ভাঙবেড়া সেতুর ও পারে নন্দীগ্রাম, আর এ পারে খেজুরি। নীচ তালপাটি খাল, যা ২০০৭ সালে নন্দীগ্রামে জমি আন্দোলন পর্বের বহু ঘটনার সাক্ষী। এর পর জল অনেক গড়িয়েছে। বোমা-বন্দুকের আওয়াজ আর তেমন শোনা যায় না। তবে, পালাবদলের দেড় দশক বাদেও উন্নয়নের স্বাদ থেকে এলাকাবাসী বঞ্চিত বলে অনেকেরই অভিযোগ।
মহকুমা সদর কাঁথির সঙ্গে খেজুরির যোগাযোগের সমস্যা দীর্ঘদিনের। মাঝে রসুলপুর নদী পেরিয়ে নিয়মিত যাতায়াত করেন ক’য়েক হাজার মানুষ। রসুলপুর নদীর উপর সেতু নির্মাণের দাবি বহুদিনের। সেতু নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তৃণমূল থেকে বিজেপি নেতা—সব নেতারাই। বিধানসভা ভোটের আগে রসুলপুর নদীর উপর সেতু নির্মাণের দাবি জোরালো হয়েছে।
প্রসঙ্গত, ২০০৬ সালে নন্দীগ্রামে জমি আন্দোলন শুরু হওয়ার পর থেকে বারবার খবরের শিরোনামে এসেছে খেজুরি। একদা 'লাল দুর্গ' খেজুরি থেকে সিপিএম এখন অনেকটাই মুছে গিয়েছে। ২০১১ সালে বদলের স্লোগান দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল তৃণমূল। রাস্তাঘাট ঝাঁ চকচকে হয়েছে। পানীয় জল। বিদ্যুৎ ব্যবস্থা উন্নত হয়েছে। কিন্তু শাসকের দুর্নীতি আর অত্যাচার বাড়তেই সিপিএমের কর্মীদের অনেকে যোগ দিয়েছেন বিজেপিতে। তৃণমূলের একাংশও বিজেপিতে চলে গিয়েছে।
২০২১ সালে তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেন শুভেন্দু অধিকারী। তারপরই খেজুরির রাজনীতির ছবিটা পুরোপুরি বদলে যায়। উত্থান ঘটে গেরুয়া শক্তির। বিধায়ক নির্বাচিত হন বিজেপির শান্তনু প্রামাণিক। ধীরে ধীরে জনবিচ্ছিন্ন হতে শুরু করে তৃণমূল। ২০২৪ সালে লোকসভা নির্বাচনে খেজুরি বিধানসভায় এগিয়ে ছিলেন বিজেপি সাংসদ সৌমেন্দু অধিকারী। ২০২৩ সালে ত্রিস্তর পঞ্চায়েত নির্বাচনেও দাপট দেখায় পদ্ম শিবির।
খেজুরি-১ ব্লকের ছ’টি, খেজুরি-২ ব্লকের পাঁচটি পঞ্চায়েত, ভগবানপুর-২ ব্লকের দু’টি গ্রাম পঞ্চায়েত নিয়ে খেজুরি বিধানসভা। এর মধ্যে ৮টি গ্রাম পঞ্চায়েত তৃণমূলের দখলে রয়েছে আর বাকি পাঁচটি রয়েছে বিজেপির দখলে। এ বার বিদায়ী বিধায়ক শান্তনুকে খেজুরি পরিবর্তে ভগবানপুরে প্রার্থী করেছে বিজেপি। খেজুরিতে বিজেপির প্রার্থী হয়েছেন এলাকার জেলা পরিষদ সদস্য সুব্রত পাইক। এক সময় বাম রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হলেও গত পঞ্চায়েত নির্বাচনে এলাকার প্রাক্তন বিধায়ক তথা তৃণমূলের দাপুটে নেতা রণজিৎ মণ্ডলকে পরাজিত করেছিলেন তিনি।
তবে, সুব্রতকে নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে এলাকার বিজেপি নেতা-কর্মীদের মধ্যে। আবার খেজুরিতে দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূলের ছন্নছাড়া দশা। খাতায়-কলমে ভূমিপুত্র হলেও 'বহিরাগত' রবীনচন্দ্র মণ্ডলকে প্রার্থী করেছে তৃণমূল। তিনি ভগবানপুর -১ ব্লকের তৃণমূল সভাপতি। দলের কর্মীদের নিয়ে তিনি জনসংযোগে নেমে পড়েছেন। রবীন বলছেন,"এ বার খেজুরির মাটিতে ঘাসফুলের দাপট ফিরবেই।" পাল্টা সুব্রত পাইক দাবি করেছেন, ‘‘খেজুরিতে পদ্মই ফুটবে। তৃণমূল ফাঁকা আওয়াজ করছে।’’
বিদায়ী বিধায়ক বিজেপির শান্তনুর কথায়, ‘‘বিধায়কের তহবিলের টাকায় সাধ্যমতো উন্নয়নের চেষ্টা করেছি।’’ সিপিএম প্রার্থী হিমাংশু দাস বলছেন, ‘‘আমরা ক্ষমতায় থাকাকালীন যে কাজগুলি শুরু করেছিলাম, তার অনেকগুলি এরা শেষ করতে পারেনি।।’’ এলাকাবাসী অবশ্য রাজনীতি নয়, উন্নয়ন চাইছেন। হলদিয়া উন্নয়ন পর্ষদের এলাকাভুক্ত হওয়া সত্ত্বেও খেজুরি এখনও হলদিয়ার থেকে সব দিক থেকেই পিছিয়ে। উন্নয়ন নিয়ে বঞ্চনার অভিযোগ রয়েছে অজস্র। সাধারণ মানুষের আক্ষেপ, ‘‘এখানে ভোট হয় রাজনীতির রং দেখে। যে পার্টির বাহুবলী বেশি, তারাই ভোট বেশি পায়।’’ এ বার সেই নিয়ম জনসাধারণের রায়ে পাল্টাতে পারে কিনা, সেটা বলবে ভোটের ফলাফল।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)