Advertisement
E-Paper

ফসল নিয়ে অপেক্ষায় কাহারপাড়া

মাঠ জুড়ে কলাই। দাবার খোপের মতো মাঝে মাঝে বিঘে কয়েক জমিতে ধান, রাস্তার পাশে নয়ানজুলি ঘেঁষে অনাবিল সব্জি— পটল, করলা, লঙ্কা, শসা। নভেম্বরের প্রান্তে, বাংলাদেশের সীমান্ত ছুঁয়ে মুর্শিদাবাদের প্রান্তিক গ্রামগুলি বুক ভরা আবাদ নিয়ে এখন ‘তাঁদের’ অপেক্ষায়।

রাহুল রায়

শেষ আপডেট: ২৭ নভেম্বর ২০১৫ ০১:১৫
সীমান্ত উজিয়ে পা পড়েছে ‘মরসুমি শ্রমিকের’। কাহারপাড়ায় গৌতম প্রামাণিকের তোলা ছবি।

সীমান্ত উজিয়ে পা পড়েছে ‘মরসুমি শ্রমিকের’। কাহারপাড়ায় গৌতম প্রামাণিকের তোলা ছবি।

মাঠ জুড়ে কলাই। দাবার খোপের মতো মাঝে মাঝে বিঘে কয়েক জমিতে ধান, রাস্তার পাশে নয়ানজুলি ঘেঁষে অনাবিল সব্জি— পটল, করলা, লঙ্কা, শসা। নভেম্বরের প্রান্তে, বাংলাদেশের সীমান্ত ছুঁয়ে মুর্শিদাবাদের প্রান্তিক গ্রামগুলি বুক ভরা আবাদ নিয়ে এখন ‘তাঁদের’ অপেক্ষায়।

সীমান্ত উজিয়ে সস্তার শ্রম দিয়ে তাঁরা তুলে দিয়ে যাবেন ধান, কলাই, সব্জি। ও পারের কুষ্টিয়া, রাজশাহী কিংবা যশোহর থেকে, তাঁদের মাস খানেকের ‘ভিসা-হীন’ অনুপ্রবেশের অপেক্ষায় তাই এ পারের কাহারপাড়া, শেখপাড়া, কাতলামারি।

বৎসরভর কেন্দুপাতা আর শাল জঙ্গলের ডালপালা কুড়িয়ে শীতের প্রান্তে রুজির টানে হুগলি-বর্ধমানের শস্যগোলায় খাটতে যাওয়া আদিবাসী রীতির সঙ্গে পরিচয় রয়েছে রাজ্য সরকারের। ‘পুবে’ খাটতে যাওয়া আদিবাসী মানুষের রোজগারের দেখানো সেই পথে সাম্প্রতিক সীমানা ভাঙছেন পড়শি রাষ্ট্রের এই গ্রামীণ মানুষজন। তবে যাত্রা পথটা উল্টো। বাংলাদেশে যার চলতি পরিচয়— ‘ও পারে লেবার’ খাটতে যাওয়া। তা নিয়ে অবশ্য সরকারের কাছে কোনও হিসেব নেই। তবে মুর্শিদাবাদের জেলাশাসক হিসেবে প্রায় বছর তিনেক দায় সামলে নবান্নে ফেরা এক পদস্থ কর্তা কবুল করছেন, ‘‘ওঁরা (বাংলাদেশি) আসেন, সস্তায় জন খাটেন, আবার ফিরেও যান। জেলার কর্তাদের অনেকেই তা জানেন। তবে ব্যাপারটা নিয়ে কেউ ঘাঁটাতে চান না।’’

নিজের দেশ উজিয়ে, ভিটেমাটি-পরিবার ছেড়ে আবাদের মরসুমে পাড়ি দিয়ে এ দেশে আসা বাংলাদেশি গ্রামীণ মানুষের এই পরিভ্রমণের একটা তকমাও জুটে গিয়েছে— ‘ইন্টারন্যাশনাল সার্কুলার মাইগ্রেশন’— গত তিন বছর ধরে দুই দেশের শ্রমিকদের উপরে সমীক্ষা চালিয়ে এ নামেই তাঁদের চিহ্নিত করছেন বার্লিনের টিইউবি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক এলিজা টি বের্তুজো। অগ্রহায়ণের শেষে নদিয়ার ওই প্রান্তিক গ্রামগুলি ঘুরে স্পষ্ট হচ্ছে তাঁর গবেষণার বাস্তবতাও। ও পাড়ের কুষ্টিয়া থেকে সদ্য পা রাখা এরশাদ আলি বলছেন, ‘‘যে নামেই ডাকেন বাবু, পেটের দায়েই তো আসা। না হলে নিজের ভিটে-মাটি ঘর-পরিবার ছেড়ে কেউ আসে!’’

নভেম্বর থেকে মধ্য-জানুয়ারি—বছরের এই দু-আড়াইটা মাস এ পারে (পড়ুন এ রাজ্যে) জন খাটলে, তাঁদের যে বেশ কিছুটা রোজগার হয়, তা মেনে নিচ্ছেন স্থানীয় পঞ্চায়েত কর্তারাও। তাঁদেরই এক জনের কথায়, ‘‘মুর্শিদাবাদের ওই সীমান্ত ঘেঁষা এলাকায় জন খাটলে দৈনিক রোজ মেলে ১৩০ থেকে ১৪০ টাকা। অথচ বাংলাদেশ থেকে আসা ওই অভাবী মানুষেরা ৯০-১০০ টাকায় সেই কাজটা করে দিয়ে যাচ্ছেন।’’ বাংলাদেশে যার মূল্য দাঁড়াচ্ছে প্রায় দেড় গুণ বেশি। স্থানীয় বাসিন্দা জব্বর আলি বলছেন, ‘‘দিনান্তে, গৃহস্থের বাড়িতে দু-মুঠো অন্নের সঙ্গে কোথাও বা রাতের আশ্রয়টুকুও মিলে যাচ্ছে তাঁদের। রোজগারের এই নিশ্চয়তা ও পারে কোথায়?’’

গত পাঁচ বছর ধরে দেশ-বিদেশের শ্রমিকদের মরসুমি-সফর নিয়ে কাজ করছেন ‘ইনস্টিটিউট অফ রুরাল স্টাডিজ (বেঙ্গালুরু)’-এর সৈকত চট্টোপাধ্যায় এবং এস বোপান্না। তাঁরা বলছেন, ‘‘বাংলাদেশ-পশ্চিমবঙ্গ সীমান্তে মাইলের পর মাইল এলাকা এখনও কাঁটাতার নেই। টহলদারি বিএসএফেরও ওই সব এলাকায় বিশেষ পা পড়ে না।’’ তাঁদের পর্যবেক্ষণ বলছে, কোথাও সামান্য নদী-নালা কোথাও নিতান্তই মাঠের মাঝে নিয়মরক্ষার পিলার বসিয়ে দু-দেশের সীমানা আঁকা হয়েছে। যেখানে পাচারের সঙ্গে দু-দেশের অবাধ যাতায়াতের সঙ্গেই রয়েছে ‘মরসুমি শ্রমিকের’ আনাগোনা।

তাঁদের আসা-যাওয়াটা যে গত কয়েক বছরে বেড়ে গিয়েছে, তা মেনে নিচ্ছেন কাহারপাড়া এলাকার সম্ভ্রান্ত কৃষক শেখ আজমল। বলছেন, ‘‘বছর পাঁচ-সাত আগেও ফলন তোলার জন্য ডাক দিলেই ঝাঁকে ঝাঁকে লোক মিলত গ্রামে। কাকে ছেড়ে কাকে নেব অবস্থা! ছবিটা বদলে গিয়েছে, একশো দিনের কাজের সুবাদে।’’ তিনি জানাচ্ছেন, তার উপরে রয়েছে মাঠের কাজ ফেলে শহরমুখো হওয়ার প্রবণতা। ফলে মাঠের কাজে লোক মেলে না।’’ তাঁর দাবি, সেই জায়গাটা ভরাট করছেন বাংলাদেশ থেকে আসা এই ‘অভাবী’ মরসুমি মানুষেরা। তিনি বলেন, ‘‘অনেকটাই কম রোজে ধান-কলাই কেটে ঘরে তুলে দিয়ে যাচ্ছেন ওঁরা।’’ ইনস্টিটিউট অফ রুরাল স্টাডিজ-এর হিসেব বলছে— এ রাজ্যের মুর্শিদাবাদ-নদিয়ায় এই মরসুমি মানুষের ভিড় সর্বাধিক হলেও বাদ নেই উত্তরবঙ্গের দুই দিনাজপুর, কোচবিহার এবং মালদহ জেলাও। সমীক্ষা বলছে, ২০১৩-১৪ সালে শুধু মুর্শিদাবাদের সীমান্ত ছোঁয়া গ্রামগুলিতে মরসুমি শ্রমিক হিসেবে কাজ করে গিয়েছেন অন্তত ১৪ হাজার মানুষ। গত বছর, সেই হিসেব বেড়ে গিয়েছে প্রায় ১৮ শতাংশ। শেখপাড়ার সুধন্য শেখ বলছেন, ‘‘অনেকটাই সাশ্রয় হয় তো, ওঁদের ভরসাতেই তাই বসে রয়েছি এ বারও।’’ পাল্টা একটা অভিযোগও কানে আসছে। স্থানীয় রোশন আলি, মজিদ আলম বলছেন, ‘‘বাংলাদেশিরা সস্তায় দিন মজুরি করে ভাত মারছে আমাদের। এলাকার বড় চাষিরা এখন ওঁদের দিয়েই ঘরে ফলন তুলছেন।’’ ইনস্টিটিউট অফ রুরাল স্টাডিজ-এর রিপোর্টও সে কথাই সমর্থন করছে। আর বিএসএফ?

কাঁটাতার নুয়ে পড়েছে। কোথাও বা দেশের সীমান্ত আগলে রেখেছে ফিতের মতো এক চিলতে নালা-নদী। নদিয়ার এমনতরো সীমান্তে বিএসএফের রাঙা চোখের অনুশাসনও যে বেশ ঢিলেঢালা, তা কবুল করছেন সীমান্তরক্ষী বাহিনীর এক কর্তা-ও। শীতের কুয়াশায় সেই ঢিলেঢালা প্রহরাই রুজির উপায় হয়ে হাতছানি দিচ্ছে ও পারের মরসুমি শ্রমিকদের।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy