অশান্তি রুখতে নূন্যতম সহনশীলতা দেখানো হবে না। অর্থাৎ ‘জ়িরো টলারেন্স’। শুভেন্দু অধিকারীর আপ্তসহায়ক খুনের এমনই কঠোর অবস্থান নিল জেলার পুলিশ-প্রশাসন। শুধু তাই নয়, প্রয়োজনে জেলায় নতুন করে আরও কেন্দ্রীয় বাহিনী নিয়ে আসা হতে পারে বলেও জানা যাচ্ছে। সেই সঙ্গে জেলার গোয়েন্দা বিভাগকে আরও বেশি করে সক্রিয় থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কড়া নজরদারি চালানো হচ্ছে সীমান্ত এলাকায়। ভোটের পরে নাকা চেকিং-এর সংখ্যা অনেকটাই কমে এসেছিল। বুধবার রাত থেকে আবার নতুন করে নাকা চেকিং-এর সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে বলে জেলার পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে। কোনও ভাবে অশান্তি পাকানোর চেষ্টা করলেই দল-রঙ না দেখে কড়া ব্যবস্থা নেওয়ার কথা সাফ জানিয়ে দিয়েছে জেলার পুলিশ-প্রশাসন।
গোটা নির্বাচন প্রক্রিয়া চলাকালীন কমিশনের নির্দেশমত কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ঘিরে ফেলা হয়েছিল গোটা জেলা। বিশেষ করে বিস্তীর্ণ সীমান্ত এলাকা থাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঢেলে সাজানো হয়েছিল।
ভোটের অনেক আগে থেকেই পুলিশের সঙ্গে যৌথ টহলের মাধ্যমে ‘এরিয়া ডমিনেট’ থেকে শুরু করে জেলার পুরনো দুষ্কৃতীদের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নেওয়ার পাশাপাশি ভোটের মুখে অশান্তি পাকাতে পারে এমন নেতাদের সতর্ক করা-সহ বেশ কিছু পদক্ষেপ এলাকায় শান্তি প্রতিষ্টা করেছিল। নির্বাচনের দিনও জেলার দুয়েকটা ছোট-খাট ঘটনা ছাড়া মোটের উপর শান্তিপূর্ণ ভাবেই ভোট গ্রহণ পর্ব শেষ হয়েছিল। কিন্তু ভোটের ফল ঘোষণার পরে অশান্তির বা আইনশৃঙ্খলার অবনতি হওয়ার আশঙ্কা থেকে যাওয়ায় কেন্দ্রীয় বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা সাজিয়েই রেখেছিল পুলিশ-প্রশাসন। বিশেষ করে এ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের প্রবল চাপের কথা স্বীকারও করে নিচ্ছেন জেলারপুলিশ কর্তারা।
আশঙ্কা মতই ফল ঘোষণার পরে জেলার বিভিন্ন এলাকায় তৃণমূলের কার্যালয় দখল, আগুন ধরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি একাধিক গ্রাম পঞ্চায়েত ও পুরসভার ভবনে দলীয় পতাকা লাগিয়ে দেয় বিজেপির কর্মীরা। অনেক জায়গাতেই উত্তজক পরিস্থিতি তৈরি হয়। যদিও একই সঙ্গে সেই সব কর্মকান্ড বন্ধ করতে পুলিশ-প্রশাসন কড়া অবস্থান নিতে শুরু করে। শুরু হয় ধড়পাকড়। জেলার দুই পুলিশ জেলা মিলে ৮৫ থেকে ৯০ জনকে আটক করার পাশাপাশি গ্রেফতারও করা হয়। যাদের মধ্যে বিজেপির কর্মীরাও আছেন বলে জেলার পুলিশ প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে। পাশাপাশি জেলার বিজেপি নেতাদেরকেও শান্তি বজায় রাখতে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করতে দেখা যায়। ভোট গণনার পরদিন অর্থাৎ মঙ্গলবার রাত থেকে পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসতে শুরু করে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে জেলায় প্রায় ২৮০টির মত ‘কুইক রেসপন্স টিম’ তৈরি রাখা হয়েছে।
কিন্তু বুধবার রাতে মধ্যমগ্রামে দুষ্কৃতীদের গুলিতে শুভেন্দু অধিকারীর আপ্তসহায়কের মৃত্যুর ঘটনার পরে পরিস্থিতি আবার নতুন দিকে মোড় নেয়। জেলার পরিবেশ আবার অশান্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এরপরই আরও সক্রিয় হয়ে ওঠে পুলিশ। সক্রিয় হয়ে ওঠে কেন্দ্রীয় বাহিনী।
কৃষ্ণনগর জেলা পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, থানা গুলিতে নাকা চেকিং বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সিভিক ও ভিলেজ পুলিশদের আরও বেশি সক্রিয় ও সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। যাতে এলাকায় কোনও রকম অশান্তির পরিবেশ তৈরি হলে আগাম খবর পাওয়া যায়। আরও সক্রিয় করা হয়েছে জেলার গোয়েন্দা বিভাগকে। জেলা পুলিশের এক কর্তার কথায়, আমরা সব সময় আগাম খবর পেয়ে আগেই ঘটনাস্থলে পৌঁছে যওয়ার চেষ্টা করছি। বুধবারও রাত দু’টো-আড়াইটে পর্যন্ত বিভিন্ন স্পর্শকতর এলাকা চষে বেড়িয়েছেন পুলিশ সুপার, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার থেকে শুরু করে ডিএসপি পর্যায়ের কর্তারা।
কৃষ্ণনগর পুলিশ জেলার সুপার ওয়াই রঘুবংশী বলেন,“কোনওভাবেই আইনশৃঙ্খলার অবনতি হতে দেওয়া হবে না। যে কোনও মূল্যে সেটা রক্ষা করতে আমরা প্রস্তুত আছি।”
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সর্বক্ষণের জন্য কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানদের প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে। জেলা প্রাশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, নির্বাচন প্রক্রিয়া চলাকালীন নদিয়া জেলায় প্রায় ৩০ হাজারের মত কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়ন করা হয়েছিল। ভোট পর্ব মেটার পরে তাদের মধ্যে ২০ শতাংশে মত তুলে নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ এখনও পর্যন্ত প্রায় ২৪ হাজারের মত কেন্দ্রীয় বাহিনী জেলায় রয়ে গিয়েছে। কোনও কারণে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে আবার নতুন করে সেই বাহিনীকে ফিরিয়ে আনাও হতে পারে বলে জেলা প্রশাসনের কর্তারা জানিয়েছেন।
জেলাশাসক শ্রীকান্ত পাল্লি বলেন, “শান্তিশৃঙ্খলা বজার রাখার প্রশ্নে কোনও রকম আপস করা হবে না। এ ক্ষেত্রে জ়িরো টলারেন্স অবস্থান নেওয়া হয়েছে।” আর বিজেপির নদিয়া উত্তর সাংগঠনিক জেলার মিডিয়া আহ্বায়ক সন্দীপ মজুমদার বলেন, “অশান্তি যে বরদাস্ত করা হবে না তা দলের সর্বোচ্চ নেতৃত্বে জানিয়ে দিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে দলও কড়া ব্যবস্থা নেবে।”
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)