পরিবারে একের পর এক অঘটন ঘটতে থাকায় শ্বশুরবাড়ির লোকেরা ডাইনি সাব্যস্ত করে রানি হাঁসদাকে। গত বৃহস্পতিবার রানিদেবীর মেজ জা সুমি হাঁসদার ছেলে ঝন্টু কাজ করতে গিয়ে মাঠে পড়ে যায়। ঘটনার জেরে পরিজনদের মধ্যে সন্দেহটা আরও গভীর হয়। শনিবার রাতে পশ্চিম মেদিনীপুরের পিংলার খামার কুসুমদা গ্রামে বসে সালিশি সভা। সভায় বছর পঞ্চাশের রানিদেবীকে মারধর করা হয়। পালানোর চেষ্টা করলে ছোট জা সুমি হাঁসদা ভারী কিছু দিয়ে রানিদেবীর মাথায় আঘাত করে বলে অভিযোগ।
পুলিশের দাবি, রাতের মধ্যেই ভাসুরের ছেলেরা মিলে রানিদেবীর দেহ লোপাট করে দেয়। রবিবার মৃতার স্বামী শ্রীমৎ হাঁসদা পুলিশে ঘটনার অভিযোগ দায়ের করে। পুলিশ রানিদেবীর তিন ভাসুর মঙ্গল, হরিপদ, গুরুপদ, তাঁর স্ত্রী সুমি-সহ ন’জনকে গ্রেফতার করে। রাতেই ঘটনাস্থল থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে দুজিপুরে একটি ডোবার ধারে ঝোপ থেকে রানিদেবীর দেহ উদ্ধার করে পুলিশ। সোমবার মেদিনীপুরে জেলা পুলিশ সুপার ভারতী ঘোষ বলেন, ‘‘ডাইনি সন্দেহে সালিশি ডেকে রানি হাঁসদাকে দশ জন মিলে খুন করে। তাঁর দেহ লোপাটও করে দেওয়া হয়। ঘটনায় এখনও ন’জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।” সোমবার মেদিনীপুর সিজেএম আদালতে তোলা হলে ধৃতদের মধ্যে সুমি, ঝন্টু, মিন্টু ও হরিপদকে ছ’দিনের পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দেন বিচারক। বাকি পাঁচ জনের চোদ্দো দিনের জেল হাজতের নির্দেশ হয়।
গত কয়েক বছরে হাঁসদা পরিবারে একের পর এক অঘটন ঘটে। ২০০৯ সালে পথ দুর্ঘটনায় মঙ্গলের বড় ছেলে খেলারামের মৃত্যু হয়। খেলারামের স্ত্রী সোনালি ফের ছোট দেওর সানো হাঁসদাকে বিয়ে করে। তাঁদের এক পুত্র সন্তান হয়। যদিও তার মধ্যেও নানা অস্বাভাবিকতা দেখা যায় বলে অভিযোগ। গত বছর সেপ্টেম্বরে মৃত্যু হয় মঙ্গলের স্ত্রী মুগলি হাঁসদারও। পরপর দুর্ঘটনার জেরে পরিজনরাই রানিদেবীকে ডাইনি সাব্যস্ত করেন। তাঁদের দাবি ছিল, ভাসুরদের পরিবারের ক্ষতি করে সব সম্পত্তি দখলের চেষ্টা করছেন রানিদেবী। গত বছর পুজোর সময়ও ডাইনি অপবাদে তাঁকে মারধর করা হয়। ঘটনার পরে পিংলার মীরুপুরে বাপের বাড়িতে চলে যান রানিদেবী। পরে পুলিশের মধ্যস্থতায় ওই প্রৌঢ়া ফের শ্বশুরবাড়ি ফিরে আসেন।
গত বৃহস্পতিবার গুরুপদর ছেলে ঝন্টু মাঠে কাজ করতে গিয়ে পড়ে যায়। পুলিশের দাবি, জেরায় মঙ্গল জানিয়েছে, ঘটনার পিছনে রানিদেবীর হাত রয়েছে সন্দেহে বসে সালিশি সভা। সভায় রানিদেবীকে মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত হয়। মারধর করা হয় তাঁকে। পালানোর চেষ্টা করলে রানিদেবীকে বাকিরা ধরে ফেলে। সেই সময় ভারী কিছু দিয়ে তাঁর মাথায় আঘাত করে সুমি। রাতের অন্ধকারেই ঝন্টু, মিন্টু ও স্বপন মিলে দুজিপুরে একটি ডোবার ধারে রানিদেবীর দেহ রেখে আসে।
রবিবার ঘটনাস্থলে যান এসডিপিও সন্তোষ মণ্ডল। এ দিন প্রথমে মৃতার তিন ভাসুর ও জাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরে রাতে দাঁতন-২ ব্লকের জাহালদায় শ্বশুরবাড়ি থেকে ঝন্টুকে গ্রেফতার করা হয়। পিংলার এগারো মাইলে শ্যালিকার বাড়ি থেকে ধরা হয় মিন্টুকেও। এ ছাড়াও ঘটনায় যুক্ত থাকার অভিযোগে রাতেই পুলিশ স্থানীয় বাসিন্দা সনাতন সিংহ, খোকন সিংহ ও শ্যামপদ সিংহকে পাকড়াও করে। যদিও স্বপন এখনও পলাতক। পুলিশের দাবি, জেরায় জাকে খুন করার কথা স্বীকার করেছে সুমি। ঝন্টু ও মিন্টুর থেকে ঘটনার কথা জেনে পুলিশ রবিবার গভীর রাতে দুজিপুর থেকে রানিদেবীর দেহ উদ্ধার করে।
পিংলার ঘটনার পর এই সামাজিক ব্যাধি দূর করতে সাধারণ মানুষের সচেতনতা বাড়ানোর উপরই জোর দিচ্ছেন জেলা পুলিশ সুপার ভারতী ঘোষ। সোমবার মেদিনীপুরে সাংবাদিক বৈঠকে ভারতীদেবীর আরও সংযোজন, ‘‘শুধু শিবির করলে হবে না। সংবেদনশীল গ্রামগুলির উপর নজরও রাখতে হবে। ’’