E-Paper

‘দলবদলু’ তকমা ঝেড়ে রাজীব মরিয়া ‘ঘরের লোক’ হতে

পরিসংখ্যান বলছে, ২০২১ সালে তৃণমূল ভোট পেয়েছিল ৪৬.৭৯ শতাংশ। বিজেপি ৪১.৩১ শতাংশ। ১১,২২৬ ভোটে জিতেছিল তৃণমূল।

শান্তনু ঘোষ

শেষ আপডেট: ০৯ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:১৫
রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়।

রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়। ফাইল চিত্র।

‘দলবদলু’ তকমা কি আর মুছতে পারবেন? তা নিয়ে আফশোস থাকলেও, ভুলে থাকতে চান ঘরবদলের ১০ মাস। বরং ডোমজুড়ে ‘ঘরের লোক’ হয়ে ওঠার স্মৃতি উস্কে দিয়ে পশ্চিম মেদিনীপুরের ডেবরার ময়দানে নেমেছেন জোড়াফুলের রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়। আর তাঁর এই দলবদলের কাঁটাকেই লড়াইয়ের প্রচারে হাতিয়ার করছেন বিরোধীরা।

প্রায় ৩৪৩ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে ডেবরা বিধানসভা। কৃষিপ্রবণ এই এলাকার মাটি রাজীবের পুরোপুরি চেনা নয়। তাই নিরাপদ অঞ্চল চিনে নেওয়ার পাশাপাশি, ডেবরার গোষ্ঠী-দ্বন্দ্বের কাঁটাও খুঁজে নিতে হচ্ছে। সেই সমস্ত এলাকায় কার্যত বাড়ি বাড়ি ঢুকে ক্ষোভ প্রশমনের মরিয়া চেষ্টা চালাতে হচ্ছে প্রাক্তন মন্ত্রীকে। রাজনৈতিক মহলের পর্যবেক্ষণ, গোষ্ঠী-দ্বন্দ্বের কারণেই গত লোকসভা ভোটে ডেবরার ২৬৫টি বুথের মধ্যে ১১০টিতে হেরেছিল তৃণমূল।

পরিসংখ্যান বলছে, ২০২১ সালে তৃণমূল ভোট পেয়েছিল ৪৬.৭৯ শতাংশ। বিজেপি ৪১.৩১ শতাংশ। ১১,২২৬ ভোটে জিতেছিল তৃণমূল। ২০২৪-এর লোকসভা ভোটে ডেবরায় তৃণমূলের প্রাপ্ত ভোট প্রায় ছিল ২০২১-এর মতোই—৪৬.৬২ শতাংশ। সেখানে বিজেপির ভোট বিধানসভার থেকে বেড়ে হয়েছিল ৪৩.৫৮ শতাংশ। তাতে মাত্র ৫,৭৬৬ ভোটে এগিয়ে ছিল তৃণমূল। অর্থাৎ তিন বছরে গোষ্ঠী-কাঁটার খোঁচা যে ভাল রকমের বেগ দিয়েছে, তা দেখাই যাচ্ছে। সেখানে রাজীব বলছেন, ‘‘আশা করছি, পিছিয়ে থাকা বুথের সংখ্যা ৪০-৫০ শতাংশ কমাতে পারব।’’

প্রধান প্রতিপক্ষ বিজেপি প্রার্থী শুভাশিস ওম বলছেন, ‘‘উনি একজন ব্যর্থ নেতা। তৃণমূলে ফিরে ত্রিপুরায় গিয়ে দলটাই তুলে দিয়েছেন। এ বার ওঁর হাত ধরে ডেবরা থেকেও তৃণমূল উঠে যাবে।’’ ব্যক্তি আক্রমণে নারাজ সিপিএম প্রার্থী সুমিত অধিকারী। তিনি উস্কে দিচ্ছেন পাঁচ বছর আগে বিধানসভা ভোটে ডোমজুড়ে পদ্ম প্রার্থী রাজীবের বিরুদ্ধে খোদ মুখ্যমন্ত্রীর কথা। সুমিতের দাবি, ‘‘তখন বলেছিলেন, দুর্নীতি থেকে বাঁচতে রাজীব বিজেপিতে গিয়েছেন। আর এখন সেই মুখ্যমন্ত্রী ওঁকে ভাল ছেলে, কাজের ছেলে বলছেন। এই দ্বিচারিতার জবাব মানুষই দেবেন।’’ একই সঙ্গে শুভাশিসের নাম শোনেননি বলেই দাবি ভূমিপুত্র সুমিতের।

২০২১-এর জানুয়ারি থেকে অক্টোবর। জোড়া ফুল থেকে পদ্ম, আবার সেখান থেকে পুরনো ঘরে ফিরে আসার অধ্যায় নিয়ে মন্তব্য করতে নারাজ রাজীব। শুধু বলছেন, ‘‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি আমার অভিযোগ ছিল না। অভিমানে ঘর ছেড়েছিলাম। ভুল বুঝতে পেরে ফিরে এসেছি।’’ তাঁর মতো আরও অনেক নেতাই তো দলত্যাগ করে, পরে ফিরেছেন। সকলকেই কি প্রায় পাঁচ বছর ‘প্রায়শ্চিত্ত’ করতে হয়েছে? সাবধানী উত্তর, ‘‘দল যা দায়িত্ব দিয়েছে, তা পালন করেছি। সেটার অন্য ব্যাখ্যা ঠিক নয়। ত্রিপুরায় থাকার সময়ে মা মৃত্যুশয্যায় থাকলেও আসতে পারিনি। মারা যাওয়ার পরে এসেছিলাম। ডেবরায় পাঠিয়েছেন, সেখানেও দায়িত্ব পালন করব।’’বিরোধীদের সঙ্গে যেমন লড়াই, তেমন অল্প সময়ে দলকে একত্রিত করা মোটেই সহজ নয়। তবে দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে ডোমজুড়ের দলীয় কোন্দলকে তিনি তেমন ভাবে বাইরে আসতে দেননি। বরং ২০১৬ সালে রাজ্যে সর্বোচ্চ ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন। যদিও এর সঙ্গে তিনি যোগ করেন, ‘এলাকার ঘরের লোক’ হয়ে ওঠার তত্ত্ব। প্রচারের ফাঁকে রাজীব বললেন, ‘‘মানুষের উপর আস্থা রাখলে, তাঁরাও ফিরিয়ে দেন। সবে ডেবরায় এসেছি। প্রচারের মাধ্যমেই যতটা সম্ভব মানুষকে আপন করে নিচ্ছি।’’

২০১১, ২০১৬ সালে তৃণমূলের স্থানীয় নেতারা প্রার্থী হয়ে জিতেছিলেন। ২০২১ সালে আদতে কলকাতার বাসিন্দা, প্রাক্তন পুলিশ কর্তা হুমায়ুন কবীর বিধায়ক হয়েছিলেন। এ বার রাজীবকে এনেছে তৃণমূল। স্থানীয় তৃণমূল নেতারা প্রার্থীর দলবদলের বিষয়টা আলোচনায় আনতে চান না। বরং কাঁসাই নদীর উপরে টাবাগেড়িয়া সেতু তৈরি না হওয়া, চককাশী আইখোলা অঞ্চলে খানাখন্দে ভরা কাঁচা রাস্তা, বাড়ি তৈরির টাকা না পাওয়া, পানীয় জলের সমস্যা, রেললাইনের উপরে বালিচক উড়ালপুলের কাজ শেষ না হওয়া, বন্যার সমস্যার মতো বিভিন্ন ক্ষোভ প্রশমিত করতে ডোমজুড়ের গল্প শুনিয়ে ভরসা জোগাতে চান। ডেবরায় প্রায় ২৩ শতাংশ তফসিলি জনজাতির ভোট রয়েছে। সিপিএমের দাবি, আদিবাসীরা বুঝে গিয়েছেন, লাল ঝান্ডাই ওঁদের সম্বল। যদিও সাঁওতাল, মুন্ডা, মান্ডি, লোধা প্রধান গোলগ্রাম ৮ নম্বর অঞ্চলে প্রচারের সময়ে রাজীবের দাবি, ‘‘দেখছেন তো, বয়স্কেরা কী ভাবে এসে জড়িয়ে ধরছেন। এর পরেও বলবেন, ওঁরা অন্য কাউকে ভরসা করছেন?’’

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Debra Rajib Banerjee TMC

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy