Advertisement
E-Paper

কাকলির পর ‘বেসুরো’ আরও এক তৃণমূল সাংসদ! ‘নৈরাজ্যের অবসান’ লিখলেন সুখেন্দুশেখর, ফের সরব আরজি কর নিয়েও

রোমান সাম্রাজ্যের ইতিহাস তুলে ধরে সুখেন্দুশেখর লেখেন, “পশ্চিমবঙ্গের মানুষ অসহনীয় নৈরাজ্যের অবসান ঘটিয়েছেন।” তাঁর এই পোস্ট ঘিরে রাজনৈতিক মহলে তো বটেই, তৃণমূলের অন্দরেও আলোচনা শুরু হয়েছে।

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২৬ মে ২০২৬ ১৩:০৪
(বাঁ দিকে) কাকলি ঘোষদস্তিদার এবং সুখেন্দুশেখর রায় (ডান দিকে)।

(বাঁ দিকে) কাকলি ঘোষদস্তিদার এবং সুখেন্দুশেখর রায় (ডান দিকে)। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

কাকলি ঘোষ দস্তিদারের পর এ বার সুখেন্দুশেখর রায়। তৃণমূলের বিপর্যয়ের মধ্যেই বেসুরো দলের আরও এক সাংসদ। মঙ্গলবার সকালে সমাজমাধ্যমে ইঙ্গিতপূর্ণ পোস্ট করেন দলের রাজ্যসভার সাংসদ সুখেন্দুশেখর। রোমান সাম্রাজ্যের ইতিহাস তুলে ধরে তিনি লেখেন, “পশ্চিমবঙ্গের মানুষ অসহনীয় নৈরাজ্যের অবসান ঘটিয়েছেন।” সুখেন্দুশেখরের এই পোস্ট ঘিরে রাজনৈতিক মহলে তো বটেই, তৃণমূলের অন্দরেও আলোচনা শুরু হয়েছে।

ওই পোস্টের প্রসঙ্গে সুখেন্দুশেখর এখনও সবিস্তার কিছু বলেননি। তবে ঘনিষ্ঠমহলে তৃণমূলের শোচনীয় ফলাফল নিয়ে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট করে দিয়েছেন। দলের ভুলভ্রান্তি কোথায় ছিল, ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে একান্ত আলোচনায় তিনি তা-ও জানিয়েছেন বলে জানা গিয়েছে।

সুখেন্দুশেখরের ঘনিষ্ঠমহল সূত্রে খবর, গত লোকসভা নির্বাচনের সঙ্গে রাজ্যের সদ্যসমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলের তুল্যমূল্য বিচার করেছেন তিনি। সেই সূত্রেই সুখেন্দুশেখর জানিয়েছেন, ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল ২৯টা আসনে জয়ী হয়েছিল। ২০১৯ সালের ভোটের তুলনায় বিজেপির ছ’টি আসন কমে গিয়েছিল। মাত্র দু’বছরের মধ্যে তৃণমূলের এই খারাপ ফল হল কী করে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।

দ্বিতীয়ত, ঘনিষ্ঠমহলে আরজি কর আন্দোলনের আঁচ বুঝতে দলের অক্ষমতার দিকেও ইঙ্গিত করেছেন সুখেন্দুশেখর। তাঁর এক ঘনিষ্ঠকে সুখেন্দু জানিয়েছেন, আরজি কর হাসপাতালে চিকিৎসক-তরুণীকে ধর্ষণ এবং খুনের ঘটনায় লক্ষ লক্ষ মানুষ রাস্তায় নেমেছিলেন। তাতেই অশনিসঙ্কেত ছিল। তৃণমূল সেই দেওয়াল লিখন পড়তে পারেনি।

তৃতীয়ত, ঘনিষ্ঠমহলে তৃণমূলের ‘প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি’ নিয়েও সরব হন সুখেন্দুশেখর। ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে একান্ত আলোচনায় তিনি জানান, তৃণমূলে দুর্নীতির বিষয়টি প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে চলে গিয়েছিল। তাই মানুষ বিকল্পের সন্ধান করছিল। এক সুখেন্দু-ঘনিষ্ঠের বক্তব্য, পশ্চিমবঙ্গের যে কোনও গ্রামে সবচেয়ে বড় বাড়িটি যাঁর, তিনি তৃণমূলের পঞ্চায়েত প্রধান। এই দুর্নীতি মানুষ খালি চোখে দেখেছে। এটা বোঝার জন্য বাইরে থেকে ডিগ্রি অর্জন করে আসার দরকার নেই। এই সূত্রেই নিজের ঘনিষ্ঠমহলে সুখেন্দুশেখরের ব্যাখ্যা, ২০১১ সালে বামফ্রন্টকে সরানোর সময় মানুষ যে মনোভাব নিয়ে ভোট দিয়েছিল, ২০২৬ সালেও তার অন্যথা হয়নি। সে বার মানুষ ভোট দিয়েছিল সিপিএমকে তাড়াতে। এ বারও তৃণমূলকে তাড়াতে বিজেপিকে ভোট দিয়েছে।

ঘনিষ্ঠমহলে সুখেন্দু এ-ও জানিয়েছেন যে, তৃণমূলের এখন আত্মবিশ্লেষণ এবং দলীয় কাঠামোয় শুদ্ধকরণ করা উচিত। সাংগঠনিক কাঠামোর খোলনলচে না-বদলালে দলের অস্তিত্ব আগামী দিনে আরও সঙ্কটাপন্ন হবে বলেই মনে করছেন সুখেন্দু।

ছয় দশক ধরে রাজ্য রাজনীতিতে রয়েছেন সুখেন্দুশেখর। কংগ্রেসি ঘরানার এই বর্ষীয়ান রাজনীতিক প্রণব মুখোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি তৃণমূলে যোগ দেন। সংবিধান, সংসদীয় গণতন্ত্র, যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় রাজ্যের ভূমিকা ইত্যাদি বিষয়ে তাঁর সম্যক জ্ঞান এবং পড়াশোনা রয়েছে। এখন রাজ্যসভায় তৃণমূলের যে সাংসদেরা রয়েছেন, তাঁদের মধ্যে সুখেন্দুবাবু অন্যতম প্রবীণ। রাজ্য রাজনীতির বহু উত্থান-পতন তিনি যেমন দেখেছেন, তেমনই দিল্লির রাজনৈতিক অলিন্দের উপর নিবিড় ভাবে নজর রাখার সুযোগ পেয়েছেন। এমন প্রবীণ এবং অভিজ্ঞ রাজনীতিক ফের ‘বেসুরো’ হওয়ায় অস্বস্তিতে তৃণমূল। দলের অন্দরে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হলেও প্রকাশ্যে এখনও কেউ কোনও মন্তব্য করেননি।

এর আগেও এক বার ‘বেসুরো’ হয়েছিলেন সুখেন্দুশেখর। ২০২৪ সালের অগস্ট মাসে আরজি কর আন্দোলন নিয়ে তৎকালীন তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে ইঙ্গিতপূর্ণ পোস্ট করেছিলেন সুখেন্দুশেখর। দক্ষিণ কলকাতার যোধপুর পার্কে নেতাজি মূর্তির সামনে ধর্নাতেও বসেছিলেন। সেই সময়েও একাধিক পোস্টে ঐতিহাসিক প্রসঙ্গের অবতারণা করেছিলেন বর্ষীয়ান এই সাংসদ। আরজি করের ঘটনায় বিচার চেয়ে শহর কলকাতার রাজপথ যখন উত্তাল, সেই সময় সুখেন্দু লিখেছিলেন, “ ১৭৮৯ সালের জুলাই...। বিক্ষোভকারীরা ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছিলেন বাস্তিল দুর্গ। জন্ম হয়েছিল ঐতিহাসিক ফরাসি বিপ্লবের।’’ অন্য একটি পোস্টে মধ্যযুগের কবি চণ্ডীদাসের পদাবলির আশ্রয় নেন তিনি। লেখেন, “শুনহ মানুষ ভাই, সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই— মধ্যযুগের মানবতাবাদী বাঙালি কবি চণ্ডীদাস।’’ আরজি কর-কাণ্ডে সমাজমাধ্যমে তদন্ত সংক্রান্ত কিছু প্রশ্ন এবং প্রস্তাব তুলেছিলেন সুখেন্দু। পরে অবশ্য ‘বিদ্রোহে’ ইতি টানেন তিনি। পুলিশের বিরুদ্ধে করা পোস্টে ভুল তথ্য ছিল বলে তা মুছেও দেন।

তৃণমূলের আর এক ‘বেসুরো’ সাংসদ কাকলিকে সম্প্রতি সংসদীয় দলের মুখ্যসচেতকের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। ওই দায়িত্ব ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে শ্রীরামপুরের সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে। কিন্তু ‘অভিমানী’ কাকলি সমাজমাধ্যমে ইঙ্গিতপূর্ণ পোস্ট করেন। তিনি লেখেন, ‘‘৭৬ থেকে পরিচয়, ৮৪-তে পথ চলা শুরু। চার দশকের আনুগত্যের জন্য আজ পুরস্কৃত হলাম।’’ ঘটনাক্রমে রবিবারই বারাসত সাংগঠনিক জেলা তৃণমূল সভাপতির পদ থেকেও ইস্তফা দিয়েছেন তিনি। মঙ্গলবার কল্যানীতে তিনি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর প্রশাসনিক বৈঠকেও যোগ দেন।

TMC MP Kakali Ghosh Dastidar
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy