শক্তিনগর জেলা হাসপাতালের সম্প্রতি আউটডোরে তিন মাসের সন্তানকে নিয়ে এসেছিলেন মহিলা। বেশ কিছু সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার পর খিদেতে কেঁদে ওঠে শিশু। কিন্তু এত মানুষের ভিড়ে এতটুকু আড়াল খুঁজে পাচ্ছিলেন না মা যেখানে শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াতে পারেন। শেষ পর্যন্ত এগিয়ে এলেন জনা তিনেক মহিলা। বড় হল ঘরের এক ধারে তাঁরাই মহিলাকে ঘিরে আড়াল তৈরি করেন। তাঁদের মাঝে বসে শিশুকে স্তন্যপান করান মহিলা।
স্বাস্থ্য দফতরই বার-বার প্রচার করে, ছ’মাস বয়স পর্যন্ত শিশুকে মাতৃদুগ্ধ ছাড়া আর কিছুই খাওয়ানো উচিৎ নয়। অথচ, সেই স্বাস্থ্য দফতরের হাসপাতালগুলিতে স্তন্যপানের আলাদা জায়গা থাকবে না কেন সেই প্রশ্ন উঠছে বিভিন্ন মহলে। কলকাতায় এসএসকেএমের মতো কিছু বড়, নামী সরকারি মেডিক্যাল কলেজে প্রসূতি বা শিশু বিভাগে ভর্তি থাকা মা ও সন্তানের জন্য আলাদা ‘ব্রেস্ট ফিডিং’ রুম রয়েছে। কিন্তু প্রতিদিন যে কয়েক হাজার মানুষ হাসপাতালের আউটডোর বা ইমার্জেন্সিতে আসেন তাঁদের একটা বড় অংশ মহিলা ও শিশু। তাঁদের জন্য একটু আড়াল বা ব্রেস্ট ফিডিং রুম কোনও সরকারি হাসপাতালেই কার্যত নেই। জেলার অবস্থা আরও তথৈবচ। জেলার বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল বা নার্সিংহোমেও একই অবস্থা।
মা ও শিশুদের নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন, চিকিৎসকদের একাংশ এবং মায়েদের অনেকেই বিষয়টিতে ক্ষুব্ধ, বিরক্ত। তাঁদের মতে, শপিং মল, হোটেল বা মাল্টিপ্লেক্সে শিশুকে স্তন্যপান করানোর জায়গা না-পেলে এখন সমালোচনার ঢেউ ওঠে। সোশ্য়াল মিডিয়ায় আলোচনার ঝড় চলে। অথচ খোদ সরকারি হাসপাতালে এমন ঘরের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কেউ আলোচনা করে না। তাঁদের মতে, এই সুবিধা পান না বলেই অনেক মা জনপরিসরে শিশুকে নিয়ে বেরোনোর সময় বোতলে কৌটোর দুধ নিতে বাধ্য হন। তাতে ‘এক্সটেনসিভ ব্রেস্টফিডিং’-এর তত্ত্ব বাধা পায়।
মায়ের দুধে অ্যান্টিবডি থাকে যা শিশুর শরীরে রোগ প্রতিরোধ শক্তি তৈরিতে সাহায্য করে। তার মস্তিষ্কের বিকাশ হয়। এর মাধ্যমে মা ও শিশুর মধ্যে একটা সুদৃঢ় সম্পর্ক বা ‘বন্ডিং’ তৈরি হয়। কিন্তু অভিযোগ, বিভিন্ন ‘পাবলিক প্লেস’-এ বুকের দুধ খাওয়ানোর আড়াল না পাওয়ায় মায়েরা কৌটোর দুধ বা খাবার চালু করতে বাধ্য হচ্ছেন। ধুবুলিয়া শ্যামাপ্রসাদ শিক্ষায়তনের শিক্ষক দীপকুমার রায় বলছেন, “বাচ্চা যখন ছোট ছিল তখন হাসপাতাল, ব্যাঙ্ক বা সরকারি দফতরে যেতে হলে আমার স্ত্রী অসম্ভব সমস্যায় পড়তেন। তখন উনি বাধ্য হতাম ওইটুকু শিশুকে বাড়িতে রেখে যেতে। আমার স্ত্রী বুকের দুধ বোতলে ভরে ফ্রিজে রেখে যেতেন যাতে খিদে পেলে বাড়িতে কেউ সেটা খাইয়ে দিতে পারেন।” আবার চাপড়ার নাসিদা বিবি বলেন, “যখন বোরখা পরে থাকি তখন সমস্যা হয় না। কিন্তু সব জায়গায় তা পরে যাওয়া হয় না। তখন চক্ষুলজ্জার মাথা খেয়ে সকলের সামনেই যতটা সম্ভব আড়াল করে ছেলেকে দুধ খাওয়াই। প্রচণ্ড অস্বস্তি হয়। কোনও ঘর পাই না।”
জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক তাপস রায়ের কথায়, “এমন কোনও পরিকল্পনা সত্যিই এখনও নেই, তবে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কী ভাবে কী করা যায় সেটা নিয়ে ভাবনাচিন্তা করতে হবে।” বিষয়টা যে তাঁদের মাথায় ছিল না তা স্বীকার করে নিয়ে জেলা পরিষদের সভাধিপতি রিক্তা কুন্ডু বলছেন, “পঞ্চায়েত থেকে শুরু করে অন্য সব সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে স্তন্যপান করানোর ঘর যাতে থাকে তার জন্য ব্যবস্থা নেব। খুব তাড়াতাড়ি জেলা প্রশাসনের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করব।”