Advertisement
E-Paper

ফেলো কড়ি, ধরো রিপোর্ট

জেলার অধিকাংশ হাসপাতালে এক্স রে করা হচ্ছে না। বাড়তি টাকা খরচ করে ছুটতে হচ্ছে বেসরকারি ক্লিনিকে। কেন এই দশা? খোঁজ নিল আনন্দবাজার।দিন কয়েক আগে গাড়ি থেকে পড়ে গিয়ে গিয়েছিলেন নাটনার বাসব রায়। তাঁর বাঁ হাত ও পা দু’টোই ভেঙে গিয়েছিল। বছর ত্রিশের ওই যুবককে তড়িঘড়ি নিয়ে যাওয়া হয় করিমপুর গ্রামীণ হাসপাতালে।

নিজস্ব প্রতিবেদন

শেষ আপডেট: ০১ ডিসেম্বর ২০১৫ ০২:০৯
এ ভাবেই দীর্ঘ দিন ধরে বন্ধ হয়ে রয়েছে করিমপুর গ্রামীণ হাসপাতালের এক্স রে ঘর।— নিজস্ব চিত্র।

এ ভাবেই দীর্ঘ দিন ধরে বন্ধ হয়ে রয়েছে করিমপুর গ্রামীণ হাসপাতালের এক্স রে ঘর।— নিজস্ব চিত্র।

দিন কয়েক আগে গাড়ি থেকে পড়ে গিয়ে গিয়েছিলেন নাটনার বাসব রায়। তাঁর বাঁ হাত ও পা দু’টোই ভেঙে গিয়েছিল। বছর ত্রিশের ওই যুবককে তড়িঘড়ি নিয়ে যাওয়া হয় করিমপুর গ্রামীণ হাসপাতালে। জরুরি বিভাগের চিকিৎসক বাসববাবুর পরিবারকে জানিয়ে দেন, বাইরে থেকে এক্স-রে করাতে হবে। কারণ বছর দু’য়েকেরও বেশি সময় ধরে সীমান্তের এই হাসপাতালে টেকনিশিয়ানের অভাবে এক্স রে বন্ধ হয়ে রয়েছে। বাধ্য হয়ে বাসববাবু বাইরে থেকে এক্স রে করান। ভাঙা হাত-পা নিয়ে ভোগান্তি তো হলই, খরচ হল অতিরিক্ত টাকাও।

কোথাও টেকনিশিয়ান নেই। কোথাও নেই এক্স রে মেশিনটাই। কোনও হাসপাতালে আবার এক্স রে মেশিন ও টেকনিশিয়ান থাকলেও তার রিপোর্ট নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের চিকিৎসকেরাই। এমন পরিস্থিতিতে নিত্যদিন দূরদুরান্ত থেকে কষ্ট করে হাসপাতালে এসে ঘুরে যেতে হচ্ছে অসংখ্য রোগীকে। প্রশ্ন উঠছে, সরকারি হাসপাতালে সব পরিষেবা ‘ফ্রি’ করে দেওয়ার ব্যাপারে রাজ্য সরকার যখন ঢাকঢোল পিটিয়ে উদ্যোগী হচ্ছে তখন হাসপাতালে ন্যূনতম এক্স-রে করানোর ব্যবস্থা থাকবে না কেন? বিষয়টি অজানা নয় জেলা স্বাস্থ্য দফতরের কর্তাদেরও। নিজেদের অসহায়তার কথা জানিয়ে তাঁরা বলছেন, ‘‘আমাদের হাতে কিছুই নেই। এই সমস্যার সমাধান করতে পারে একমাত্র স্বাস্থ্য ভবন।’’

শক্তিনগর জেলা হাসপাতাল ও কৃষ্ণনগর সদর হাসপাতালে এক্স রে করানো হয়। কিন্তু জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ৮৫-৯০ কিলোমিটার পথ উজিয়ে এত দূরে এক্স রে করাতে যাওয়াটা যথেষ্ট ঝক্কির। তারপরেও কষ্ট করেও অনেকে সেখানে যাচ্ছেন। যাঁরা যাচ্ছেন না, তাঁরা গাঁটের টাকা খরচ করে বাইরের কোনও বেসরকারি ক্লিনিক থেকে এক্স রে করাচ্ছেন। সেই রিপোর্ট আবার ঠিক বলে মনে হচ্ছে না চিকিৎসকদের। তখন চিকিৎসকের পরামর্শে ফের ছুটতে হচ্ছে চিকিৎসকের ‘বিশ্বস্ত’ কোনও ক্লিনিকে।

Advertisement

বগুলা গ্রামীণ হাসপাতালে সপ্তাহে ছ’দিন এক্স-রে হয়। কিন্তু বুক বা কোমরের এক্স-রে হয় না। হাসপাতাল সুপার বীরেন্দ্রনাথ মজুমদার বলছেন, ‘‘মেশিন অনেক পুরনো। বড় প্লেটের এক্স-রে করতে গেলে মেশিনটাই তো খারাপ হয়ে যাবে।’’ হাসপাতালের চিকিৎসকদের দাবি, এই মেশিনে স্পষ্ট ছবি হয় না। সেই কারণে তাঁরা ভাল রিপোর্টের জন্য রোগীদের বাইরের ক্লিনিকে পাঠাতে বাধ্য হন। যদিও জেলা স্বাস্থ্য দফতরের এক কর্তার পাল্টা দাবি, পরিস্থিতি কিন্তু এতটা খারাপ নয়। আসলে চিকিৎসকদের একাংশের সঙ্গে ক্লিনিকগুলির যোগাযোগ থাকার কারণেই ছবি অস্পষ্ট হচ্ছে।

বাইরের ক্লিনিকে গিয়েও হয়রানি কিছু কম হচ্ছে না। কী রকম? সম্প্রতি পড়ে গিয়ে কোমরে চোট পেয়েছিলেন চাপড়া এলাকার মইদুল শেখের। চাপড়া গ্রামীণ হাসপাতালে এক্স-রে হয় না। বাধ্য হয়েই তিনি বেসরকারি ক্লিনিক থেকে এক্স রে করিয়েছিলেন। কিন্তু চিকিৎসকের কাছে সেই রিপোর্ট নিয়ে যাওয়ার পরে ওই প্রৌঢ়কে শুনতে হয়, ‘‘এই রিপোর্টের কোনও মানেই হয় না। আপনি বরং কৃষ্ণনগর থেকে আর একবার ভাল করে এক্স রে করিয়ে আনুন।’’ এরপরেই মইদুলের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয় অন্য ক্লিনেকের ঠিকানা লেখা একটি চিরকুট। পেশায় দিনমজুর মইদুল বলছেন, ‘‘কোমরের থেকেও মনের যন্ত্রণা বেশি হয়েছিল। টানাটানির সংসারে দ্বিতীয় বার এক্ল রে করানোর জন্য শেষ পর্যন্ত বাড়ির ছাগলটাও বিক্রি করতে হয়।’’

হাসপাতাল সূত্রে খবর, সরকারি হাসপাতালে এমন বেহাল অবস্থার সুযোগ নিয়েই ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে ক্লিনিকগুলি। সেখানেও নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠছে। জেলা হাসপাতালের এক চিকিৎসক জানান, ওই ক্লিনিকগুলিতে শৌচাগার, মহিলাদের পোশাক পরিবর্তনের জায়গা, পানীয় জল, ওয়েটিং রুম, ডার্ক রুম, রেকর্ড সেকশন থাকার কথা। সেগুলি না থাকলে লাইসেন্স পাওয়ার কথা নয়। অথচ বেশিরভাগ বেসরকারি ক্লিনিকে রেডিওলজিস্ট তো দূরের কথা টেকনিশিয়ানই নেই। তারপরেও সেগুলি রমরমিয়ে চলছে।’’

হাসপাতাল ও জনস্বাস্থ্য রক্ষা কমিটির নদিয়া জেলা ইউনিটের সম্পাদক সত্যজিৎ রায় বলেন, ‘‘ভাবতে আবাক লাগছে এই সরকারি হাসপাতালগুলি সামান্য এক্স-রে’র মতো পরিষেবা দিতেও ব্যর্থ। অথচ খোদ মুখ্যমন্ত্রী নিজেই এই দফতরের দায়িত্বে!’’ জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক তাপস রায়ের সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়া, ‘‘হাসপাতালের এক্স রে ও বেসরকারি ক্লিনিকের বিষয় দু’টি স্বাস্থ্যভবনকে জানিয়েছি।’’ কিন্তু এই সমস্যা কবে নাগাদ মিটবে? নাহ্, সিএমওএইচের কাছে সে প্রশ্নের কোনও সদুত্তর মেলেনি!

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy