Advertisement
E-Paper

তামার বালা দেখেই চিনেছিলাম পিন্টু চাচার লাশ

ভুলে যাওয়া সময়ের ডায়েরিতে হলদে পাতা ওড়ে, তাতে শুকনো রক্তের দাগ। এক সময়ে হইচই ফেলে দেওয়া খুন-জখমের ইতিবৃত্ত চুপ করে থাকে পুলিশ ফাইলে। দীর্ঘশ্বাস ফেলেন এক দিন সংবাদের কেন্দ্রে চলে আসা আত্মীয়-পরিজন। কিনারা হয়েছে সব রহস্যের? ভুলে কি গিয়েথে সবাই? খোঁজ নিচ্ছে আনন্দবাজার।আগুনের কি পা আছে? ধক ধক করে জ্বলে উঠছে ছোট ঘর, ছাদের কানির্শে রাখা পায়রার খোপ, উঠনের গোলা বাড়ি— জ্বলতে জ্বলতে এক সময়ে ধোঁয়ার আড়ালে হারিয়ে গেল লতিফ খাঁয়ের আস্ত বাড়িটা। মধ্য চল্লিশের সাজ্জাদের স্পষ্ট মনে আছে ছবিটা— ‘‘আব্বার সাথে ছুটে এসেছিলাম পাহাড়পুরে। কত আর বয়স, এগারো-বারো হবে। সব হুবুহু মনে আছে জানেন।’’

অনল আবেদিন

শেষ আপডেট: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ ০১:৩৩

আগুনের কি পা আছে? ধক ধক করে জ্বলে উঠছে ছোট ঘর, ছাদের কানির্শে রাখা পায়রার খোপ, উঠনের গোলা বাড়ি— জ্বলতে জ্বলতে এক সময়ে ধোঁয়ার আড়ালে হারিয়ে গেল লতিফ খাঁয়ের আস্ত বাড়িটা।

মধ্য চল্লিশের সাজ্জাদের স্পষ্ট মনে আছে ছবিটা— ‘‘আব্বার সাথে ছুটে এসেছিলাম পাহাড়পুরে। কত আর বয়স, এগারো-বারো হবে। সব হুবুহু মনে আছে জানেন।’’ কান দশেক সাইকেল, টুকটুকে লাল মোটরবাইকটা, লেপ-তোষক-কাঁথা.. সাজ্জাদ বলছেন, ‘‘পোড়া তুলোর সে কী গন্ধ গো!’’ বাড়ির উঠোনে বসে একশ্রিশ বছর পিছনে হেঁটে যাচ্ছেন প্রৌঢ়, ‘‘আব্বা একটা পোড়া টিন সরাতেই দেখলাম টিনের তলায় পোড়া কাঠের মতো তিন-তিনটে লাশ জড়াজড়ি করে পড়ে আছে। হাতে তামার বালা দেখে বুঝলাম এটা পিন্টু চাচার লাশ। রেবা ফুপুর একটা হাত গমের কুঠিতে ঢুকে ছিল। তাই সবটা পোড়েনি। সেই হাতের কাঁচের চুড়ি ও গলার সোনার চেন দেখে ঠিক চিনলাম। বাড়ির সামনে দুটো বড় নিম গাছ ছিল। সে দুটোও পুড়ে ছাই জানেন।’’

পাহাড়পুরে লতিফ খাঁয়ের বাড়ি সে দুপুরে এমনই পুড়েছিল। আগুনের তীব্রতা বাড়াতে ব্যারেল থেকে ঘন ঘন ঢালা হয়েছিল কেরোসিন। ১৯৮৪ সালের নভেম্বরের শীত-দুপুরর সেই হল্কায় ছাই হয়ে গিয়েছিল বাড়ির লাগোয় কলাগাছের পাতা, সজনে ফুলের ঝাড়। আর ঘরের ভিতর ঝলসে মরে ছিল লতিফের ছেলে, মহিদ (২০), পিন্টু (১৭) আর তাদের আদরের বছর দশেকের বোন রেবেকা।

বাড়ির ভিতরে তাদের আটকে রেখে বাইরে থেকে দরজার শিকল তুলে দিয়ে আগুন ধরিয়ে দিয়ে লাঠি, টাঙি, বল্লম, তীর-ধনুক, বোমা নিয়ে বাইরে থমথমে মুখে দাঁড়িয়ে ছিল বাহিনী। ঘিরে রাখা হয়েছিল বাড়ির লাগোয়া পুকুরটাও। সাজ্জাদ বলছেন, ‘‘যাতে কেউ জল তুলে ঘরে ছিটিয়ে দিতে না পারে।’’ বয়সের ভারে ন্যুব্জ পাহাড়পুরের প্রৌঢ়া হাসিনা বিবিও হাতড়ে হাতড়ে মনে করছেন, ‘‘বাড়ি তো পুড়ল, মহিদ-পিন্টু-রেবার পোড়াকাঠের মতো দেহগুলোও তুলল ওরা। সেই দুপুরটা চোখ বুজলেই বিলকুল দেখতে পাই।’’

মারা গিয়েছিলেন ক’জন? তিন-চার গ্রামের অনেকে বলেন সাতও হতে পারে। বরাত জোরে শুধু বেঁচে গিয়েছিলেন লতিফ খাঁ আর তাঁর দুই ছেলে মন্টু, নান্টু। দূরের ছাদ থেকে সেই দুপুরটা দেখেছিলেন সাকিম খাঁ। তখন তাজা যুবক। বলছেন, ‘‘পালাতে গিয়ে লতিফ খাঁর বুকের পাশে গুলি লাগে। লুটিয়ে পড়েছিল। মন্টুর তল পেটে ঢোকে দু’টো গুলি। তার মাথায় ৩১’টা ভোজালির কোপ পড়ে। নান্টুর দু’পায়ের শিরাও কেটে দেওয়া হয়েছিল ভোজালি দিয়ে।’’

তিন দশক আগের সেই শুকনো রক্তের ধারা খুংজতে গিয়ে কেউ চোখ বুজে পেলছেন। কেউ দীর্ঘশ্বাসে উড়োচ্ছেন ধুলো। আর মুখ নিচু করে বসে থাকা মানুষটা মাটির উপরে আঁকিবুঁকি কাটতে কাটতে বলছেন, ‘‘আজও তে বিচার হল না, কী দরকার ছিল ওি খুনোখুনির?’’

ফরওয়ার্ড ব্লকের স্থানীয় নেতা ছিলেন লতিফ। সে দিনের ঘটনায় অভিযুক্ত ছিলেন সিপিএমের যে নেতা-কর্মীরা, তিন দশক ধরে আদালতে হাজিরা দিতে দিতে তাঁরাও ক্লান্ত। তবে, তার রেষ ধরে মাঝে মধ্যেই ঝলসে উঠেছে পাহারপুর।

এই যেমন ১৯৯৬ সালে, রাতের আঁধারে সিপিএম সমর্থক জালাল শেখ খুন হয়ে গেলেন নিশ্চুপে। আর, কী অদ্ভুত, সে ঘটনায় যাবজ্জীবন সাজা হয়ে গেল লতিফ আর তাঁর বেঁচে যাওয়া দুই ছেলে মন্টু-নান্টুর। গত সাত বছর ধরে তারা জেলে। জেলের আঁধারেই চার বছর আগে মারা গিয়েছেন লতিফ। তাঁর, আর এক সন্তান কুদ্দুসও খুন হয়ে গিয়েছেন এর মাঝে, দিনে দুপুরে। এখন, লতিফের ৮ সন্তানের মধ্যে ‘টিঁকে’ রয়েছেন শহিদ। আর নাতি সাজ্জাদ। নভেম্বর মাস পড়লেই যাঁর স্মৃতিতে ঝলসে ওঠে একটা জ্বলন্ত দুপুর।

ভৈরবের চরে জেগে ওঠা একটা খাস জমির দখলদারি নিয়ে যে রক্তপাতের শুরু, গ্রামবাৈসীরা এখন যাকে মনে করেন, ‘‘এ রক্ত স্রোতের সেষ নেই। আবার কে কবে কাকে মারে...!’’

ভৈরবের পাড়ে পাহাড়পুর গ্রামের অবস্থা ছিল রানিনগর থানা এলাকায়। ভাগ হওয়ায় পরে পাহাড়পুর এখন ইসলামপুরে। ১৯৮৪ সালের নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে গ্রাম লাগোয়া নদীর চরে জেগে ওঠা ওই জমির দখল নিয়েছিলেন প্রাথমিক স্কুল শিক্ষক লতিফের নেতৃত্বে ফরওয়ার্ড ব্লকের সমর্থকেরা। ক’দিন পরেই সে জমি পাল্টা দখল নেয় সিপিএম। অভিযোগ, লতিফকে নিকেশ করতে তার পরেই লতিফের বাড়ি পুড়িয়ে কাক করে দিয়েছিল সিপিএমের দুই শিক্ষক নেতা। এহেসান আলি আর নবকুমার মণ্ডল।

সিপিএমের জেলা কমিটির সদস্য এহেসান আলি তখন দলের জোনাল কমিটির সম্পাদক। বলছেন, ‘‘শুনেছি, পাশের বাড়ি থেকে আগুন লেগেছিল লতিফের বাড়িতে।’’ আর নবকুমারবাবু বলেন, ‘‘লতিফ খাঁয়েদের আচরণে লাগোয়া কয়েকটি গ্রামের মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। গণরোষেই পুড়েছিল বাড়ি।’’ তাঁরা বলছেন, ‘‘ফব নেত্রী নেত্রী ছায়া ঘোষই আমাদের ফাঁসিয়েছিল সে সময়ে।’’

তবে, মানুষ জানেন, সিপিএম-ফব’র সেই লড়াই জিইয়ে রয়েছে পাহাড়পুরে, আজও। সেই মামলা, ৭৪৪/৮৪— এখনও মাঝে মধ্যে ভেসে ওঠে আদালতে। নিষ্পত্তি দূরের কথা, আজও সে মামলার সাক্ষ্যগ্রহণই শুরু হয়নি। কবে হবে? সাজ্জাদ মিটি মিটি হাসছেন, ‘‘যে দিন পাহারপুরে আগুন নিভবে, সেই দিন!’’

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy