পুজো মণ্ডপে যেমন থিমের বাহার, তেমনই বিষয় বৈচিত্রে রঙিন দুই মেদিনীপুরের বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিনের শারদ সংখ্যাগুলি। রীতিমতো আগাম পরিকল্পনা হচ্ছে। কিছু কবিতা, প্রবন্ধ, ছোট গল্প আর অলঙ্করণ দিয়ে সাময়িকী করার পথ ছেড়ে নির্দিষ্ট বিষয় ভিত্তিক শারদ সংখ্যা প্রকাশিত হচ্ছে।
কিছুদিন আগে মেদিনীপুর শহর থেকে প্রকাশিত হয়েছে ‘আত্মদ্রোহে’র শারদ সংখ্যা। শিবশঙ্কর মাল সম্পাদিক পত্রিকার এই সংখ্যার বিষয় বৃহন্নলা। প্রবন্ধ থেকে কবিতা সবেতেই সমাজে ব্রাত্য এই শ্রেণির জীবন কাহিনী উঠে এসেছে। এমনকী সংখ্যাটির প্রকাশ অনুষ্ঠানেও উপস্থিত ছিলেন শহরের কয়েকজন বৃহন্নলা। সম্পাদকের মতে, গতানুগতিকতা ছেড়ে তিনি আলাদা পথে চলতে চান। তাঁর কাছে এটা সময়ের দাবিও বটে। চন্দ্রকোনা থেকে প্রকাশিত হয়েছে কবিতা শিলাই। সম্পাদক শ্রীতনু চৌধুরী। এই সংখ্যার বিষয় ‘কলরব’। তবে তা শুধু যাদবপুরের প্রতিবাদী আন্দোলন কেন্দ্রিক নয়। শ্রীতনু চান, এই সমাজের সব অন্ধকারের বিরুদ্ধেই হোক কলরব। গত বছর তাঁর পত্রিকার শারদ সংখ্যার বিষয় ছিলো দিল্লী-কামদুনি। দিল্লী থেকে কামদুনি, সব ধরনের নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধেই কলম ধরেছিলেন কবিতা শিলাইয়ের কবিরা। হলদিয়া থেকে প্রকাশিত হতে চলছে মেঘবল্লরী। সম্পাদক প্রাণনাথ শেঠ। এ বারের সংখ্যার বিষয় হলদিয়া। বন্দর শহরের পত্তন, ইতিহাস থেকে রাজনীতি, সামাজিক বিবর্তন সব কিছুই থাকবে এই সংখ্যায়। কোনও বিজ্ঞাপন ছাড়াই প্রকাশ হয় এই পত্রিকা। বিষয় ভিত্তিক লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশের কারণ হিসেবে প্রাণনাথের যুক্তি, ‘‘কবিতা-গল্প-প্রবন্ধ নিয়ে পাঁচমিশালি পত্রিকার ক্ষেত্রে বেশিরভাগ লেখক নিজেদের লেখা ছাড়া আর কিছুই উল্টেও দেখে না। কেউ কেউ আবার নিজের লেখাটা ছিঁড়ে নিয়ে বাকি বইটা ওজনদরে বিক্রি করে দেয়। বিষয়ভিত্তিক পত্রিকার কিন্তু আলাদা পাঠক আছে।’’ গতবছরের এই পত্রিকার শারদ সংখ্যার বিষয় ছিলো তুলসি মঞ্চ।
সবংয়ের চাঁদকুড়ি থেকে প্রকাশিত ‘কথা মেঘ’-এর শারদ সংখ্যার বিষয় আবার দুই মেদিনীপুরের দুর্গারা। দুই সম্পাদক শান্তনু অধিকারী আর গৌতমদেব পাত্র বেছে নিয়েছেন দুই জেলার ৩০ জন মহিলাকে, যাঁদের লড়াই অবিস্মরণীয়। সম্পাদকদের মতে, বিষয় ভিত্তিক পত্রিকা এক ধরনের গবেষনাধর্মী কাজের ফসল। ছ’মাস থেকে এক বছর ধরে খেটে তবেই পত্রিকা প্রকাশ করা যায়। অনেকে তা সংক্ষরণ করে রাখেন। হাউর থেকে প্রকাশিত ‘জন্মভূমি’-র বিষয় সিদুঁর।
চড়াইকে বিষয় করে কয়েক বছর আগে সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন মেদিনীপুর থেকে প্রকাশিত ‘অমিত্রাক্ষর’ পত্রিকার সম্পাদক অচিন্ত্য মারিক। সেই সংখ্যার প্রশংসা করেছিলেন স্বয়ং সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। পত্রিকার এ বারের সংখ্যার বিষয়— বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের মেদিনীপুর শাখা। কবিগুরু শহরের বুকে এই সংস্থার ভবনের দারোদ্ঘটন করেছিলেন। পাঁশকুড়ার গ্রাম সাহড়দা থেকে প্রকাশিত হয় পুণ্যিপুকুর। সম্পাদক ভাস্করব্রত পতি। নানা বিষয় নিয়ে তিনি কাজ করেছেন। তাঁরও অভিজ্ঞতা, পাঁচমিশালি লিটল ম্যাগাজিনের থেকে বিষয় ভিত্তিক লিটল ম্যাগাজিনের আকর্ষণ অনেক বেশি। এই ধরনের পত্রিকা লোকে সংগ্রহে রাখে। পত্রিকার এ বারের বিষয় রথ। শুধু রাজ্য বা দেশ না, সারা বিশ্বের রথযাত্রার খুটিঁনাটি থাকবে এই সংখ্যায়।
মেদিনীপুরের লিটল ম্যাগাজিন আকাদেমির সম্পাদক ঋত্বিক ত্রিপাঠির পত্রিকা জ্বলদর্চির পক্ষ থেকে আবার বিষয় ভিত্তিক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। নাম ‘স্মৃতি: প্রসঙ্গ ও প্রয়োগ’। স্মৃতিকথা জানাতে কলম ধরেছেন এক ঝাঁক নামী লেখক। ঋত্বিক জানালেন, কয়েক বছর হল বিষয় নির্ভর পত্রিকা প্রকাশের প্রবণতা বাড়ছে। এতে লিটল ম্যাগাজিনে আন্দোলন সমৃদ্ধ হবে বলেই তাঁর আশা। পেশায় প্রধান শিক্ষক প্রসূনকুমার পড়িয়া সম্পাদিক জীবনদর্পণ পত্রিকাও এখন হচ্ছে বিষয় ভিত্তিক।
কিছুদিন আগে প্রয়াত হয়েছেন অমৃতলোক পত্রিকার সম্পাদক সমীরণ মজুমদার। প্রতিবাদী হিসেবে তিনি সারা রাজ্যের লিটল ম্যাগাজিন দুনিয়ায় পরিচিত ছিলেন। প্রমথনাথ বিশী প্রকাশিত সবুজপত্রকে বাংলা ভাষার প্রথম লিটল ম্যাগাজিন ধরা হয়। এ বছর তাঁর শতবার্ষিকী। মৃত্যুর আগে পর্যন্ত্য শ্রী মজুমদার ব্যস্ত ছিলেন সবুজপত্রের শতবার্ষিকী বিষয়ে অমৃতলোকের এক সংখ্যার কাজে। তা তিনি শেষ করে যেতে পারেননি। প্রসূনবাবু জানালেন, তাঁর প্রিয়জনেরা চেষ্টা চালাচ্ছেন কাজ শেষ করে শীঘ্রই ওই সংখ্যা প্রকাশের।