কড়ুরিয়া গ্রামে ঢুকতেই শোনা যাচ্ছিল কান্নার আওয়াজ। নিজের বাড়ির উঠোনে বসে মাথা চাপড়াচ্ছিলেন বাসুদেব দাস, ‘‘এই তো সকাল থেকে আমার কোলে ছিল নাতিটা। ওর মা তো পোলিও খাওয়াতে নিয়ে গেল। যেতে চায়নি ও। কোথায় গেল ওরা? বেশি দূর তো নয়...’’। তাঁর মেয়ে কৃষ্ণা দাস(৩৫), দিন সাতেক আগেই বাপের বাড়ি এসেছিলেন। বুধবার সকালে খুড়তুতো দাদার স্ত্রী মুন্না দাসের(২৮) সঙ্গে পাঁচখুরি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়েছিলেন ছেলে সৌম্যকে পোলিও টিকা দেওয়াতে। মুন্নাদেবীর বছর দু’য়েকের ছেলে আকাশও সঙ্গে ছিল।
সবই ঠিকঠাক মিটে গিয়েছিল। সাড়ে ১২টা নাগাদ হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরবেন বলে বেরিয়েও পড়েছিলেন। ছেলেদের কোলে নিয়ে চন্দ্রকোনা-মেদিনীপুর সড়ক ধরে হেঁটে আসছিলেন তাঁরা। বাড়ি থেকে সামান্য দূরে পাঁচখুরি চাতালের কাছে মেদিনীপুরগামী বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তাঁদের ধাক্কা মারে। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় কৃষ্ণা দসা, মু্ন্না দাস ও সৌম্য দাসের। মুন্নাদেবীর ছেলে আকাশকে জখম অবস্থায় মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি করানো হয়। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের খবর, বছর দেড়েকের সৌম্যর ধড় ও মুণ্ড আলাদা হয়ে যায়।
আদতে চন্দ্রকোনা থানার বাঁশদহ গ্রামের বাসিন্দা কৃষ্ণাদেবীর বাপের বাড়ি কড়ুরিয়া গ্রামে। শুক্রবার সকালেই ছেলেকে নিয়ে তাঁর শ্বশুরবাড়ি ফেরার কথা ছিল। এ দিকে স্ত্রী ও ছেলের মৃত্যু সংবাদ শুনেই শ্বশুরবাড়ি চলে আসেন কৃষ্ণাদেবীর স্বামী চন্দন দাস। একবার মেদিনীপুর মর্গ, একবার কেশপুর থানা ছুটে বেরিয়েছেন চন্দনবাবু। কেশপুর থানায় স্ত্রীর মৃতদেহ দেখেই কান্নায় ভেঙে পড়েন চন্দনবাবু। চিৎকার করে ডাকতে থাকেন ছেলেকে। তখনও তাঁকে দেখানো হয়নি সৌম্যর মৃতদেহ। প্রতিবেশী এক বৃদ্ধা সুমিত্রা দোলই বলেন, “ঘটনার কথা শুনেই আমরা সবাই গিয়েছিলাম। দেখি, সৌম্যর মুণ্ডটি একটি জায়গায় পড়ে রয়েছে। সে দৃশ্য দেখে গ্রামের অনেকেই অজ্ঞান হয়ে গিয়েছে। ওর বাবাকে কোন মুখে বলব সে কথা?’’
মেয়ে আর নাতির মৃত্যু সংবাদে বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছেন পূর্ণিমা দাস। একই অবস্থা মুন্না দাসের শাশুড়ি সন্ধ্যাদেবী ও শ্বশুর পশুপতি দাসের। ননদ ও বৌদিদের সম্পর্ক ছিল খুব ভাল। পশুপতিবাবু বলেন, “মঙ্গলবারই বৌমাকে বলেছিলাম পিঠে করার জন্য। বলেছিল আজ হাসপাতাল থেকে এসে তাড়াতাড়ি ভাত খেয়ে পিঠে করবে। ভাইঝি এসেছিল। তাই পিঠের সব আয়োজন করেও রেখে গিয়েছিল বৌমা।”
প্রথমে বোঝা যাচ্ছিল না আকাশকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। পরে জানা যায় মায়ের কোল থেকে ছিটকে গিয়ে বেঁচে গিয়েছে আকাশ। তাঁর মাথায় ও হাতে আঘাত লেগেছে। কিন্তু জখম গুরুতর নয়। আকাশের বাবা সঞ্জয় দাস ছেলের খোঁজে কেশপুর থেকেই দৌড়তে শুরু করেন। বারবার বলতে থাকেন ছেলের কাছে যেতে হবে। ২০ কিলোমিটার দূরে মেদিনীপুর হাসপাতালে রয়েছে ছেলে! পুলিশি সহযোগিতায় ও প্রতিবেশীরা সঞ্জয়বাবুকে মেদিনীপুরে নিয়ে যান। পড়শি যুবক রতন সিংহ বলেন, “সঞ্জয় কখনও কাঁদছে, কখনও হাসছে।’’ মেদিনীপুরে নিয়ে গিয়ে প্রথমেই সঞ্জয়বাবুর চিকিৎসা করা হয়। আপাতত তাঁকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে তাঁকে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে।