জগতের কাছে শ্রীরামকৃষ্ণ রেখে গেছেন তাঁর অনন্য বাণী, “যত মত তত পথ।” মত বলতে ধর্ম মত আর পথ বলতে উপাসনার পথ বোঝাচ্ছে। অর্থাৎ বিভিন্ন ধর্মের মতের উপাসনার পথ ভিন্ন ভিন্ন, কিন্তু গন্তব্য এক। নদীগুলি যেমন নানা পথ অতিক্রম করে একই সাগরে গিয়ে মেশে, নানা ধর্মমতের মানুষও তেমনই নানা উপাসনার পথ ধরে উপাস্যের কাছে যায়। স্বামী বিবেকানন্দের মতে, মানুষের মধ্যে যে দেবত্ব জন্ম থেকেই বিদ্যমান, তারই প্রকাশের নাম ধর্ম। এখানে মানুষের মধ্যে কোনও বিভেদের স্থান নেই। পৃথিবীর সকল ধর্মগুরু চিরকাল মানুষের জয়গান গেয়েছেন, মনুষ্যত্বের জয়গান গেয়েছেন। প্রকৃত ধর্মের মূল বার্তাই হচ্ছে শুদ্ধ ভালবাসা।
অথচ ধর্মের নামে কী করছি আমরা?
ধর্মের প্রকৃত অর্থ সম্পূর্ণ রূপে অগ্রাহ্য করে মেতে উঠছি বিচ্ছিন্নতার অনৈতিকতায়। পৃথিবীর কোনও ধর্ম জীবকে যন্ত্রণায় বিদ্ধ করার কথা বলে না। তাই বলা যায়, ধর্ম নিয়ে লড়ছেন যাঁরা, তাঁরা ধর্মের মূল কথাই জানেন না
রবীন্দ্রনাথের মতে ভারতবর্ষ হল সেই মহান দেশ যেখানে “শক হুন দল পাঠান মোগল এক দেহে হল লীন।” এ দেশ সম্প্রীতির দেশ, মহামিলনের দেশ। ভারতের ইতিহাস বহন করে মানুষের সঙ্গে মানুষের নিবিড় বন্ধনের গৌরব। সেই গৌরবের কথা কেন ভুলে যাচ্ছি আমরা?
যে বঙ্গ নজরুল ইসলামের মতো অসামান্য, অসাম্প্রদায়িক, মানবতাবাদী কবির জন্ম দিয়েছে, সেখানে কেন এই হানাহানি? এ তো তাঁর প্রতি তীব্র অমর্যাদার প্রকাশ।
এই মুর্শিদাবাদের মহুলা গ্রামে রামকৃষ্ণ মিশনের সেবাকার্য প্রথম শুরু হয়েছিল ১৮৯৭ সালে স্বামী অখণ্ডানন্দের হাত ধরে। এক অসহায় মুসলমান বালিকাকে অভাবের তাড়নায় কাঁদতে দেখে তাঁর হৃদয় বিচলিত হয়েছিল। সেখান থেকেই শুরু হল তাঁর সেবাকাজ।
মানুষের সেবাই হল ঈশ্বরের প্রকৃত পূজা। এখানে “হিন্দু না ওরা মুসলিম’’ এই প্রশ্ন ওঠে না কখনওই।
আমাদের সমস্যা অনেক। দারিদ্র, অভাব, বেকারত্বের জ্বালা আমাদের কুরে কুরে খায়। সেগুলির বিরুদ্ধেই তো এক সঙ্গে ভেদাভেদ ভুলে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়তে হবে।
অথচ কিছু মিথ্যা ধারণার বশবর্তী হয়ে যদি আমরা মূল সমস্যাটিকেই ভুলে যাই, তবে অন্ধকারের নিরসন হবে না কোনওদিনই। পারস্পরিক হানাহানিতে যত বেশি লিপ্ত হব আমরা, ততই পিছিয়ে যাব আমরা, ডুবে যাব নিম্নগামীতার খাদে।
এই সময় আমরা যারা নিজেদের একটু শিক্ষিত মনে করি, তাঁদের এগিয়ে আসতে হবে। দূর করতে হবে ভ্রান্ত ধারণা। সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভেদ এলে দেশ জুড়ে দেখা দেয় নিদারুণ যন্ত্রণা, আসে এক ভয়ানক আগুন যাতে জ্বলে পুড়ে মরতে হয় নিরন্ন, অভাবী মানুষদেরই।
পৃথিবী খুব দ্রুত এগোচ্ছে। বিজ্ঞান, সাহিত্য, দর্শন সর্বক্ষেত্রে মানুষ আরো আরো বেশি উঁচুতে যাওয়ার চেষ্টা করছে পৃথিবীর নানান প্রান্তে।
সেই সময় হানাহানির নামে এই ক্ষুদ্রতা আমাদের যে দুর্বিষহ ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, পরবর্তী প্রজন্মের কাছে রেখে যাচ্ছে যে হতাশার চিত্র, তার কথা ভেবে বড় বেশি শিহরিত হয়ে উঠি।
যা কিছু করার করতে হবে এখনই, এই মুহূর্তেই।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)