শঙ্কর সিংহ ও তাঁর অনুগামীদের ব্রাত্য করে নদিয়ায় নতুন জেলা কমিটি গঠন করল কংগ্রেস। তবে এমনটা যে হতে চলেছে তা আগে থেকেই আঁচ করেছিলেন জেলার কংগ্রেস কর্মীরা। কারণ এই মুহূর্তে জেলা সভাপতি-সহ অন্যান্য নেতারা প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীর চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ। আর অধীর চৌধুরীর সঙ্গে বর্তমানে শঙ্কর সিংহের যা সম্পর্ক তাতে শঙ্করবাবুর অনুগামীদের যে কমিটিতে ঠাঁই হবে না সেটা ধরেই নিয়ে ছিলেন দলের কর্মীরা।
বৃহস্পতিবার দলের সভায় নতুন কমিটি গঠিত হওয়ার পরে দলের এই কোন্দল আবার প্রকাশ্যে চলে আসায় কার্যত হতাশ কর্মীরা। তাঁদের কথায়, ‘‘এখন কংগ্রেসের যা অবস্থা তাতে সকলে মিলে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করতে না পারলে দলের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাই মুশকিল হয়ে পড়বে। কৃষ্ণগঞ্জ বিধানসভা উপনির্বাচনে ও পুরসভা নির্বাচনে দলের যে শোচনীয় হাল হয়েছে তা থেকেও আমাদের দলের নেতারা শিক্ষা নিলেন না।’’ কর্মীদের প্রশ্ন, সামনে বিধানসভা নির্বাচন। এমনিতেই দলের অবস্থা বেহাল। এ ভাবে যদি নেতারা চলতে থাকেন তাহলে বিধানসভা ভোটে কর্মীরা কী ভাবে একসঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করবেন?
বৃহস্পতিবার কৃষ্ণনগরের ঘূর্ণীতে একটি লজে এই সভার আয়োজন করেছিল জেলা কংগ্রেস নেতৃত্ব। জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দলের শ‘তিনেক নেতা কর্মী এ দিন ওই সভায় উপস্থিত ছিলেন। পাঁচ জন করে সম্পূর্ণ নতুন সহ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক, দশ জন করে সম্পাদক ও এক্সিকিউটিভ বডির সদস্য এবং চার জন মহিলা প্রতিনিধি নিয়ে পূর্ণাঙ্গ জেলা কমিটি গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি এই সভার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিল আগামী বিধানসভা ভোটের জন্য দলকে প্রস্তুত করা। সেই মতো দলের বক্তারা তাঁদের বক্তব্যে বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেন। কিন্তু যে বিষয়টি নিয়ে কর্মীরা সব থেকে বেশি চিন্তিত, সেই নেতৃত্বের কোন্দল নিয়ে অবশ্য কেউই বিশেষ কিছু বলেননি। এ দিন সভায় উপস্থিত থাকার কথা ছিল জেলা কংগ্রেসের পর্যবেক্ষক তথা বহরমপুরের বিধায়ক মনোজ চত্রবর্তীর। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি আসেননি।
তবে আগামী বিধানসভা নির্বাচনে কী ভাবে দল লড়াই করবে তা নিয়ে যেখানে আলোচনা, যেখানে বিধানসভা ভোটকে সামনে রেখেই নতুন কমিটি গঠন করল দল, সেই সভাতেই দলের প্রাক্তন সভাপতি শঙ্কর সিংহকে না দেখতে পেয়ে কার্যত হতাশ অনেক কর্মীই। শুধু শঙ্করবাবুই নন, এতদিন জেলার কংগ্রেসে পরিচিত মুখ অনেক নেতাকেই এ দিনের সভায় দেখা গেল না। বিশেষ করে শঙ্কর সিংহের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত কোনও নেতাই এ দিন সভামুখো হননি। যদিও তা নিয়ে ভাবিত নন অধীর চৌধুরীর অনুগামীরা। বরং তাঁদের কথায়, ‘‘আমরা এমন কর্মী চাই যাঁরা রাস্তায় নেমে আন্দোলনের মাধ্যমে দলের অস্তিত্ব জানান দেবেন। তাই কোন নেতা এলেন আর কোন নেতা এলেন না তা নিয়ে আমরা বিশেষ ভাবিত নই। আমরা বরং কী করে বিধানসভা ভোটের আগে দলকে চাঙ্গা করা যায় তা নিয়েই বেশি করে ভাবনা চিন্তা করতে চাই। সেটাই দলের পক্ষে ভাল হবে।’’ এ দিনের সভা থেকে এটা স্পষ্ট যে, শঙ্কর সিংহ বা তাঁর অনুগামীদের নিয়ে আর ভাবতে রাজি নয় অধীর চৌধুরীর নেতৃত্বে পরিচালিত নদিয়া জেলা কংগ্রেস। কিন্তু কর্মীদের একাংশ প্রশ্ন তুলছেন, শঙ্কর সিংহকে বাদ দিয়ে বিধানসভা নির্বাচনে লড়াই করে সাফল্য অর্জনের কথা ভাবছে কী করে জেলা কংগ্রেস? যেখানে উপনির্বাচন ও পুরসভা নির্বাচনে দলের এমন বেহাল অবস্থা।
এই সভায় অনুপস্থিত শঙ্কর সিংহের এক অনুগামীর কথায়, ‘‘উপনির্বাচনে তো শঙ্কর সিংহকে বাদ দিয়ে মুর্শিদাবাদ থেকে নেতা ভাড়া করে নিয়ে এসে ভোট করেছিলেন অধীর চৌধুরী। প্রার্থীর জামানত রাখতে পারিনি। অথচ পুরসভা নির্বাচনে একমাত্র রানাঘাটেই কংগ্রেস দু’টি আসনে জয়ী হয়েছে। আর সেই দু’টি আসনের প্রার্থীরাই শঙ্কর সিংহের ছবি নিয়েই নির্বাচনে লড়াই করে ছিলেন। তাহলে বুঝুন কংগ্রেসের ঠিক কী অবস্থা।’’
এই দুই জয়ী কাউন্সিলরকে সংবর্ধনা দেওয়ার জন্য জেলা কংগ্রেসের পক্ষ থেকে আমন্ত্রণ জানানো হয়ে ছিল। কিন্তু তাঁরা শেষ মুহূর্তে আসেননি। যদিও জেলা নেতাদের দাবি, ওই দুই জয়ী কাউন্সিলরের মধ্যে একজনের বাড়িতে তৃণমূল হামলা চালানোর কারণেই তাঁরা আসতে পারেননি। আর শঙ্কর সিংহের অনুগামীদের দাবি, তাঁদের নেতা শঙ্কর সিংহকে উপেক্ষা করে যে সভা, সেই সভায় তাঁরা কোনও দিনই থাকতেন না।
কিন্তু এমন একটা গুরুত্বপূর্ণ সভায় কেন নেই শঙ্করবাবু? তিনি তো এখনও দল ছেড়ে যাননি। জেলা সভাপতি অসীম সাহা বলেন, ‘‘আমরা কিন্তু শঙ্কর সিংহকে ডেকেছি। বুধবার আমিই ফোন করে ছিলাম। কিন্তু উনি ফোন ধরেননি। পরে এসএমএসও করেছি। তারও কোন উত্তরও দেননি।’’ যদিও এমন কোনও ফোন বা এসএমএস পাওয়ার কথা স্বীকার করেননি শঙ্করবাবু।
অসীমবাবুর ফোন বা এসএমএস করার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি শুধু বলেন, ‘‘ওই নামে জেলার কোনও কংগ্রেস নেতার কথা আমার জানা নেই। তাই এই বিষয়ে আমি কিছু বলব না।’’ শঙ্কর সিংহের সঙ্গে অধীর চৌধুরীর নানা কারণে সম্পর্কে চিড় ধরে। গত লোকসভা নির্বাচনে কৃষ্ণনগর কেন্দ্রের প্রার্থী নির্বাচনকে ঘিরে তাঁদের মধ্যে চরম বিবাদ তৈরি হয়। বর্তমানে বিবাদ এমন জায়গায় পৌঁছিয়েছে যে, অধীরবাবু প্রদেশ সভাপতি থাকাকালীন তিনি সক্রিয় রাজনীতি করবেন না বলে প্রকাশ্যে জানিয়েও দিয়েছেন শঙ্করবাবু।
তাই সব মিলিয়ে উপনির্বাচন ও পুরসভা নির্বাচনে কংগ্রেস যে ভাবে মুখ থুবড়ে পড়েছে তাতে আগামী বিধানসভা নির্বাচনে নেতাদের এই কোন্দল সামলে দল কতটা ঘুরে দাঁড়াতে পারবে তা নিয়ে ঘোর সংশয়ে দলের কর্মীরাই।