবেশন শুরু হচ্ছে বিধানসভায়। সেখানে আসন বণ্টন করা শুরু হবে। তাই স্পিকারের সিদ্ধান্তে এখনই অন্তবর্তী স্থগিতাদেশ দেওয়া প্রয়োজন। তাঁর আরও বক্তব্য, ঋতব্রতকে দল বহিষ্কার করেছে, তার পরেও তাঁকে বিরোধী দলনেতা করা হয়েছে।
আরও পড়ুন:
-
‘হোমমেকার নয়, দেশের নির্মাতা বলা উচিত’! গৃহিণীরা মাসে ৩০ হাজার টাকা বেতনের দাবিদার, পর্যবেক্ষণ সুপ্রিম কোর্টের
-
ঋতব্রতের বিরোধী দলনেতা পদপ্রাপ্তি চ্যালেঞ্জ করে হাই কোর্টে মামলা দায়ের শোভনদেবের, শুনানি বৃহস্পতিবার
-
‘ওর জন্য চোর স্লোগান শুনতে হচ্ছে! মমতাদিকে বাছতে হবে আমি, না অভিষেক?’ অপমানে রুষ্ট কল্যাণের চরমবার্তা দিদিকে
শোভনদেবের আইনজীবী বৃহস্পতিবার সওয়াল শেষ করেন। আগামী মঙ্গলবার পরবর্তী শুনানি। ওই দিন স্পিকারের পক্ষ থেকে বক্তব্য জানানো হবে।বিচারপতির প্রশ্ন, বিরোধী দলনেতা নিয়োগ করার পরেও তা নিয়ে পাবলিক ডোমেনে নোটিস নেই কেন। এ প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণের কথাও মনে করিয়ে দিয়েছেন বিচারপতি। সুপ্রিম কোর্ট বলেছিল, রাজনৈতিক এবং পরিষদীয় দল আলাদা। পরিষদীয় দল স্থির করে না, কে হবেন বিরোধী দলনেতা।
বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় সাংবিধানিক বৈধতা লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে আদালতের হস্তক্ষেপ চেয়েছিলেন শোভনদেব। তাঁর আইনজীবীর বক্তব্য, বিরোধী দলনেতা নির্বাচনে স্পিকারের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে।
বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের ভরাডুবির ঠিক এক মাসের মাথায়, আনুষ্ঠানিক ভাবে ভাঙন ধরেছিল তৃণমূলে। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা হন তৃণমূল থেকে বহিষ্কৃত ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। ‘বিদ্রোহী’ শিবিরের তিন সহকারী দলনেতার তালিকায় ঠাঁই পান আর এক বিদ্রোহী সন্দীপন। তৃণমূল বিধায়কদের ‘সই-জালিয়াতি’র কথা স্পিকারকে লিখিত ভাবে জানানোর ‘অপরাধে’ তাঁদের বহিষ্কার করেছিল মমতার দল। কিন্তু ৪৮ ঘণ্টা পরেই দেখা যায়, সংখ্যাগরিষ্ঠ তৃণমূল বিধায়কের সমর্থনই রয়েছে ঋতব্রত-সন্দীপনদের দিকে।