Advertisement
E-Paper

ঝুলনের কি দিন গেল, প্রশ্ন পুতুলের শহরেই

ওদের আর টানে না ঝুলন! পুতুলের শহরে ঘূর্ণিতেও ঝুলনের পুতুল কেনার মানুষের বড় অভাব। উঠোনে, সিড়ির নীচে, বারান্দার এক কোণে কাদা মাটির পাহাড় সাজিয়ে সৈন্য জড়ো করে কিংবা গুহা রাঙিয়ে সেখানে সিংহ-বাঘকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে ছেলেবেলায় ঝুলনে মেতেছেন অনেকেই। সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে ছুটেছে কল্পনার উড়ান। আর এখন? ছোট ছোট ছেলেমেয়ে এবং তাদের অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল এখন তাতে মজা পায় না অনেকেই।

সুদীপ ভট্টাচার্য

শেষ আপডেট: ২৬ অগস্ট ২০১৫ ০১:১৮
পুতুলে রঙ করতে ব্যস্ত এক পড়ুয়া। কৃষ্ণনগরে।—নিজস্ব চিত্র

পুতুলে রঙ করতে ব্যস্ত এক পড়ুয়া। কৃষ্ণনগরে।—নিজস্ব চিত্র

ওদের আর টানে না ঝুলন! পুতুলের শহরে ঘূর্ণিতেও ঝুলনের পুতুল কেনার মানুষের বড় অভাব।
উঠোনে, সিড়ির নীচে, বারান্দার এক কোণে কাদা মাটির পাহাড় সাজিয়ে সৈন্য জড়ো করে কিংবা গুহা রাঙিয়ে সেখানে সিংহ-বাঘকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে ছেলেবেলায় ঝুলনে মেতেছেন অনেকেই। সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে ছুটেছে কল্পনার উড়ান। আর এখন? ছোট ছোট ছেলেমেয়ে এবং তাদের অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল এখন তাতে মজা পায় না অনেকেই। ঝুলনের আগে হরেক পুতুল বিক্রি করে যাঁরা দু’পয়সা ঘরে তুলতেন তাঁরাও জানালেন বিক্রিবাটার হার সঙ্গিন।
কম্পিউটারে কিংবা মোবাইলে ভিডিও গেম খেলা এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা অনেকেই ঝুলনের সঙ্গে পরিচিত নয়। শিশুমন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে ঝুলন। কয়েক বছর আগেও ঝুলনের আগে কাঠের গুঁড়ো নিতে ছোটছোট ছেলেমেয়েদের কাঠ মিলের সামনে ভিড় জমাতে দেখা যেত। সে ভিড়ও এখন উধাও। কৃষ্ণনগরের এক কাঠ মিলের মালিক চন্দন দাস জানালেন, কাঠের গুঁড়ো নিতে আসা বাচ্চাদের সংখা এখন হাতে গোনা। কৃষ্ণনগরের পালপাড়ার পূর্ণিমা পাল বলেন, ‘‘ঝুলনে সৈন্য, ঘোড়া, গরু, সব্জি, মাছ বিক্রেতা— এ ধরনের পুতুলের চল বেশি। কিন্তু আগের মতো পুতুল বিক্রি হয় না।’’ চাহিদা না থাকায় বাড়েনি পুতুলের দামও। ঘূর্ণির মনোরঞ্জন দাস বলেন, ‘‘ঘর সাজানোর জন্যে পুতুল বিক্রি হলেও ঝুলনের জন্য আলাদা করে পুতুলের চাহিদা নেই।’’
প্রবীণ আলোকচিত্রী সত্যেন মণ্ডল তাঁর বন্ধু স্বপ্নেন্দু ধর স্মৃতি হাতড়ে জানালেন, তাঁরা ছোটবেলায় বন্ধুরা মিলে ঝুলন করেছেন। গুণমানে কারা, কাদের টেক্কা দিতে পারে তা নিয়েই ছিল লড়াই। ঝুলন শেষে প্রণামীর থালায় জমা পয়সা দিয়ে লুচি, আলুর দম তৈরি করা হত। সত্যেনবাবুর কথায়, ‘‘এখন পাড়া ঘুরে দু’একটা মাত্র ঝুলন চোখে পড়ে!’’ নাকাশিপাড়ার জমিদার বাড়ির বংশধর সুবীর সিংহ রায় জানালেন, ছোটোবেলায় তাঁরা ঝুলন করতেন। বাড়িতে কচিকাচাদের সংখ্যা ছিল জনা পনেরো। পাড়ার দাদারাও সাহায্য করতেন। ‘‘এখন সে সব পড়ে নষ্ট হচ্ছে। এই প্রজন্মের ঝুলনে আর উৎসাহ কই?’’ প্রশ্ন তাঁরও।

এই অবস্থার জন্যে বাড়ির বড়দেরই দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞেরা। মনোবিদ অশোককুমার আঢ্যির কথায়, ‘‘বড়রা ব্যস্ত। ছোটদের পড়ার চাপ বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে ঝুলনের মতো সামাজিক অনুষ্ঠানের গুরুত্ব অপরিসীম।’’ কেমন? তাঁর ব্যাখ্যা, ঝুলন খেলার ছলে কল্পনার উড়ান। শিশুমনের বিকাশে সাহায্য করে। মনের ক্লান্তি দূর করে। সংস্কৃতি, ইতিহাসকেও জানা যায়। শিশু বিশেষজ্ঞ শ্যামল ঘোষ মনে করেন, অনেক বাবা-মা এখন বাচ্চাদের মাটি-কাদা নিয়ে খেলতে দিতে চান না। ‘‘মাটির ছোঁয়া শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে’’— মত তাঁর।

একই সুরে লেখক তমাল বন্দ্যোপাধ্যায় মনে করেন, যৌথ পরিবার ভেঙে যাওয়ার ঝুলনের মতো অন্য আর পাঁচটা সংস্কৃতি বিপন্ন হয়েছে। তাঁর স্বীকারোক্তি, ‘‘আমরা ছোটবেলায় ঝুলন করেছি। নানা কাজের অছিলায় আমার সন্তানকে তাতে উৎসাহ যোগাতে পেরেছি কি?’’ গৃহবধূ মৌসুমী হালদার মনে করেন সময়ের অভাবেই এমনটা হচ্ছে। তাঁর কথায়, ‘‘ছোটবেলায় পাড়ার সবাই মিলে ঝুলন করেছি। এখন কে সাহায্য করবে? কেই বা মাটি, কাঠের গুঁড়ো জোগাড় করবে? একই সুর গৃহবধূ সীমা লাহার গলাতেও। পড়শি আর এক গৃহবধূ আবার মনে করেন, সময় নয়। ইচ্ছে থাকলেই উপায় হয়।

ছোটরা কী বলছে?

পঞ্চম শ্রেণির শ্রেয়সী পাল উৎসাহে ডগমগ হয়ে জানাল, সে প্রতি বছর ঝুলন করে। এ বারও করছে। বন্ধুরা দেখতে আসবে বলেছে। এ বছরও বাবা-মায়ের সঙ্গে বেরিয়ে ঝুলনের জোগাড় করেছে শ্রেয়সী। এই সংখ্যাটা হাতেগোনা। যেমন তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী মহুলবনি বিশ্বাস বলে, ‘‘বাবাকে যখনই বলি ঝুলন করব, বাবা বলে পরের বছর!’’

এ ভাবেই কি হারিয়ে যাবে ঝুলন?

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy